মেট্রো স্টেশন থেকে উদ্ধার অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পাইপবোমার ছাতা খুললেই ঘটাত বিস্ফোরণ – বর্ণমালা টেলিভিশন

মেট্রো স্টেশন থেকে উদ্ধার অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পাইপবোমার ছাতা খুললেই ঘটাত বিস্ফোরণ

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ২৫ July, ২০২৬ | ৫:০৯ 127 ভিউ
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের সড়কে একটি পাইপবোমা উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। খবর পেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বস্তুটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করে। একটি ছাতার ভেতরে সুকৌশলে বোমাটি পাতা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ছাতার ভেতরে পাতা বোমা আর দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। এমন ভয়াবহ ঘটনার প্রেক্ষিতে মেট্রোরেল চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় সময়মতো বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা। আজ ২৪শে জুলাই, শুক্রবার রাতে শাপলা চত্বরের কাছে মেট্রো স্টেশনের নিচের অংশে পথচারীরা সন্দেহজনক ছাতাটি দেখতে পান। প্রথমে স্থানীয়ভাবে খবর ছড়ায় যে দুষ্কৃতকারীরা সড়ক লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করেছে। তবে পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে স্পষ্ট করেন যে এটি সাধারণ কোনো পেট্রোল বোমা ছিল না। পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া বস্তুটি মূলত ছাতার ভেতরে কৌশলে সেট করা একটি পাইপবোমা। কেউ ছাতাটি খোলার চেষ্টা করলেই সরাসরি বিস্ফোরণ ঘটার মতো ভয়াবহ পরিকল্পনা নিয়ে এটি সেখানে রাখা হয়েছিল। ডিএমপির বিশেষায়িত দল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাইপবোমাটি নিষ্ক্রিয় করায় সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার পেছনের অপরাধীদের শনাক্ত করতে তদন্ত জোরদার করেছে। বাংলাদেশে পাইপবোমার ইতিহাসে জড়িয়ে আছে মুফতি হারুন ইজহার ও তার বাবার নাম সারাদেশে আইএস জঙ্গিদের আদলে উগ্রবাদী পতাকা টাঙানোর ঘটনায় নেপথ্যের কুশীলবের নাম জানা গেছে ইতিমধ্যে। রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের শরিয়াহ গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হিসেবে কাজ করা ভয়ঙ্কর জঙ্গি এবং ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি হারুন ইজহার। আসুন তার ইতিহাস ও অতীত সম্পর্কে জানা যাক। সময়কাল ৭ই অক্টোবর, ২০১৩। গণজাগরণ মঞ্চ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, হেফাজতের শাপলা চত্বর তাণ্ডব মিলে উত্তাল দেশ। এসময় চট্টগ্রামের লালখান বাজারস্থ জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ অন্তত ৮-৯ আহত হন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা যান। শুরুতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কম্পিউটারের ‘ইউপিএস’ বিস্ফোরণের হাস্যকর দাবি তুলে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে গোয়েন্দা সংস্থা এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের বিশেষজ্ঞরা সেখানে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস তথা আইইডি বা হাতে তৈরি বোমা উৎপাদনের হদিস পান। উদ্ধার করা হয় বেশ কিছু অবিস্ফোরিত ‘পাইপবোমা’ এবং বোমা তৈরির যন্ত্রাংশ। এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে পরে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হারকাতুল জিহাদের চার জঙ্গিকে ঢাকায় আটক করেছিল। তাদের মধ্যে ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার এক পলাতক আসামী ছিলেন। অস্ত্র এবং বিস্ফোরকসহ দু’জনকে ঢাকার উত্তরা থেকে এবং অন্য দু’জনকে ধরা হয় আশুলিয়া থেকে। সেসময় আটক ৪ জনের কাছ থেকে এসএমজির ১,১০০ রাউন্ড গুলি, পিস্তলের ৩২টি গুলি এবং এক কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। হেফাজতে ইসলামের নিয়ন্ত্রণাধীন লালখান বাজারের মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে বিস্ফোরণের পর উদ্ধারকৃত বোমাগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘হাতে তৈরি গ্রেনেড’ উল্লেখ করেছিল পুলিশ। তখন এ ঘটনাকে মাদ্রাসা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের ষড়যন্ত্র দাবি করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয় বিভিন্ন পক্ষ থেকে। তবে বোমা বিশেষজ্ঞরা পরে ‘পাইপবোমা’ শনাক্ত করেন। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসেও একই ধরনের ১১টি বোমা উদ্ধার করা হয়েছিল চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকা থেকে। তখন বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে এই প্রযুক্তির বোমা তৈরি হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সর্বাধিক নাশকতা চালানোর অভিযোগ আছে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার বিরুদ্ধে। সেসময়কার গোয়েন্দা তথ্য থেকে আরও উঠে আসে, লস্করের সাথে জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার পরিচালক- হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ও নেজামে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুফতি ইজহারুল ইসলাম এবং তার ছেলে মুফতি হারুন ইজহারের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ২০১১ সালে গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুফতি হারুন নিজে এই তথ্য দেন পুলিশকে। এর আগে ২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তার বাবা মুফতি ইজহারুল ইসলাম- যিনি উপমহাদেশের একজন শীর্ষ জঙ্গি নেতা হিসেবে কুখ্যাত। হারুন ইজহার (ডানে), বিএনপির প্রতিমন্ত্রী টুকুর সাথে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার মধ্যে আইইডি তৈরির কারিগর হিসেবে যার নাম বেশি প্রচারিত তিনি হলেন ভারতের মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের ডান হাত হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আবদুল করিম ওরফে টুণ্ডা। লস্কর ও উগ্র জঙ্গিবাদের সমর্থক এই সন্ত্রাসী টুন্ডা ২০১৩ সালের আগস্টে নেপালে গ্রেপ্তার হন। টুণ্ডা গোপনে ভুয়া পরিচয়ে বাংলাদেশে এসেছিলে এবং জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন- এমন তথ্যও পেয়েছিল সেসময় দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সেসময় দায়িত্বরত গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং বোমা বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, লালখান বাজারের মাদ্রাসাটির ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধারকৃত বোমাগুলো পাইপবোমা প্রযুক্তির। যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এসব বোমা বিমানবন্দরের স্ক্যানার এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কুকুরও শনাক্ত করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা এই প্রতিবেদককে জানান, এই বোমার উপকরণের সঙ্গে কফি মিশিয়ে রঙ এবং ঘ্রাণ পরিবর্তন করে জঙ্গিরা একে শনাক্তের অযোগ্য করে তোলে। মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে অসংখ্যবার এমন বোমা হামলার শিকার হয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এসব বোমা তাদের বেশ ভুগিয়েছে। পরে আফগানিস্তানে এ ধরনের বোমা নিষ্ক্রিয় করতে ‘ওয়াটার ব্লেড স্টিংরে’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমেরিকানরা। সেসময় দায়িত্বরত দেশের একটি নিরাপত্তা সংস্থার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাইপবোমা স্ক্যানারে ধরা পড়ে না। প্রশিক্ষিত কুকুরও গন্ধে বিভ্রান্ত হয় বলে তারাও ব্যর্থ হয়। দেশের বিভিন্ন হার্ডওয়্যার দোকানে এই বোমা তৈরির মূল সরঞ্জাম পাইপ ও সকেট (স্যানিটারি কাজে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম) পাওয়া যায়। অন্য উপকরণ যেমন- ইউরিয়া, নাইট্রিক এসিড, পটাশিয়াম ক্লোরাইড, নাইট্রোবেঞ্জিন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড এবং চিনির মতো সহজলভ্য জিনিস দিয়ে এই শক্তিশালী বোমা তৈরি করা সম্ভব। স্ক্যানার ও প্রশিক্ষিত কুকুর এই বোমার অবস্থান নির্ণয়ে ব্যর্থ হলে তা হবে ভয়ঙ্কর। ২০১৩ সালের সেই বিস্ফোরণের পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) তাদের প্রতিবেদনে লেখে: ‘বিস্ফোরণের পর মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে ৪টি অবিস্ফোরিত হ্যান্ড গ্রেনেডসদৃশ বোমা, ২৫০টি জিআই পাইপের টুকরো, ১০০টি মার্বেল, একটি তার প্যাঁচানো মোবাইল সেট, ২০০ গ্রাম জিআই তার, প্যাঁচানো স্প্রিং এবং দুটি স্লাইডরেঞ্জ উদ্ধার করা হয়েছে।’ পুলিশ প্রথমে উদ্ধারকৃত বোমাকে পুরনো ভার্সনের হাতে তৈরি গ্রেনেডসদৃশ বললেও হাতে তৈরি গ্রেনেডের সঙ্গে জিআই তার ও মোবাইল ফোন সংযুক্তির বিষয়টি আমলে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা একে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে ব্যবহৃত পাইপবোমা হিসেবে শনাক্ত করতে সমর্থ হন। তৎকালীন সিএমপির গোয়েন্দা শাখার উপপরিদর্শক ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্য সন্তোষ চাকমা ২০১১ সালে হাটহাজারী থেকে উদ্ধারকৃত বোমার সঙ্গে মুফতি হারুন ইজহারের মালিকানাধীন লালখান বাজারের মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধারকৃত বোমার মিল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। বোমা বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইইডি তৈরি করছে। মোটা লোহার পাইপের ভেতর বিস্ফোরক রেখে এই বোমা তৈরি হয়। বিস্ফোরণ ঘটাতে বোমার বাইরে রাখা হয় গ্রেনেডের মতো পিনের বিশেষ আংটা। এ ধরনের বোমাকে প্রেসার রিলিজ বোমাও বলা হয়। এই বোমার বাইরে থাকা বিশেষ আংটা ছুড়ে মারার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বাইরে শক্ত লোহার আবরণ থাকায় এর ধ্বংস ক্ষমতা বাড়ে। আর বোমার ভেতরে বিস্ফোরক ও ধারালো বস্তু থাকায় সেসব স্প্লিন্টার ছুটে গিয়ে মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক বোমা বিশেষজ্ঞ বলেন, এ ধরনের বোমায় ইনিশিয়েটরের পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় ব্যাটারি। আবার ব্যাটারির পরিবর্তে সরাসরি মোবাইল ফোনও ব্যবহৃত হয়। বিস্ফোরককে অ্যাক্টিভেট করতে ব্যাটারি বা মোবাইল ফোন যুক্ত করা হয়। বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে জঙ্গিরা হাতবোমা তৈরির জন্য এ রকম প্রযুক্তি ব্যবহার করে। বাংলাদেশে জেএমবির কুখ্যাত জঙ্গি জাহেদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজান প্রথম এই প্রযুক্তির বোমা তৈরি করেছিল বলে গোয়েন্দা তথ্য আছে। এরপর মাসুম নামের আরেক জেএমবি জঙ্গি বোমা তৈরিতে হাত পাকায়। হেফাজত নিয়ন্ত্রিত লালখান বাজারস্থ মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত নূরুন্নবীও তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। আবদুল করিম টুণ্ডার প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত এই আইইডি প্রযুক্তির বোমা তৈরির ক্ষেত্রে ভারতে নব্বইয়ের দশকে বেশ কুখ্যাতি অর্জন করেন লস্কর-ই-তৈয়বার নেতা আবদুল করিম। বোমা বানাতে গিয়ে বাঁ-হাতের খানিকটা উড়ে গেলে তিনি নামের পাশে টুণ্ডা বিশেষণ যোগ করেন। দিল্লি পুলিশের বরাতে জানা যায়, দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন টুণ্ডা। ৪৩টি বিস্ফোরণের ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত টুণ্ডার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আশির দশকে তিনি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর কাছে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। এই টুণ্ডা বাংলাদেশে এসেও জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন। আর এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় গ্রেপ্তারের পর আটক মুফতি হারুনের দেওয়া তথ্যে। ২০১১ সালের ৫ই নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি ঢাকার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে স্বীকার করেন, লস্করের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। ২০১৩ সালের বিস্ফোরণের পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দুই আর দুই-এ চার মেলান। লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সুবাদে তাদের শেখানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চট্টগ্রামের সেই হেফাজতি মাদ্রাসায় বোমা তৈরি করা হচ্ছিল। বিশ্ব গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাংলাদেশ ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের পর আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের হাব হয়ে উঠেছে লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকায় ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইজহারপুত্র মুফতি হারুনকে গ্রেপ্তার হন। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে হেফাজতে ইসলামের নেতা মুফতি হারুনের বিরুদ্ধে খোদ হেফাজতে্ ইসলামের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার পিতা মুফতি ইজহারও পরে একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তিনিও দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দারা তাকে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে এলে তিনি দুই আঙুল তুলে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, আমি মহাজোটের প্রতিষ্ঠাতা। লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের পরপরই পালিয়ে যান মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী। ২ বছর পলাতক থাকার পর পুনরায় লালখান বাজার মাদ্রাসায় ফেরেন। গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা তিন মামলায় মুফতি ইজহার ও তার ছেলে হারুন ইজহারসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। বিস্ফোরক, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ও একটি হত্যাসহ তিনটি মামলায় জামিন না নেয়ায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয় মুফতি ইজহারের বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মুফতি ইজাহারুল ইসলামের পরিচালনাধীন লালখান বাজারে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় গড়ে উঠেছিল আন্তঃদেশীয় জঙ্গিদের ঘাঁটি। যেখান থেকে ২০০৯ সালের শেষ দিকে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার ছক তৈরি হয়েছিল। এ হামলা পরকিল্পনা করেছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠন লস্কর ই-তৈয়বা। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইজহারুল ইসলামের ছেলে হারুন ইজহার। ফের সেখান থেকেই বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ছক কষা হয়েছিল বলে পুলিশ ও গোয়েন্দারা জানান। ২০০৯ সালের শেষ দিকে খবর পাওয়া যায়, যে কোনো সময় ঢাকাস্থ দুটি দূতাবাসে জঙ্গি হামলা হতে পারে। এ তথ্যের ভিত্তিতে ও একটি টেলিফোন কলের সূত্র ধরে জানা গেছে, হামলার ছক মুফতি ইজহারের মাদ্রাসায় বসেই করা হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত আন্তঃদেশীয় কয়েকজন জঙ্গি মুফতি ইজহারুলের মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন। এ তথ্য পেয়েই গোয়েন্দা পুলিশ ওই মাদ্রাসায় অভিযান চালায়, গ্রেপ্তার করা হয় ইজহারপুত্র হারুন ইজহার এবং দক্ষিণ ভারতীয় সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য ভারতীয় নাগরিক শহিদুল, সালাম, সুজন ও আল আমিন ওরফে মইফুলকে। সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ওই অভিযানকালে গোয়েন্দা পুলিশ হারুন ইজহারের কক্ষ থেকে একটি ল্যাপটপ জব্দ করে। ওই ল্যাপটপে মার্কিন ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। পুলিশের অভিযান শুরুর আগে সেখান থেকে পালিয়ে যান লস্কর-ই-তৈয়বার অন্যতম শীর্ষনেতা টি নাসির ও সরফরাজ। ওই বছরের ৬ই নভেম্বর কুমিরা সীমান্ত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে দুই ভারতীয় জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়। তারা ভারতের বেঙ্গালুরু কম্পিউটার সিটিতে বোমা হামলাসহ বেশ কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত। তারা ছিলেন ভারতে মোস্ট ওয়ান্টেড। গ্রেপ্তার এড়াতে দুই জঙ্গি দুবাই হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় মুফতি ইজহারের মাদ্রাসায়। এর আগে রাউজান রাবার বাগান গোদারপাড় এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় হুজির প্রশিক্ষণকালে অভিযান চালিয়ে জিহাদি বই ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে র‌্যাব। এ ঘটনায় বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলায় মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীসহ আটজনকে আসামি করা হয়। ২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগের র‌্যাব-৭ এর হাতে দুই সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম। হরকাতুল জিহাদের (হুজি) তৎকালীন আমির মাওলানা ইয়াহিয়া ওরফে বর্দ্দা (৪৬) এবং তার দুই সহযোগী মো. বাহাউদ্দিন (২২) ও ইয়ার মোহাম্মদকে (৫০) গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াহিয়া জানান, বৃহত্তর চট্টগ্রামে হুজির আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসায় সাংগঠনিক অফিস খোলা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের প্রাণনাশের চেষ্টার অভিযোগে আটক হওয়া কয়েকজন জঙ্গি জানায়- তারা মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসাতেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

[TheChamp-FB-Comments]
ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
শ্রমিক অসন্তোষে স্থবির দেশের প্রধান রপ্তানি খাত: বড় সংকটের মুখে তৈরি পোশাকশিল্প বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা ও দাফনে জামায়াত-শিবিরের বাধার ঘটনার প্রতিবাদে শৈলকুপায় মানববন্ধন ইউনূস আমলে হামের টিকার অনিয়ম তদন্তে কমিশন গঠন মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের জের ধরে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ ৫ই নভেম্বর, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এই অঞ্চলের একাধিক পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করছেন। একপর্যায়ে পুলিশের রক্তচক্ষু ও বাধা উপেক্ষা করে হাজারো শ্রমিক রাজপথে নেমে এলে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। সকালে সাভার ও আশুলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে শ্রমিকেরা যথারীতি উপস্থিত হলেও তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে কর্মবিরতির ডাক দেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সার্বিক নিরাপত্তাশঙ্কা দেখা দিলে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের জামগড়া, নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুর এলাকার একাধিক পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। কাঠগড়া এলাকার একটি বিশিষ্ট শিল্পগ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় এই অঞ্চলের অধিকাংশ কারখানাতেই ইতিমধ্যে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু কারখানায় শ্রমিকেরা ভেতরে থাকলেও তারা উৎপাদন কাজ বন্ধ রেখেছেন। সকাল ১০টার পর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পরিস্থিতি মোড় নেয় নতুন দিকে। সেখানকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা এক জোট হয়ে সড়কে অবস্থান নেন এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে বাধা দিলে তৈরি হয় মুখোমুখি অবস্থান, যা এলাকায় তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করে। পরে শ্রমিকেরা পুলিশের সে বাধা তোয়াক্কা না করেই একযোগে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং জামগড়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল, পদ্মার মোড় এবং আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের বিভিন্ন কৌশলগত ও সংবেদনশীল পয়েন্টে পুলিশ ছাড়াও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিক্ষোভরত শ্রমিকদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের কাছাকাছি অবস্থানে থেকে সতর্ক টহল দিচ্ছেন। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য পুরো শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ট্রাম্প শ্রমিকদের কারখানায় ফিরে আসার আহ্বান শ্রমমন্ত্রীর খুলনা অঞ্চলে চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্য সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে ফের সড়ক অবরোধ শেকৃবি শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করবে সংসদীয় ককাস যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ ইরান যুদ্ধ: জেডি ভ্যান্স ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ থেকে ডিজিই-পে বিচ্ছিন্ন করল বাংলাদেশ ব্যাংক তরঙ্গ নবায়ন ব্যয় যৌক্তিক করার আহ্বান মোবাইল অপারেটরদের এশিয়া ফাউন্ডেশনের প্রকল্পে ৯০ হাজার উদ্যোক্তাকে সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বাংলাদেশ নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা তদন্তের দাবি, ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর Newsmax-এ বিশেষ কলাম বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হতে চায় বাংলাদেশ: তিতুমীর শ্রমিক আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থানে সরকারঃ পুলিশ ও দলীয়কর্মী ছাড়াও ২৫ প্লাটুন যৌথ বাহিনী মোতায়েন জাতীয়ভাবে উপেক্ষিত জেলহত্যা দিবস, সিলেটে নিষেধাজ্ঞা, মব-গ্রেফতার হুমকির মাথায় নিয়েই আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতাদের স্মরণ জুলাইর ওয়াসিম হত্যা-মামলার আসামিকে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব দেওয়া কি পুরস্কার? প্রশ্ন- কারা মেরেছে তবে ওয়াসিমকে? বাপে মারছে সৈনিক, মায়ে মারছে কৃষক, পোলায় মারছে শ্রমিক’—এমন স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গতকাল মঙ্গলবারও এসব এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। আজ বুধবার সকালেও গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে নতুন করে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলগুলোয় অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গাজীপুরে হামলায় গুরুতর আহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেন। সোমবার গাজীপুরের জয়দেবপুরের বাহাদুরপুর এলাকায় নোমান টেরি টাওয়েল মিলসের সামনে সংঘর্ষের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করার সময় হামলার শিকার হন তিনি। পরে স্বজনরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি গাজীপুরের লায়লা স্টাইল লিমিটেডের শ্রমিক ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর পর গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকার কয়েকটি কারখানায় গতকাল ছুটি ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে প্রচলিত ন্যূনতম মজুরিতে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সংকটে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। এ অবস্থায় মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, শ্রমিকদের ওপর হামলা এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় চাকরিচ্যুতির অভিযোগেরও প্রতিকার চাইছেন শ্রমিকরা। আজ বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার সাইনবোর্ড, বাংলাবাজার ও মির্জাপুর এলাকায় দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়। পরে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। জয়দেবপুর, সালনা, রাজেন্দ্রপুর ও শফিপুর এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাংলাবাজার ও কাশিমপুর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। গাজীপুরের বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী এলাকাতেও সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। তাঁদের সরিয়ে দিতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর পর বাংলাবাজার এলাকার কয়েকটি কারখানায় বুধবারও ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে কতটি কারখানা বন্ধ ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সাভারের হেমায়েতপুরেও আজ সকালে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার হেমায়েতপুর এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। দুপুর থেকে বিকাল ৫টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত চলা অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। পরে শ্রমিকরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করলে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়ও আজ বুধবার নতুন করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের পাশে কুতুবাইল কাঠেরপুল এলাকায় জড়ো হন কয়েকটি কারখানার শ্রমিক। তাঁরা মূল সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের অভিযোগ, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। এ সময় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাঁদের ওপর হামলা চালান। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ছোড়া টিয়ার গ্যাসে স্থানীয় একটি হোসিয়ারি কারখানার শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাজধানীর মিরপুরেও গতকাল মঙ্গলবার শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। সংঘর্ষে চার পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে কালশী সড়কে এক পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংঘর্ষের কারণে মেট্রোরেল চলাচলেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। নিরাপত্তার কারণে মিরপুর-১০ স্টেশনে প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হয়। আজ বুধবার মিরপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের দাবি, বুধবার শ্রমিকদের সড়কে নামার সুযোগ হয়নি এবং অনেক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দৈনিক বাংলার প্রকাশিত বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ৩০৬টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এতে ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৭৯৩ শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হয়। এর আগে ১ নভেম্বর ৫২৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল এবং কর্মস্থল ছেড়েছিলেন ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ জন শ্রমিক। অর্থাৎ আন্দোলনের প্রভাবে একাধিক শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আজ বুধবার সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে মোট ২৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া ও বাইপাইল এলাকায় পাঁচ প্লাটুন, গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ১৩ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছয় প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করছে। এর পাশাপাশি পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও শিল্পাঞ্চলে টহল দিচ্ছেন। এদিকে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ছয় সদস্যের এ বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ বুধবার। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ আজাদ সোবহানি। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন এ বি এম সামসুদ্দিন ও আসিব আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাবুল আক্তার ও আনোয়ার হোসেন। শ্রমিকদের প্রত্যাশা, নতুন মজুরি বোর্ড দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন থামেনি; বরং রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের ক্ষোভ, অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার চাপ—সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক খাতের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ডিবি হেফাজতে ইকবাল সোবহান চৌধুরীঃ ২৭ মাস সমঝোতা করেও শেষ রক্ষা হলোনা শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টার