নিউজ ডেক্স
আরও খবর
মেট্রোরেলে নাশকতার ২ বছর: সমন্বয়ক হাসিবের স্বীকারোক্তির পরও কেন দুই সরকারের আমলে হয়নি বিচার?
জাতিসংঘের ‘নিহত’দের তালিকায় নাম, ভিডিও বার্তায় জীবিত হাজির পাবনার রাফি
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বিএনপি সরকার: ভারতের পদাঙ্ক অনুসরণে উত্তরণের চিন্তা
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন: সফর সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি দেশে ফিরছেন স্পিকার
আওয়ামী লীগের ‘১.৫ ট্রিলিয়ন অর্থনীতি’র লক্ষ্যমাত্রা বিএনপি আমলে নামল ১ ট্রিলিয়নে, সময়ও বাড়ল ১০ বছর
তরুণদের মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে টানতে এনসিপি নেতাদের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বৈঠক!
জামায়াতের সদস্যদের লিঙ্গভিত্তিক শিক্ষকতার নির্দেশ: মহিলা মাদ্রাসায় ধর্ষণ ঠেকানোই কি উদ্দেশ্য, নাকি নতুন কোনো কূটকৌশল?
গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি: ভোগান্তিতে আবাসিক গ্রাহক, শিল্প ও পরিবহন খাত
দেশের একটি ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতে তীব্র গ্যাসসংকট দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, এফএসআরইউর কারিগরি সমস্যার কারণে গ্যাস সরবরাহে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। তবে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, টার্মিনাল সচল হলেও গ্যাসসংকট পুরোপুরি দূর হবে না।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না। কেউ বৈদ্যুতিক চুলা, কেউ এলপিজি সিলিন্ডার, আবার কেউ বিকল্প উপায়ে রান্না করছেন।
মিরপুরের বাসিন্দা আসমা বলেন, শনিবার সকাল থেকে চুলায় গ্যাসের চাপ ছিল না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও রান্না করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বাইরে থেকে খাবার কিনতে হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা মিতু বলেন, গ্যাস এলেও চাপ এত কম যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। বিকল্প ব্যবস্থায় রান্না করতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।
গ্যাসসংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক চালক গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তাঁদের দৈনিক আয়ও কমে যাচ্ছে।
শাহবাগ এলাকার একটি সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষমাণ চালক আমিনুর বলেন, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কয়েক ঘণ্টা পর পর্যন্ত গ্যাস পাননি। এতে দিনের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আরেক চালক ইকরাম বলেন, গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গ্যাস না পাওয়ায় গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে আয়ও কমে যাচ্ছে।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ক্ষতির পাশাপাশি শ্রমিক ও কর্মীদের কাজেও প্রভাব পড়ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে পড়েছে। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি স্টেশন প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস নিতে পারছে না। এতে কিছু এলাকায় দীর্ঘ সারি ও সাময়িক জনভোগান্তি তৈরি হয়েছে।
বিভাগের ভাষ্য, এফএসআরইউর কারিগরি সমস্যা দ্রুত সমাধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে সীমিত গ্যাসের সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জরুরি ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটি হলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতা। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর কোনো অংশে সমস্যা দেখা দিলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে পাঁচটি কূপ খননের একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
এ ছাড়া স্থল ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার এবং জ্বালানি আমদানির উৎস ও অবকাঠামো বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চতুর্থ এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান, মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার বিভিন্ন বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে।
তিতাস গ্যাসের অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, বর্তমানে তাঁরা প্রায় এক হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাচ্ছেন, যেখানে চাহিদা প্রায় এক হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তিনি বলেন, এফএসআরইউ মেরামত হয়ে গেলেই সংকট শেষ হবে—এমন নয়। টার্মিনাল সচল থাকার সময়ও তিতাসকে দৈনিক প্রায় এক হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হতো। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে চলে যায়। ফলে অন্যান্য খাতের জন্য অবশিষ্ট থাকে প্রায় এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন এক হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সে হিসাবে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকেই যাবে।
জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দেশে প্রায়ই এ ধরনের সংকট তৈরি হয়। এটি মোকাবিলায় অন্তত ১৫ দিনের এলএনজি সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, একটি স্থলভিত্তিক (ল্যান্ডবেজড) এফএসআরইউ নির্মাণ জরুরি। কারণ সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়া দেখা দিলে ভাসমান টার্মিনালের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।