বিয়ে না করে জীবন কাটানো কি শরিয়তসম্মত?
মানবজীবনের ভারসাম্য, প্রশান্তি এবং বংশবৃদ্ধির এক সুন্দর ও পবিত্র অনুঘটক হলো বিয়ে। এটি কেবল দুটি মানুষের সামাজিক বন্ধন নয়, বরং আত্মিক প্রশান্তি অর্জনের এক অপূর্ব ইসলামি মাধ্যম। তবে জীবনের কোনো এক পর্যায়ে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে কারো মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে— কোনো মানুষ কি চাইলে সারা জীবন বিয়ে না করে একা কাটিয়ে দিতে পারে? ইসলামি শরিয়তে এই সিদ্ধান্তকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং একজন ব্যক্তির শারীরিক ও সামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে বিয়ের বিধান কেমন হয়, তা জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বিয়ে না করে সারা জীবন চিরকুমার বা চিরকুমারী হয়ে থাকা ইসলামে নিরুৎসাহিত ও অপছন্দনীয় (মাকরুহ) একটি বিষয় হলেও, এটিকে সর্বাবস্থায় সরাসরি ‘হারাম’ বা কবিরা গুনাহ বলা যায় না। শরিয়তের দৃষ্টিতে ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক অবস্থা এবং পাপাচারের আশঙ্কার ওপর নির্ভর করে বিয়ের হুকুম বা বিধান ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়।
ব্যক্তির অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বিয়ের শরঈ হুকুম—
ওয়াজিব (অবশ্যকরণীয়): কোনো ব্যক্তির যদি স্বাভাবিক বা প্রবল যৌন চাহিদা থাকে এবং বিয়ে না করলে জেনা, ব্যভিচার কিংবা কোনো হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট ভয় থাকে, তবে তার জন্য বিয়ে করা ওয়াজিব। এই অবস্থায় সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিয়ে না করে একা থাকা গুনাহের কারণ।
সুন্নতে মুয়াক্কাদা (সুনির্দিষ্ট সুন্নাত): যে ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাভাবিক যৌন চাহিদা রয়েছে এবং তিনি নিজেকে হারাম কাজ থেকে মুক্ত রাখার সক্ষমতাও রাখেন, তার জন্য বিয়ে করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এটি মহানবী (সা.)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।
মুবাহ বা জায়েজ: কোনো ব্যক্তির যদি যৌন চাহিদা একেবারেই না থাকে (যেমন— জন্মগত অক্ষমতা, বার্ধক্য কিংবা শারীরিক জটিলতা) এবং বিয়ে না করলেও কোনো প্রকারে গুনাহে জড়ানোর ন্যূনতম ভয় না থাকে, তবে তার জন্য বিয়ে না করে একাকি জীবন কাটানো জায়েজ বা অনুমোদিত।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিয়ের তাগিদ
ইসলামে বৈরাগ্যবাদ বা চিরকুমার জীবনযাপনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং যথাসময়ে বিয়ের মাধ্যমেই চরিত্র রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—
وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَاءِكُمْ ۚ إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ
‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং তোমাদের সৎকর্মশীল দাস ও দাসীদের বিয়ে দাও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছলতা দান করবেন।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩২)
অনুরূপভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের বিয়ের তাগিদ দিয়ে এবং অহেতুক বৈরাগ্য বর্জন করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন—
Advertisement
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ
‘হে যুবকের দল! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কারণ তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর যার বিয়ের সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে; কেননা রোজা তার কামভাব দমন করবে।’ (বুখারি ৫০৬৬, মুসলিম ১৪০০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, একাকি থাকা বা অহেতুক বিয়ে এড়িয়ে চলা তার আদর্শের অংশ নয়—
النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
‘বিয়ে হলো আমার সুন্নত (আদর্শ)। সুতরাং যে আমার সুন্নত অনুযায়ী আমল করল না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (ইবনে মাজাহ ১৮৪৬)
বিয়ে কেবল শারীরিক চাহিদাপূরণের হাতিয়ার নয়, বরং দ্বীনকে পূর্ণতা দেওয়ার এবং একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের শরিয়তি মাধ্যম। বিশেষ কোনো বাধ্যবাধকতা বা শারীরিক অক্ষমতা না থাকলে বিনা কারণে সারা জীবন চিরকুমার থাকার মানসিকতা ইসলামী জীবনদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই প্রতিটি সামর্থ্যবান ও সক্ষম মানুষের উচিত সুন্নাহর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে রবের ওপর ভরসা রেখে দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে নিজের চরিত্র ও ঈমানকে হেফাজত করা।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
[TheChamp-FB-Comments]