নিউজ ডেক্স
আরও খবর
প্রেম করছেন শেহনাজ গিল
নিজের এআই ছবি-ভিডিও দেখে হুঁশিয়ারি দিলেন কনকচাঁপা
এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা
কেন ওয়াদুদকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন জানালেন মৌসুমী
জুলাই নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট করলেন মেহের আফরোজ শাওন
সবার সামনে সামান্থাকে ‘লাভ ইউ’ বলতে নারাজ রাজ, কিন্তু কেন?
স্ত্রী আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় অভিনেতা জাহের আলভী কারাগারে
চুয়াত্তরেও সেই জাদু রুনা লায়লার কণ্ঠে
কিছু কিছু সন্ধ্যা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা থাকে না, থেকে যায় মানুষের স্মৃতির মানসপটে। কিছু কিছু গান কেবল শ্রবণে নয়, হৃদয়ের গভীরে গিয়ে বাজে।
আর কিছু শিল্পী সময়ের সীমানা পেরিয়ে হয়ে ওঠেন একটি দেশের গর্ব, একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। কিংবদন্তি রুনা লায়লা তেমনই এক নাম, যার কণ্ঠে উপমহাদেশের সংগীতের কয়েক দশকের ইতিহাস, যার গানে প্রেম, বিরহ, দেশপ্রেম আর জীবনের অসংখ্য রঙ জুড়ে রয়েছে।
গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তন যেন সাক্ষী হলো তেমনই এক স্মরণীয় রাতের। ৬২ বছরের দীর্ঘ সংগীতজীবনে এই প্রথম শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে একক সংগীতানুষ্ঠানে মঞ্চে উঠলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা।
সন্ধ্যা ৭টায় তিনি মঞ্চে পা রাখতেই মুহূর্তেই দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা। সেই করতালিতে যেন একসঙ্গে মিশে গেল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর দীর্ঘদিনের সুরসঙ্গীর প্রতি অগাধ কৃতজ্ঞতায়।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত এই বিশেষ সন্ধ্যায় বাংলা গানে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রুনা লায়লাকে সম্মাননাও জানানো হয়। সম্মাননা গ্রহণের পরই শুরু হয় তার সুরের যাত্রা।
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে ‘দেশের জন্য যারা দিয়ে গেছো প্রাণ’ গান দিয়ে পরিবেশনা শুরু করেন রুনা লায়লা। এরপর একে একে গেয়ে শোনান ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’, ‘যখন থামবে কোলাহল, ঘুমে নিঝুম চারপাশ’, ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে’ ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় গেঁথে দাওনা মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা’, ‘বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িতে গেলাম’, ‘অনেক কষ্ট ঝরে তুমি এলে’, ‘সাধের লাউ বানাইলো মোরে বৈরাগী’সহ তার জনপ্রিয় সব গান।
আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান ও দেশাত্মবোধক সংগীত সব মিলিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টার পরিবেশনায় তিনি গেয়ে শোনান ১১টি গান।
গান শুনে দর্শক সারি থেকে কখনো কখনো করতালি যেন একটু কম হয়ে যাচ্ছিল। শিল্পীকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য করতালি দেওয়ার অনুরোধ করে রুনা লায়লা নিজেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘বয়স হয়েছে তো, কানে একটু কম শুনি। বারে বারেই বলছি, ‘আই অ্যাম সেভেন্টি ফোর ইয়ার্স ওল্ড।’ অমনি মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মিলনায়তন।
এর মধ্যে একটা নজরুলগীতিও পরিবেশন করেন রুনা লায়লা। ‘ভুলিতে পারি নে তাই, আসিয়াছি পথ ভুলি’- গানটি কখনোই মঞ্চে গাননি বলে জানান তিনি।
শেষ গান ছিল তার কণ্ঠের সেই বিখ্যাত গান ‘দামাদাম মাস্ত কালান্দার’। ‘ও লাল মেরি পাত রাখিও ভালা ঝুলে লালেঁ’ ধরতেই দর্শকদের মধ্যে যেন শেষ সময়েও নতুন এক উদ্দীপনা তৈরি করে অনুষ্ঠানস্থলে।
প্রতিটি গানের শেষে মিলনায়তন ভেসে গেছে করতালিতে। ৭৪ বছর বয়সেও তার কণ্ঠের দীপ্তি, গায়কির মাধুর্য আর মঞ্চজুড়ে প্রাণবন্ত উপস্থিতি মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। বয়স যেন সেখানে শুধুই একটি সংখ্যা; সুরের কাছে যার কোনো হিসাব নেই। তবে কিছুটা বেগ তো পেতেই হয়। দুইবার গানের ফাঁকে একটু বসে জিরিয়ে নেন তিনি।
এই শিল্পীর ৬২ বছরের সঙ্গীতের ক্যারিয়ারে শিল্পকলায় এটাই প্রথম তার কোনো অনুষ্ঠান। এ নিয়ে তার মধ্যে কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও ‘অবশেষে’ তাকে নিয়ে এমন অনুষ্ঠান আয়োজন করায় আয়োজকদের ধন্যবাদ দেন রুনা লায়লা।
বন্যার্তদের সাহায্যার্থে এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। আফজাল হোসেনের উপস্থাপনায় চলছিল রুনা লায়লার একক সঙ্গীতানুষ্ঠান।
গানের ফাঁকে ফাঁকে উপস্থাপকের সঙ্গে ছোট ছোট কথোপকথন চলছিল শিল্পীর। একবার অবশ্য রুনা লায়লা বলেই বসেন, ‘গানের থেকে আফজাল হোসেনের কথা শুনতেই ভালো লাগছে।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল। রুনা লায়লার গান শোনার পর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, গুণীজনদের আমাদের সম্মান করা কম হয়। ভীষণ ভালো লাগলো, আমাদের তো আর এমন সময় হয় না, এরকম করে গান শোনার। আসব না, আসব না করে চলে আসছি। বহু বছর পর মনে হলো নিজের মতো করে গান শুনলাম। আমাদের আরও এই গুণীজনদের শ্রদ্ধা করা উচিত, সম্মান করা উচিত। তারা আমাদের দেশের যে সম্পদ সেটা আরও কাজে লাগানো উচিত।
এক সময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক হেলাল খান বলেন, এ সম্মাননা ছিল রুনা লায়লার প্রাপ্য ছিল। আমরা বাংলাদেশের মানুষ তার জন্য কিছুই করতে পারিনি! বিশ্বের অনেক মঞ্চে তাকে অনুষ্ঠান করতে দেখেছি। আজ তার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেছে। একটার পর একটা গান যখন উনি গেয়েছেন মনে হয়নি বয়স হয়েছে। মনে হয়েছে আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে যেমন করেছেন তেমনই গেয়েছেন। আমার মনে হয় তিনি আমাদের সম্পদ, তাকে আমরা আরো ধরে রাখতে চাই। তিনি আমাদের দেশ ও সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য আরও অনেক কিছুই দিতে পারবেন।
‘প্রেমের তাজমহল’ সিনেমার নির্মাতা গাজী মাহবুবের কাছেও সন্ধ্যাটি ছিল বিশেষ আবেগের। তার পরিচালিত সিনেমায় রুনা লায়লা গান গেয়েছেন, সেই গানের জন্য পেয়েছেন বাচসাস পুরস্কারও। তবে সেসব স্মৃতির বাইরে এদিন একসঙ্গে রুনা লায়লার এতগুলো গান সরাসরি শোনার অভিজ্ঞতাকেই নিজের বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন তিনি। তার ভাষায়, উপস্থিত সবাই নতুন করে উপলব্ধি করেছেন, রুনা লায়লা আসলে কত বড় একটি অধ্যায়ের নাম।
তেজগাঁও কলেজের অধ্যাপক, লেখিকা ও গায়িকা মাহবুবা বেগমের অনুভূতিতেও একই সুর। তার কথায়, ‘একজন রুনা লায়লা আমাদের আছে বলেই বাংলাদেশি হিসেবে আমরা সবাই গর্ব করতে পারি।’ ৭৪ বছর বয়সে তার এমন প্রাণবন্ত পরিবেশনার সাক্ষী হতে পারাকে তিনি নিজের জীবনের একটি ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেছেন।
অনুষ্ঠানে আসা দর্শকদের কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল, ৭৪ বছর বয়সেও রুনা লায়লার কণ্ঠে ও গানের তালে কোনো ক্লান্তির ছাপ না থাকা। সুরের জাদুতে যেন তারুণ্যের রুনা লায়লাই মুগ্ধ করছিলেন দর্শক-শ্রোতাকে।
মডেল ও উপস্থাপক আমির পারভেজের উপলব্ধি আরও গভীর। একটি লাইভ অনুষ্ঠানে রুনা লায়লার নিজের মুখে ‘আই অ্যাম সেভেন্টি ফোর ইয়ার্স ওল্ড’ কথাটি শুনে তিনি যেমন বিস্মিত হয়েছেন, তেমনি মুগ্ধ হয়েছেন তার প্রাণশক্তি, কর্মনিষ্ঠা, শৃঙ্খলা এবং সংগীতের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।
তার মতে, রুনা লায়লা তাদের জন্য জীবন্ত অনুপ্রেরণা, যারা বয়স বা সময়কে অজুহাত করে স্বপ্ন দেখা থামিয়ে দেন।
কনসার্ট শেষ হওয়ার পরও দর্শকদের আনন্দের রেশ কাটেনি। কেউ কেউ অনুষ্ঠান থেকে বের হয়েছেন প্রিয় শিল্পীর গান গাইতে গাইতে। মঞ্চে আফজাল হোসেনের সঙ্গে রুনা লায়লার প্রাণবন্ত মুহূর্ত, তার অনবদ্য পরিবেশনা আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস- সব মিলিয়ে রাতটি হয়ে উঠেছে স্মৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
রুনা লায়লাকে নিয়ে মুগ্ধতার গল্প নতুন নয়। তবে শিল্পকলার এই সন্ধ্যা যেন সেই গল্পে নতুন একটি পৃষ্ঠা যোগ করল। ৬২ বছরের সুরযাত্রার পর ৭৪ বছর বয়সে এসে তিনি আবারও মনে করিয়ে দিলেন- শিল্পীর বয়স বাড়ে, কিন্তু শিল্পের বয়স হয় না।
অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।