নিউজ ডেক্স
আরও খবর
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চার ঘন্টা যানজটে আটকে অ্যাম্বুলেন্সেই রোগীর মৃত্যু
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন: এক বছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে ১৪ লাখ মানুষ
আবেগঘন বার্তায় শ্রমিকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে কারখানা বন্ধ ঘোষণা: ‘টিকিয়ে রাখার অনেক চেষ্টা করেছি, পারলাম না’
থার্ড টার্মিনাল: ৯৯.৯১% কাজ শেষ হলেও ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে ৯০২ কোটি টাকা
রাজনীতি থেকে ধর্ম- অনলাইনে মত প্রকাশে ভয়: ঝুঁকিতে সাংবাদিকতা-বাকস্বাধীনতা
রাশিয়ার মিগ-২৯ থেকে চীনা জে-১০: গল্পটি সক্ষমতার, মিথ্যা এবং ধোঁকাবাজিরও
বাণিজ্যে ভারত-নির্ভরতা বাড়ছেই, দুই বছরে বাণিজ্য ঘাটতি আরও প্রকট
১ কোটি কর্মসংস্থানের সরকারি মূলা ও বাস্তবতা: বিশ্বব্যাংক বলছে কর্মহীন হবেন ৬ লাখ মানুষ, বাড়বে দারিদ্র
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই জ্বালানি সংকট, অটোমেশন, বিনিয়োগ ঘাটতি ও দক্ষতার সংকটে সরকারের কর্মসংস্থান পরিকল্পনা কতটা বাস্তব—প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অভিঘাতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যখন নতুন করে কর্মসংস্থান সংকোচনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তখন আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সময়ে ২০২৬ সালে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল এমন মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এ ২০৩১ সালের মধ্যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শিল্প খাতে ৩৩ লাখ ২০ হাজার এবং সেবা খাতে ৫৮ লাখ ৭০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।
দুটি চিত্র পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সামনে থাকা বৈপরীত্যটি স্পষ্ট হয়। একদিকে বিদ্যমান কর্মসংস্থানই জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার চাপে ঝুঁকিতে।
অন্যদিকে যেসব শিল্পে বড় পরিসরে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেসব শিল্পের একটি অংশে উৎপাদন বাড়লেও প্রযুক্তি ও অটোমেশনের কারণে শ্রমিকের প্রয়োজন কমছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত এবং কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মানসম্মত ও টেকসই কাজের সুযোগ তৈরি করা কতটা সম্ভব হবে।
সংকটের মধ্যে নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোটি চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যও রয়েছে।
এই পরিকল্পনায় এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের মধ্যে শিল্প খাতে ৩৩ লাখ ২০ হাজার কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদনমুখী শিল্পে ২২ লাখ ৮০ হাজার এবং নির্মাণসহ অন্যান্য শিল্পে ১০ লাখ ৪০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলা হয়েছে।
সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ৫৮ লাখ ৭০ হাজার। কৃষিতে প্রায় ৫ লাখ ৯০ হাজার এবং বিদেশে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ কর্মসংস্থানের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কিন্তু পরিকল্পনার লক্ষ্য ও অর্থনীতির বর্তমান প্রবণতার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো বিনিয়োগের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার পরিবেশ কতটা তৈরি হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা করতে হলে অ্যাকশন প্ল্যান নিতে হবে। সাধারণত আমাদের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হলে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১১ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। আর প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে উন্নীত হলে, এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যেতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নির্ভর করবে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কোন দিকে যাচ্ছে তার ওপর। অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে না। পাবলিক খাতের একার পক্ষে এত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব নয়, বলেন তিনি।
নতুন চাকরি তো দূরের কথা, বিদ্যমান চাকরিই ঝুঁকিতে
সরকার যখন এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তখন বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে উঠে এসেছে বিপরীত একটি আশঙ্কা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম, উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়লে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। আর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। এখন সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে।
অর্থাৎ অর্থনীতি যখন নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পর্যাপ্ত সক্ষমতা অর্জন করার আগেই বিদ্যমান কাজ ধরে রাখার লড়াইয়ে পড়ছে, তখন এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিল্পে উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিক কমছে
সরকারের কর্মসংস্থান পরিকল্পনার বড় অংশ নির্ভর করছে শিল্প খাতের ওপর। কিন্তু শিল্প খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—তৈরি পোশাক—এখন এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে উৎপাদন বাড়লেও কর্মীর সংখ্যা কমছে।
আশুলিয়ার একটি বড় তৈরি পোশাক কারখানায় ২০২১ সালের দিকে প্রায় ১৬ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে সেখানে শ্রমিকের সংখ্যা কমে হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার। অর্থাৎ পাঁচ বছরে কমেছে অন্তত আড়াই হাজার কর্মী।
কিন্তু উৎপাদন কমেনি। বরং উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে। এর পেছনে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক সিস্টেম ও অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার।
তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, আরএমজি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের বাস্তবতা খুব বেশি নেই। বরং এ খাতে লোকবল কমে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে অনেক লোক কমে গেছে। আমাদের কোম্পানিতে ১৬ হাজার কর্মী ছিল, এখন আছে সাড়ে ১৩ হাজার।
তিনি বলেন, এ খাতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, আমাদের মেশিনগুলো সব এআই প্রযুক্তির, অর্থাৎ এআই সাপোর্টিং মেশিন। আর আমাদের অফিসে সবকিছুই অটোমেশন। এসব কারণে অফিসেও লোকবল কমে যাচ্ছে। তাতে কিন্তু উৎপাদন কম হচ্ছে না, বরং আগের চেয়ে বেড়েছে। মাঝারি থেকে বড় সাইজের ফ্যাক্টরি, আমরা কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করছি।
আবার সবাই যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এমনটিও নয়, কারণ এটা অনেক ব্যয়বহুল। কিন্তু যারা ব্যবহার করছে, তাতে মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমে যাচ্ছে, বলেন তিনি।
এখানেই সরকারের পরিকল্পনার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যে শিল্পকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সেই শিল্পই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গিয়ে শ্রমনির্ভরতা কমাচ্ছে।
অবশ্য এর অর্থ প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করা নয়। বরং প্রযুক্তির কারণে যেসব কাজ কমে যাচ্ছে, তার বিপরীতে নতুন ধরনের দক্ষতার কর্মসংস্থান তৈরি করা যায় কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সেবা খাতে বড় আশা, কিন্তু অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানই বেশি
সরকার আগামী পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে সেবা খাতে—৫৮ লাখ ৭০ হাজার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সেবা খাতের আকার দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে তা ছিল ২৮ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে এ খাতের আকার বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু সেবা খাত বড় হলেই সেখানে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ সেবা খাতের বিভিন্ন অংশে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করলেও তাদের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যুক্ত। জাতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী, পরিবহন ও সংরক্ষণ খাতে নিয়োজিত জনবল ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ১৬৮।
দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। এসব কর্মীর বড় অংশের নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, কর্মস্থলের নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক সুরক্ষা নেই।
ফলে এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পূরণ হলেও তার কত অংশ শোভন, নিরাপদ ও টেকসই কর্মসংস্থান হবে, সেটি আলাদা করে বিবেচনার দাবি রাখে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের কৌশলপত্রে মূলত দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এখানে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন ছিল। কারণ সরকার যখন এটাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে যাবে, তখন দেশের ভেতর ও বাইরের চলমান বাস্তবতাগুলো উঠে আসবে।
তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতির ৫০ শতাংশের বেশি এখন সেবা খাতনির্ভর। এখানে অনানুষ্ঠানিক ও ছোট ছোট অনেক খাত রয়েছে। কিন্তু এগুলো এখনো আমাদের অর্থনীতিতে অতটা বড় হয়ে ওঠেনি। এখন এসব খাতকে আরো বড় করতে হলে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বড় পরিসরে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সেবা খাত থেকে যদি আমরা আরো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই, তাহলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন হবে—যারা বর্তমানে এসব কাজে যুক্ত আছেন, তাদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, বলেন তিনি।
২৬ লাখ বেকার, উচ্চশিক্ষিতই ৮ লাখ ৮৫ হাজার
কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো শ্রমবাজারের চাহিদা ও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অসামঞ্জস্য।
বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বেকার ৮ লাখ ৮৫ হাজার।
প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন করে বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু তাঁদের শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার সামঞ্জস্য তৈরি না হওয়ায় উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কমছে না।
এখানে আরও একটি পরিসংখ্যানগত সমস্যা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করলেও একজন ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে গণ্য করা হয় না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে জীবনধারণ সম্ভব নয়। ফলে আনুষ্ঠানিক বেকারত্বের হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে অপ্রতুল কর্মসংস্থানে থাকা বিপুল মানুষ।
এ কারণে শুধু বেকারের সংখ্যা কমানোকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সাফল্য হিসেবে দেখলে শ্রমবাজারের প্রকৃত চিত্র আড়াল হতে পারে।
জ্বালানি সংকটই এখন বড় বাধা
কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক ঝুঁকি সম্ভবত জ্বালানি সংকট।
বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে সংঘাত বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশ সরাসরি প্রভাবিত হয়।
পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকেই ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দামও বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে।
এর প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানায়। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও কাজের সময় কমছে, আবার কোথাও কারখানা বন্ধ হচ্ছে।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না, কোথাও কাজের সময় কমানো হয়েছে, আবার জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে।
এই বাস্তবতা বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কাকে কেবল একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি হিসেবে না দেখে বর্তমান অর্থনীতির ঝুঁকির অংশ হিসেবে বিবেচনার কারণ তৈরি করছে।
কৃষিতেও কর্মসংস্থান বাড়ানোর হিসাব, কিন্তু বাড়ছে ঝুঁকি
সরকার আগামী পাঁচ বছরে কৃষিতে প্রায় ৫ লাখ ৯০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে। বর্তমানে কৃষিতে কর্মসংস্থান প্রায় ৩ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার; তা বাড়িয়ে ৩ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু কৃষিও জ্বালানি ও বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের ধাক্কা থেকে মুক্ত নয়।
বাংলাদেশের কৃষি সারনির্ভর। প্রতি হেক্টরে দেশে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত সারের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করতে হয়।
গ্যাসের সংকটের কারণে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার পাঁচটিকেই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এ অবস্থায় কৃষিতে শুধু কর্মসংস্থান বাড়ানোর সংখ্যাগত লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; উৎপাদন ব্যয়, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, বাজারব্যবস্থা ও কৃষকের আয়—সবকিছুকে একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যও বড়
দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের চাপ কমাতে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। বর্তমানে বছরে গড়ে প্রায় ১১ লাখ ২০ হাজার কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন। আগামীতে এ সংখ্যা ১৫ লাখ ৮০ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
অর্থাৎ প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার কর্মী বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাঁচ বছরে এ হিসাবে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে এ লক্ষ্যও সহজ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারেও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে।
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, সরকার নতুন করে যে নীতির কথা বলছে সেখানে বছরে ১৫ লাখ কর্মী যাবে বিদেশে। অর্থাৎ বিদ্যমান কর্মীর পাশাপাশি আরো সাড়ে চার লাখের কিছু বেশি কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। মধ্যপ্রাচ্যে বড় শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশকিছু শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। মালয়েশিয়া শ্রমবাজার খোলার পথ কেবল তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে ১৫ লাখ কর্মী পাঠানো কত বাস্তব সেটি বড় প্রশ্ন। এছাড়া বর্তমানে বিদেশে যারা যাচ্ছে, তাদের বড় অংশই অদক্ষ। শ্রমবাজারে দক্ষ শ্রমিকের এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদা, ফলে লক্ষমাত্রা কতটা পূরণ হবে, সেটাও আরেকটি প্রশ্ন। সুতরাং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা যেতে পারে, কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা আরো অনেকগুলো শর্তের ওপর নির্ভরশীল।
দক্ষতার বিষয়ে যদি বলি, তাহলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে একটি ভালো অবস্থান তৈরি করতে হবে। সেক্ষেত্রে অদক্ষ কর্মী কমানো, অদক্ষ শ্রমিকদের শোষণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দক্ষ শ্রমিক তৈরির দিকে যেতে হবে, বলেন তিনি।
শুধু সংখ্যা দিয়ে কর্মসংস্থানের সাফল্য মাপা যাবে না
সরকারের পরিকল্পনায় দক্ষতা উন্নয়ন, আপ-স্কিলিং ও রি-স্কিলিংয়ের কথা বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, দেশে এখনো যেসব শিল্পায়ন হচ্ছে, সেগুলো শ্রমনির্ভর। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত। অন্যান্য শিল্পেও প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিনিয়োগের বিষয়টি সেভাবে আসেনি।
তিনি বলেন, আমরা প্রাক্কলন করছি, আগামীতে কর্মসংস্থানের বেশি প্রয়োজন হবে সেবা খাতে। কারণ খাতটি অনেক বড়, সেখানে এখনো বহু শ্রমিকের প্রয়োজন। তাছাড়া আমরা এখনো ওই পর্যায়ে যাইনি যে নতুন কোনো প্রযুক্তি এসে ব্যাপকভাবে মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে। আমাদের শিল্পায়নের সঙ্গে আমাদের অ্যাডজাস্ট করাটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী পাঁচ বছরে কী হয় সেটা বলা কঠিন। এ মুহূর্তে হয়তো এনার্জি ক্রাইসিস বা অন্য কোনো সমস্যা চলছে। কিন্তু এগুলো তো সবসময় থাকবে না। সুতরাং অর্থনীতি যদি ঘুরে দাঁড়ায়, যেটাকে আমরা রিকভারি স্তর বলছি, সেটি হলে অনেক কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে, বলেন তিনি।
দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘কর্মসংস্থান তো আর হঠাৎ করেই হবে না, এর সঙ্গে পুরো ইকো সিস্টেম উন্নত করতে হবে। সেক্ষেত্রে কর্মসংস্থান যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি শ্রমিকের চাহিদাও বাড়াতে হবে। শ্রমিকের চাহিদা বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে। একই সঙ্গে দক্ষতা বাড়ানো, স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, আপ-স্কিলিং, রি-স্কিলিং করতে হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ফ্রেমওয়ার্কে এসব বিষয় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’
মূল প্রশ্ন পরিকল্পনার নয়, বাস্তবায়নের
সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য কাগজে উচ্চাভিলাষী। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন, তার বড় অংশই এখন অনিশ্চিত।
একদিকে জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় বিদ্যমান শিল্পের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে। অন্যদিকে অটোমেশনের কারণে উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকের প্রয়োজন কমছে। সেবা খাত দ্রুত বাড়লেও সেখানে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আধিপত্য। উচ্চশিক্ষিত বেকার বাড়ছে, আবার শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তির ঘাটতিও রয়েছে। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রেও দক্ষতার ঘাটতি ও শ্রমবাজারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘ হলে ২০২৬ সালে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাওয়া মানুষের সংখ্যা ১৭ লাখ থেকে কমে মাত্র ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
তাই এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য বাস্তবায়নের সাফল্য শুধু কতজনকে কাজে যুক্ত করা হলো, সেই হিসাব দিয়ে বিচার করলে হবে না। দেখতে হবে কতজন টেকসই, পর্যাপ্ত আয়, দক্ষতা, সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রমিক অধিকারসমৃদ্ধ কর্মসংস্থানে যেতে পারলেন।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে—এমন সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেই পুনরুদ্ধার যদি বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং শ্রমবাজারের সংস্কারের সঙ্গে সমন্বিত না হয়, তাহলে এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য একটি বড় সংখ্যাগত প্রতিশ্রুতি হয়েই থেকে যেতে পারে।
আর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই যদি বর্তমান সংকটে লাখ লাখ কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে সরকারের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে নতুন এক কোটি চাকরি তৈরি করা নয়—বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখা।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
[TheChamp-FB-Comments]