নিউজ ডেক্স
আরও খবর
রাশিয়ার মিগ-২৯ থেকে চীনা জে-১০: গল্পটি সক্ষমতার, মিথ্যা এবং ধোঁকাবাজিরও
পায়রা ও আদানিকে রেকর্ড ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান: গত অর্থবছরে কেন এত বেশি দিতে হলো?
একটির খরচে ৫টি মেট্রো নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না: লাইন-২ রুটে খরচ ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি
যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের নামে এলজিবিটি কোটায় আবেদনের শীর্ষে পাকিস্তান, দ্বিতীয় বাংলাদেশ
জাতীয় চার নেতার ম্যুরালকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ উল্লেখ করে অপসারণ, ইউএনওর ওপর ক্ষুব্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধারা
প্রশাসনের নাকের ডগায় সিলগালা করা ৯ লাখ ঘনফুট বালু গায়েব! পাচারে জড়িত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা
রংপুরে ৪ খুন: কারণ হিসেবে হিন্দু সমাজের জাতপ্রথার দ্বন্দ্বের নয়া দাবি পুলিশের
বাণিজ্যে ভারত-নির্ভরতা বাড়ছেই, দুই বছরে বাণিজ্য ঘাটতি আরও প্রকট
গত দুই-তিন অর্থবছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি দিন দিন আরও বড় হচ্ছে। ডলার সংকটের কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সার্বিক আমদানিতে যে লাগাম টানা হয়েছিল, পরের বছরগুলোয় তা ধীরে ধীরে শিথিল হয়েছে এবং ভারত থেকে পণ্য আমদানির অর্থমূল্য ক্রমেই বেড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আমদানি-রপ্তানির অনুপাত প্রায় ৮৬:১৪—অর্থাৎ মোট বাণিজ্যের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর।
পরিমাণ কমলেও বেড়েছে আমদানি ব্যয়
এনবিআরের হিসাব বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছিল প্রায় তিন কোটি ২২ লাখ মেট্রিক টন পণ্য, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।
পরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় প্রায় দুই কোটি ৭১ লাখ মেট্রিক টনে, কিন্তু ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় এই কম পরিমাণ পণ্যের বিপরীতেই ব্যয় বেড়ে হয় প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার ৯৩ কোটি টাকা।
ডলারের অঙ্কে হিসাব করলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল প্রায় ১,১০৭ কোটি (১১.০৭ বিলিয়ন) ডলারের, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১,১৪৯ কোটি (১১.৪৯ বিলিয়ন) ডলারে—প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
এই বৃদ্ধির পেছনে মূলত টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা বৃদ্ধি এবং সরকার পরিবর্তনের পর আমদানি নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল হওয়া কাজ করেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ১০.৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১০ শত কোটি ৯৬ কোটি ডলার)। বাংলাদেশী মুদ্রায় (১ ডলার = ১২৩ টাকা গড় বিনিময় হার হিসেবে) এই আমদানির মোট অর্থমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা।
এই আমদানি বিগত দুই অর্থবছরের আমদানি থেকে বেশী।
স্থলবন্দরভিত্তিক পরিসংখ্যানেও একই চিত্র। দেশের সচল ১৬টি স্থলবন্দর দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় এক কোটি ৫২ লাখ ৮৬ হাজার টন পণ্য, বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১২ লাখ ৭২ হাজার টন—অর্থাৎ পরিমাণের হিসাবে আমদানি রপ্তানির প্রায় ১২ গুণ। সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয়েছে ভোমরা ও বেনাপোল বন্দর দিয়ে।
কোন কোন পণ্যের আমদানি বেড়েছে
ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের তালিকায় দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষে আছে তুলা ও সুতা—দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তুলা আমদানি হয়েছিল প্রায় ২০২ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৩৬ কোটি ৮৮ লাখ ডলারে—মোট আমদানির প্রায় সাড়ে ২১ শতাংশ।
পোশাকশিল্প মালিকদের ভাষ্যমতে, ওভেন ও নিট পোশাকের সুতা-তুলার চাহিদার প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশই মেটানো হয় ভারত থেকে।
তুলা-সুতা ছাড়াও যেসব পণ্যের আমদানি লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে:
জ্বালানি কয়লা — নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসায় পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি এসেছে এই পণ্য থেকে।
চাল, পেঁয়াজ, ডাল ও কাঁচামরিচ — বাজারে সরবরাহ-সংকট বা মূল্যবৃদ্ধি হলেই ভারতনির্ভরতা বাড়ে, কারণ স্থলপথে দ্রুত ও কম খরচে এসব আনা যায়।
জ্বালানি তেল ও বিটুমিন — শিল্প-কারখানা ও সড়ক নির্মাণ খাতের চাহিদায় অব্যাহত।
শিল্পের কাঁচামাল, কেমিক্যাল ও মেশিনারিজ
বিদ্যুৎ — প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার ৭৮০ মেগাওয়াট, যা মোট চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ।
শিশুখাদ্য, ফলমূল ও অক্সিজেন জাতীয় পণ্যও নিয়মিত আমদানি তালিকায়।
তবে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি পণ্যের ওপর পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে কিছু পণ্যের আমদানি সাময়িকভাবে কমেও গিয়েছিল, বিশেষ করে বেনাপোল বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যে।
রপ্তানির চিত্র তুলনামূলক স্থবির
আমদানির বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় তুলনামূলকভাবে স্থবির। এনবিআরের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ১৭ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকার পণ্য, আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা প্রায় অপরিবর্তিত থেকে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায়।
ডলারের হিসাবে অবশ্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ, প্রায় ২.১৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল—বাংলাদেশের ইতিহাসে ভারতের বাজারে প্রথমবারের মতো ২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম।
এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) রপ্তানি হয়েছে ১১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকার পণ্য। রপ্তানি পণ্যের তালিকায় প্রধানত আছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, হিমায়িত মাছ, সিমেন্ট, শুঁটকি, আটা-ময়দা, ভোজ্যতেল, সাবান, মেলামাইন সামগ্রী ও সুপারি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাম্প্রতিক প্রবণতা
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুর দিকের তথ্যেও আমদানি-বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত। ভারতীয় অর্থবছরের (এপ্রিল-মার্চ) হিসাবে এপ্রিল-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ছিল প্রায় ৪৩৩ কোটি ৮২ লাখ ডলার, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি।
এক পর্যায়ে জানুয়ারি মাসেই ভারত থেকে আমদানি বেড়ে যায় প্রায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
তবে স্থানীয়ভাবে কিছু খাতে ভিন্ন চিত্রও দেখা যাচ্ছে। যেমন আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানি হয়েছে ৫২৪ কোটি টাকার পণ্য, আগের অর্থবছরের ৫১৪ কোটি টাকার তুলনায় সামান্য বেশি।
একইসঙ্গে দেশীয় বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাল ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্য ভারত থেকে আমদানির অনুমতি বাড়ানো হয়েছে বারবার—ডিসেম্বরে সরকার ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫০ হাজার টন সিদ্ধ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
অর্থনীতি-বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভারত থেকে আমদানি বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক সহজ ও সাশ্রয়ী। বাজারে হঠাৎ সরবরাহ-সংকট দেখা দিলে বিকল্প উৎসে যেতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে বলে ভারতনির্ভরতা এখনো কমেনি।
ব্যবসায়ী মহলের পর্যবেক্ষণ হলো, বাণিজ্য-বান্ধব অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে স্থলপথে সম্ভাবনাময় বাণিজ্য সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; ২৪টি স্থলবন্দরের মধ্যে মাত্র ১৬টি সচল থাকায় বাকিগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সবমিলিয়ে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, স্বল্পমেয়াদে কিছু পণ্যে ওঠানামা হলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা হলো—ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, বিপরীতে রপ্তানি বাড়লেও তার গতি অনেক ধীর।
ফলে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি এখনো অনেকটাই অপরিবর্তিত এবং কোনো কোনো বছরে তা আরও চওড়া হয়েছে।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।