নিউজ ডেক্স
আরও খবর
সরকারের সর্বনাশে মঈনরাই যথেষ্ট
ঋণখেলাপি: শুধু তালিকা নয়, ব্যবস্থা নিন
গণভোট: বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রবাসীরা
চিঠি আর ডাকবক্সের নীরব সাক্ষী
রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে জাতিসংঘের সম্মেলন কি ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে?
জাহেলি যুগে আরবের দীর্ঘতম যুদ্ধ
রাজনীতিতে সুবাতাস
দেশের রাজনীতিতে একটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে গেছে। সংসদ নেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতা নিজেদের মধ্যে কথা বলেছেন এবং তারা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং বলা চলে একমত হয়েছেন যে, তারা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত হবেন বা একমত পোষণ করবেন, যাতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা পায়।
এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। কেননা আমরা শুরু থেকেই দেখছি সাংঘর্ষিক রাজনীতি। আমাদের তো প্রথম সংসদে বিরোধী দল বলতে কিছুই ছিল না। কিন্তু তারপর থেকে আমরা সংসদীয় রাজনীতির যে নবযাত্রা দেখি ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত, এ সময়টাতে আমরা দেখেছি সংসদে বিরোধী দল যথেষ্ট সংখ্যায় উপস্থিত ছিল; কিন্তু রাজনীতিটা ছিল খুবই সাংঘর্ষিক, আক্রমণাত্মক এবং পরস্পর পরস্পরকে শত্রু মনে করতেন।
কথায়-আচরণে মনে হতো তারা সবাই নির্মূলের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। কোনো ব্যাপারেই তাদের মধ্যে আমরা সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখিনি এবং এর পরিণামে আমরা দেখেছি লাগাতার ওয়াকআউট এবং সংসদ বর্জন ও পরবর্তী সময়ে হরতাল। এমন পর্যায় গেছে ’৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। তারপর তো এক-এগারোর ধাক্কা। মানুষ খুবই বিরক্ত ছিল।
এক-এগারোর পর যখন আওয়ামী লীগ আবার বিপুল বিক্রমে সরকার গঠন করল, তখন বলা চলে, একটা পলিটিক্যাল মনোপলি এস্টাবলিশ করা হলো। ২০১৪ সাল পর্যন্ত আমরা দেখেছি সংসদে সাংঘর্ষিক রাজনীতি। তখন বিএনপিও যথেষ্ট সোচ্চার ছিল। কিন্তু সব ব্যাপারেই আমরা দেখেছি, তারা একে অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক।
সরকারে যারা যায়, তাদের মধ্যে সবকিছু দখল করার একটা মানসিকতা দেখা গেছে; আর বিরোধী দলের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিরোধিতার খাতিরে সব বিষয়ে ‘না’ বলা। এ পটভূমিতে আমরা যদি বিচার করি, তাহলে এই যে সাম্প্রতিক ঘটনাটা ঘটল বা যে উদ্যোগটা আমরা দেখছি, সেটা অবশ্যই এ হতাশার চোরাবালির মধ্যে একটু আশার সঞ্চার করে। রাজনীতিতে বিরোধিতা থাকবে; কিন্তু সেই বিরোধিতা তো সংসদকে অকার্যকর করে নয়।
এটি যদি আমরা চর্চা করতে পারি, সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে যদি এক ধরনের সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক থাকে এবং বিরোধিতার রাজনীতিটা যাতে সংঘর্ষের পর্যায়ে না যায়, ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুৎসা, ছি ছি করা-এগুলো থেকে যদি আমরা পরিত্রাণ পাই, যেগুলো আমরা অতীতে দেখেছি, তাহলে একটা সুবাতাস বয়ে যাবে এবং নাগরিকরা আশ্বস্ত হবে।
আসলে রাজনীতিতে আমাদের গর্ব করার মতো তেমন কিছু নেই; যা আছে তা খুবই কম। সুতরাং এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতারা উদ্যোগ নিয়ে যদি আমাদের পথ দেখান, তাহলে আমরা আশ্বস্ত হই। আমাদের দেশে আমরা যদি সংসদীয় রাজনীতিটাকে সফল করে তুলতে চাই, তাহলে সংসদ হতে হবে সব আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্র।
রাজনীতিটাকে কোনোমতেই মাঠে নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। আমরা এর আগে দেখেছি, সংসদকে এড়িয়ে রাস্তা-মাঠে রাজনীতি করা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা বলেছেন, রাজপথেই সব মীমাংসা হবে। এগুলো হচ্ছে হঠকারী কাজ। এর ফলে সংসদ কখনোই কার্যকর হয় না। কাজেই সরকারি দল এবং বিরোধী দল যদি এ ব্যাপারে একমত হতে পারে, তাহলে সংসদ কার্যকর হবে।
তারা যদি এ ব্যাপারে সংযত আচরণ করেন এবং গণতন্ত্রের ভাষায় কথা বলেন এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের যত নর্মস আছে, সেগুলোর চর্চা করেন, তাহলে হয়তো ধীরে ধীরে আমরা একটা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারব। কাজেই এটার চর্চা করতে হবে। সেই চর্চার একটা বিশেষ দিক হলো, কিছু কিছু ব্যাপারে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে, দলীয় ব্যাপারে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে বলবেন, সেখানে তাদের মধ্যে বিপরীত অবস্থান থাকবে, এটা মেনে নেওয়া যায়; কিন্তু জাতীয় স্বার্থ তো এক। জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারে সরকারি দল বলুন, আর বিরোধী দল বলুন, সবাইকে এক কণ্ঠে একাট্টা হয়ে কথা বলতে হবে। এখন আমাদের দেশে অনেক ব্যাপার আছে, যেমন আমাদের পররাষ্ট্রনীতি, বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক, বিভিন্ন ব্লকের সঙ্গে আমাদের সংযোগ-কোনটা আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল, এটা সবাইকে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত যদি আমরা সঠিকভাবে না নিতে পারি, তাহলে আমাদের জাতীয় স্বার্থটাই শেষ পর্যন্ত ক্ষুণ্ন হবে। অনেক ব্যাপার আছে-বৈদেশিক বা বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপারে, বিভিন্ন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র, বিশেষ করে বিনিয়োগের ব্যাপারে এবং জাতিসংঘে বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের রাষ্ট্রীয় অবস্থান কী হবে, এসব ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা করে একমত হওয়াটা খুবই জরুরি।
আমরা অনেক দেশেই দেখি-যদি যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরি, তাদের তো একধরনের সাংঘর্ষিক রাজনীতি আছে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে সবাই একাট্টা। আমরা যদি প্রতিবেশী ভারতের দিকে তাকাই, তাদের মধ্যেও সাংঘর্ষিক রাজনীতি আছে; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তারা সবাই সোচ্চার ও একমত। আমরা আজ পর্যন্ত শুনিনি, বিদেশে সরকারপ্রধান কোনো সফরে গেলে সেখানে বিরোধী দল তাদের বিরুদ্ধে ঢিল ছোড়ে, অপপ্রচার করে, মিছিল করে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। মানে আমাদের দেশের এই যে ‘মারামারি’ সংস্কৃতি, সেটিকে আমরা বিদেশে নিয়ে যাই এবং এর ফলে সবাই আমাদের খুব তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে। আমরা যদি নিজেদের মর্যাদা নিজেরা বজায় রাখতে না পারি, তাহলে তো অন্যরা এটা করে দেবে না। কাজেই যে উদ্যোগটা দেখলাম সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে, বিশেষ করে দুই নেতার মধ্যে-তারা যদি আন্তরিকভাবে কথাগুলো বলে থাকেন, তাহলে এর চর্চাটা আমরা ভবিষ্যতে দেখব।
আমরা জানি, এখন সরকারি দল হচ্ছে বিএনপি। তাদের সঙ্গে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে আরও কয়েকটি দলের সদস্যরা আছেন সংসদে। বিরোধী দলে প্রধান বিরোধী দল বলতে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সঙ্গে এনসিপি এবং আরও কয়েকটি দল আছে, ছোট ছোট দল। এখন জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির রাজনীতি অতীতে আমরা দেখেছি কখনো সমঝোতার ভিত্তিতে চলেছে, কখনো বিরোধিতার ভিত্তিতে। ১৯৯১ থেকে ২০১৪ বা ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমরা দেখেছি তাদের মধ্যে একধরনের সমঝোতার রাজনীতি। তখন তাদের উভয়ের প্রতিপক্ষ ছিল আওয়ামী লীগ। ২০২৪-এর পর পরিস্থিতি পালটে গেছে। আওয়ামী লীগকে আমরা এখন আর দৃশ্যপটে দেখতে পাই না। কেন পাই না, সেই আলোচনা ভিন্ন। কিন্তু এখন আমরা দেখি, প্রকাশ্যে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী হচ্ছে প্রধান রাজনৈতিক দল, সংসদে এবং সংসদের বাইরে। এবং যেহেতু এখানে আওয়ামী লীগ মাঠে নেই, তাদের পরস্পরের সঙ্গে যে সম্পর্কটি আগে ছিল, সেটি আর এখন নেই। এটি অনেকটা সাংঘর্ষিক হয়ে গেছে। কারণ নির্বাচনের রাজনীতিতে তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিদ্বন্দ্বিতার তো একটা নিজস্ব ধর্ম আছে, সেই ধর্ম অনুযায়ী চলছে। তারপরও আমি মনে করি, আমাদের তো এই দেশ নিয়েই থাকতে হবে, এই সংসদ নিয়েই চলতে হবে। আমরা তো আর অন্য কিছু করতে পারব না, করা সম্ভবও নয়। অনেকেই অনেক কিছু চেষ্টা করেছেন এর আগে, তারা হালে পানি পাননি, জনগণ সেটাকে সমর্থন করেনি।
সুতরাং, জাতীয় সংসদকে কেন্দ্র করে যে রাজনীতি আবর্তিত হবে, সেখানে এ প্রধান দুটি দলের মধ্যে যদি এক ধরনের ভদ্রলোকের চুক্তি হয়-সেটা লিখিত হোক বা অলিখিত-সেটা যদি তারা মেনে চলেন, তাহলে আমরা রাজনীতিতে সুবাতাস বইতে দেখব এবং মানুষ এটাকে স্বাগত জানাবে।
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।