নিউজ ডেক্স
আরও খবর
‘পুলিশ খুব দুর্বল, শেখ হাসিনার এখনই আসা উচিৎ, চলে আসলি পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না’, ফোনালাপের জেরে ওসি প্রত্যাহার
পাঁচ দেশে অর্থপাচারসহ অবৈধ সম্পদ অর্জন: সস্ত্রীক আসিফের তথ্য চেয়ে বিএফআইইউকে দুদকের চিঠি
৭ আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায়ে বিশ্বজুড়ে কৃষিবিদদের প্রতিবাদ, রায় বাতিল ও বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধের দাবি
বিএনপি সরকারের উন্নয়ন: ১৪ কোটি টাকার সড়কে ঢালাইয়ের পরই ফাটল, মাটির দোষ দিলেন ঠিকাদার
বিএনপি সরকারের উন্নয়ন: কাজ না করেই টাকা উত্তোলন, টিআর-কাবিখার ৩১৮ প্রকল্পে মহা লুটপাট!
জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত নিটওয়্যার খাত: ৫৫% কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল বা হ্রাস
বন্ধ মিলে ১১৯ টন চালের কারসাজি: অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের সাথে সরকারের বিপুল অঙ্কের চুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধ চরমে: কেন মধ্যমশক্তির দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরতা এড়াতে চাইছে
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক উত্তেজনা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। গত আগস্ট মাসের শেষদিকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা আলোচনার পর কানাডা ওয়াশিংটন থেকে তাদের প্রতিনিধি দল প্রত্যাহার করে নেয়, এরপর যুক্তরাষ্ট্র কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে। জবাবে কানাডাও একই মূল্যমানের মার্কিন পণ্যের ওপর “ডলারের বিপরীতে ডলার” ভিত্তিতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে, যা কার্যকর হয় ৮ সেপ্টেম্বর থেকে।
ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
এই উত্তেজনার মধ্যেই গত ৫ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন, কানাডার সঙ্গে সম্পূর্ণ বাণিজ্য বন্ধ করে দিলে যুক্তরাষ্ট্র বছরে ৯০ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারবে। এর কিছুদিন আগে তিনি আরও বলেছিলেন, কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্র বছরে ৬০ থেকে ৯০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবে, একই সঙ্গে মেক্সিকো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও একই ধরনের বাণিজ্য বন্ধের প্রসঙ্গ টানেন।
তবে এই দাবি নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিক ড্যানিয়েল ডেল উল্লেখ করেন, গত বছর পণ্য ও সেবা মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রকৃতপক্ষে ২৭ বিলিয়ন ডলার, যা ট্রাম্পের দাবি করা অঙ্কের ধারেকাছেও নেই। সমালোচকদের মতে, বাণিজ্য ঘাটতি মানেই সরাসরি “হারানো অর্থ” নয়, বরং কানাডা জ্বালানি, যানবাহন ও যন্ত্রপাতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ করে, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রও শত শত বিলিয়ন ডলারের পণ্য কানাডায় রপ্তানি করে — উভয় দেশের মোট দ্বিমুখী বাণিজ্য গত বছর ৮৭০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই সম্প্রতি ট্রাম্প কানাডার সঙ্গে সব বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত ঘোষণা করেন, যার কারণ হিসেবে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের শুল্কবিরোধী একটি পুরনো বক্তব্য ব্যবহার করে কানাডার তৈরি একটি বিজ্ঞাপন প্রচারণাকে দায়ী করেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে বাণিজ্য সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কেন মধ্যম শক্তির দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরতা এড়াতে চাইছে?
এই ধরনের আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত বাণিজ্যনীতির কারণে কানাডাসহ বিশ্বের অনেক মধ্যম শক্তির (middle power) দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একচেটিয়া বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ও স্থিতিশীল বাজার খোঁজার দিকে ঝুঁকছে। এর পেছনে মূলত কয়েকটি কারণ কাজ করছে:
১. অনিশ্চিত বাণিজ্য ও নীতিগত অস্থিরতা: ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ঘন ঘন পরিবর্তিত হচ্ছে এবং প্রায়শই রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে (যেমন একটি বিজ্ঞাপনের জেরে) সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে।
২. অর্থনৈতিক জবরদস্তির ভয়: বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বেপরোয়া অর্থনৈতিক জবরদস্তির মুখে মধ্যম শক্তির দেশগুলো একটি নতুন ভূ-অর্থনৈতিক জোটের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী যৌথ প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাইছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ২০২৬ সালের দাভোস বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া এক আলোচিত ভাষণে এবং অস্ট্রেলিয়া সফরে অস্থিতিশীল বিশ্বে দুর্বৃত্ত পরাশক্তিগুলোর মুখোমুখি মধ্যম শক্তির দেশগুলোর যৌথ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
৩. বিকল্প বাজারের সন্ধান — CANZUK ধারণার পুনরুত্থান: কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের (CANZUK) মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক জোট গঠনের পুরনো প্রস্তাব নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। দ্য মেইল অন সানডে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা আকস্মিকভাবে ভেঙে পড়ার পর কানাডা সরকার অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে CANZUK অংশীদারত্বের প্রতি নতুন করে মনোযোগ দিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে ২০২৫ সালের লিবারেল পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনের সময়ই কার্নি মার্কিন শুল্কচাপের জবাবে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
রাজনৈতিক সমর্থনও বাড়ছে এই ধারণার পক্ষে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে কানাডার কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পোয়লিয়েভ লন্ডন সফরে গিয়ে “আধুনিক CANZUK” গঠনের আহ্বান জানান — যার লক্ষ্য চারটি অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করা, পেশাগত সনদ পারস্পরিক স্বীকৃতি দেওয়া, দক্ষ শ্রমশক্তির চলাচল সহজ করা এবং পুঁজিবাজার আরও গভীর করা। একই মাসে যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক প্রকাশ্যে CANZUK অর্থনৈতিক জোটকে সমর্থন জানান, আর লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা স্যার এড ডেভিও চার দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
৪. অর্থনৈতিক যুক্তি: CANZUK জোটের পক্ষে যুক্তি দেওয়া বিশ্লেষকদের মতে, এই চারটি দেশ মিলে বাণিজ্য বাধা কমিয়ে, পেশাগত সনদ পারস্পরিক স্বীকৃতি দিয়ে এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো সমন্বয় করে ১৩৬ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের একটি সুসংহত বাজার তৈরি করতে পারে, যার সম্মিলিত নামমাত্র জিডিপি ৮.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এছাড়া চার দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ইতিমধ্যে প্রায় ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের, যা জ্বালানি, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে বিদ্যমান সমন্বয়ের প্রমাণ দেয়।
৫. বাজার বৈচিত্র্যকরণের অন্যান্য উদ্যোগ: শুধু CANZUK নয়, কানাডা অন্যান্য দিক থেকেও বিকল্প বাজার খুঁজছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কানাডা ও চীন কানাডার নির্দিষ্ট কিছু কৃষিপণ্য যেমন ক্যানোলা তেলের ওপর শুল্ক কমাতে প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও কানাডাকে সংঘের প্রথম “সহযোগী সদস্য” হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সার্বিক চিত্র
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রত্যাশিত ও প্রায়ই একতরফা বাণিজ্যনীতি বিশ্বব্যাপী মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে একটি বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে — কোনো একটি বৃহৎ শক্তির ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নির্ভরতা রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। এই উপলব্ধি থেকেই কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মতো সমমনা, একই আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর দেশগুলো নিজেদের মধ্যে গভীরতর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংহতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো একক পরাশক্তির নীতিগত খেয়ালিপনা তাদের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে না পারে। তবে CANZUK এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়নি, এবং এটি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে চার দেশের সরকারগুলোর রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও আসন্ন সময়ের কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
[TheChamp-FB-Comments]