নিউজ ডেক্স
আরও খবর
জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত নিটওয়্যার খাত: ৫৫% কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল বা হ্রাস
বন্ধ মিলে ১১৯ টন চালের কারসাজি: অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের সাথে সরকারের বিপুল অঙ্কের চুক্তি
বাংলাদেশের চেয়ে ১২৭ গুণ ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশ ভুটানে শ্রমিক পাঠাতে চান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
পদ্মা-যমুনার পানি বাড়ছে, তলিয়ে গেছে ফসলি জমি
কারাগারে জন্মের পর মায়ের সঙ্গে কাটল ৭ বছর, অবশেষে মুক্ত মোবাশ্বেরা
‘ফোন ধরিস না কেন?’—ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রেলের টিকিট কাউন্টারে যুবদল নেতার হামলা, ভোগান্তিতে যাত্রীরা
৭ মাসে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ || নিখোঁজ শিশুর অঙ্গ পাচার, ৭ মাস পর মাহফিলে ভিক্ষা করতে এসে বাবার সঙ্গে দেখা
বিএনপি সরকারের উন্নয়ন: কাজ না করেই টাকা উত্তোলন, টিআর-কাবিখার ৩১৮ প্রকল্পে মহা লুটপাট!
পটুয়াখালীর বাউফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (টিআর/কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় ৩১৮টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট ৩ কোটি ৯২ লাখ ৯৯ হাজার ৬০৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে নেওয়া প্রকল্পগুলোর অধিকাংশের কাজ বাস্তবায়ন না করেই বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
টিআর/কাবিখার আওতায় নেওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মাটির রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদের মাঠ ভরাট, বিভিন্ন অবকাঠামো মেরামত এবং গভীর নলকূপ স্থাপন।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে প্রকল্পের তালিকার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখা গেছে, ৩১৮টি প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি প্রকল্পে কাজের কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন নেই। আবার কিছু প্রকল্পে সামান্য কাজ করা হলেও বরাদ্দের পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ধুলিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ঘুচরাকাঠি আব্দুল জব্বার মৃধা বাড়ির জামে মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠ উন্নয়নের জন্য ১ লাখ ৩১ হাজার ২৬৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ঈদগাহ মাঠটি আগে থেকেই পাকা ছিল। সেখানে নতুন করে মাটি ভরাটের কোনো কাজ করা হয়নি। অথচ কাজ না করেই ঈদগাহ মাঠে মাটি ভরাট দেখিয়ে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই স্থানে বায়তুস সালাহ জামে মসজিদের উন্নয়নের জন্য আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একই জায়গাকে কেন্দ্র করে ভিন্ন নাম ব্যবহার করে দুটি প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। মসজিদে সামান্য সংস্কারকাজ করা হলেও ঈদগাহ মাঠ ভরাটের জন্য বরাদ্দ দেওয়া অর্থের বড় অংশ ব্যয় না করেই উত্তোলন করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ধুলিয়ার বাসিন্দা শরীফ তৌসিফুর রহমান রাফা বলেন, তালিকায় থাকা দু-একটি প্রকল্প ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলোর নাম তিনি কখনো শোনেননি। স্থানীয়ভাবেও এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর বিষয়ে কেউ অবগত নন বলে জানান তিনি।
তার মতে, প্রকল্পের তালিকায় ভুয়া অথবা বাস্তবে বাস্তবায়ন না হওয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়ে থাকতে পারে।
বাউফল ইউনিয়নের দক্ষিণ বিলবিলাস এলাকায় মন্নাত খানের বাড়ি থেকে পল্লী বিদ্যুতের পাকা সড়ক পর্যন্ত মাটির রাস্তা মেরামতের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই রাস্তায় বরাদ্দের পরিমাণ অনুযায়ী কোনো মাটি ফেলা বা সংস্কারকাজ করা হয়নি। সরেজমিনেও রাস্তার উন্নয়নে সাম্প্রতিক কোনো কাজের দৃশ্যমান চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কাজ না করেই বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
একই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আলিপুরা গ্রামের রুহুল আমিন হাওলাদারের বাড়ির পশ্চিম পাশ থেকে উত্তরে মির্জা বাড়ি পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুনর্নির্মাণ করার কথা ছিল। কিন্তু ওই প্রকল্পের কাজ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ করা ২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
বাউফল সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গোসিংগা গ্রামের আফছেরের গেরেজ থেকে পশ্চিমে এসপি পাকা রাস্তা পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে ১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানে কোনো কাজ হয়নি। বরং আফছেরের গেরেজ থেকে পশ্চিম দিকে কোনো মাটির রাস্তা নেই। ওই দিকে রয়েছে বাউফল-বগা হাইওয়ে সড়ক।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি ও বাউফল ইউনিয়নের বাসিন্দা মোশারফ হোসেন খান লিটন বলেন, ‘আমার জানা মতে ইউনিয়নে অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন হয়নি। কয়েকটি প্রকল্পের নামমাত্র কাজ হয়েছে। যথাযথভাবে প্রকল্পের কাজ না করে এলাকার জনগণের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়েছে।’
দাসপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইসাহাক ফকির বাড়ির উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে হোনা গাজী খালের পোল পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুনর্নির্মাণ করার কথা ছিল। কিন্তু সেই কাজ না করেই বরাদ্দ করা ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দাশপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলী আজম চৌধুরী বলেন, ‘আমার জানামতে দাসপাড়া ৪ নং ওয়ার্ডের সোনাগাছি খালে ওল পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। এ ছাড়াও দাসপাড়ায় আরও কয়েকটি প্রকল্প আছে যেগুলোর কাজ হয়নি। কয়েকটি প্রকল্পের নামমাত্র কাজ করে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের প্রকল্প তালিকায় এমন কিছু প্রকল্পের নাম রয়েছে, যেগুলোর বাস্তব অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার কোনো কোনো প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করার পর বরাদ্দের বড় অংশ তুলে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাউফল পৌর শহরে উপজেলা পরিষদের গেটসংলগ্ন আব্দুল খালেক আকনের ভবনের চতুর্থ তলায় ‘সাংবাদিক ক্লাব’ মেরামত ও সংস্কারের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে সরেজমিন সেখানে বরাদ্দের বিপরীতে কোনো সংস্কারকাজের চিহ্ন দেখা যায়নি। ভাড়া নেওয়া একটি ভবনে সরকারি অর্থে মেরামত ও সংস্কারের জন্য এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের বিধান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবাদিক ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ক্লাবের নামে প্রকল্প দেওয়া হয়েছে- এটা আমি ও আমার সভাপতি জানি না। যেহেতু প্রকল্পের বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না, তাই টাকা উত্তোলন করার প্রশ্নই আসে না।’
এ ছাড়া বাউফল পৌরশহরের উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনসার ভিডিপি অফিসের পশ্চিম পাশে কোরআন প্রকল্প স্বতন্ত্র ইফতেদায়ি মাদ্রাসার মেরামত ও সংস্কারের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। অথচ গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের টাকা দিয়ে পৌর শহরের কোনো প্রকল্প নেওয়ার বিধান নেই বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
নাজিরপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সুলতানাবাদ গ্রামের জাকির চৌকিদারের বাড়ি থেকে বারেক চৌকিদারের বাড়ি পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুনর্নির্মাণ করার কথা ছিল। কিন্তু ওই রাস্তার কাজ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। কাজ বাস্তবায়ন না করেই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে নাজিরপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মৌসুমী আক্তার রুমা বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যে প্রকল্প দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রাজনৈতিক দলের সুপারিশে যে প্রকল্পগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই।’
প্রকল্পের কাজের স্থানে বিস্তারিত তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড স্থাপনের নিয়ম রয়েছে। ওই সাইনবোর্ডে প্রকল্পের নাম ও কাজের বিবরণ, অর্থবছর, বরাদ্দের পরিমাণ এবং বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের তথ্য উল্লেখ করার কথা। কিন্তু বিভিন্ন প্রকল্প এলাকায় এসব তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। ফলে প্রকল্পের বরাদ্দ, কাজের ধরন এবং বাস্তবায়ন নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, ৩১৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১০০টির বেশি প্রকল্পের কাজ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। তবে এসব প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিওআইও) কাছে রাখা হয়েছে। হয়তো একটা সময়ে এসব টাকা ভাগাভাগি হয়ে যাবে বলেও সূত্রটির দাবি। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ চলতি বছরের ৩০শে জুন শেষ হয়ে গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে বাউফল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ‘এসব প্রকল্প তার সময়ে নেওয়া হয়নি, আগের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সময়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি যোগদানের পর যেসব প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন, সেখানে কোনো অনিয়ম পাননি। তবে কোথাও প্রকল্পের কাজ না হয়ে থাকলে বা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালেহ আহমেদ বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কোনো প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন না হলে আমরা সেগুলো করিয়ে নেব। অথবা প্রকল্পের সিপিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সূত্র: দৈনিক কালবেলা

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
[TheChamp-FB-Comments]