নিউজ ডেক্স
আরও খবর
দিলারা চৌধুরী এবং তার স্বামীর বঙ্গবন্ধুবিরোধিতা ও ইতিহাস বিকৃতি’র শেকড় ১৯৭১-এ প্রোথিত
হিন্দু পরিচয়ের কারণে ইউনূস আমলে পাসিং আউট প্যারেডের আগে নেভাল একাডেমি থেকে বহিষ্কৃত হন পৃথ্বী নন্দী
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ কৌশলের পুনরাবৃত্তি
যুক্তরাষ্ট্র কী রূপপুর চালু হতে দেবে?
দুই পরাশক্তির স্বার্থের ফাঁদে রূপপুর: সাশ্রয়ী রুশ মডেল বনাম ব্যয়বহুল মার্কিন প্রযুক্তি- কোন পথে হাঁটবে বাংলাদেশ?
ছাগল চুরির ট্রমায় কাতর মবের হোতারা, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে ভাবনা দূর অস্ত
হামে মৃত্যু হাজার পার, ডেঙ্গুতে হাহাকারঃ স্বাস্থ্য খাতের চরম প্রশাসনিক দেউলিয়াত্ব
ফ্রান্সে “দাঙ্গা”, বাংলাদেশে “বিপ্লব”: আন্তর্জাতিক মহলের এই দ্বিচারিতা কেন?
শরিফুল হাসান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ফ্রান্সে রাস্তায় আগুন, টাউন হলে হামলা, দোকানে লুট। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, সহিংসতার কোনো জায়গা নেই, দোষীদের বিচার হবে, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশে থাকবে পুরো জাতি। বিশ্বনেতারা এই ঘটনাকে দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলা হিসেবেই দেখছেন। এ নিয়ে কোনো বড় মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন বা ভলকার টুর্কের তরফে সরকারের বিরুদ্ধে সরব অবস্থান চোখে পড়ছে না। কেউ “ছাত্র-জনতার বিপ্লব” বলছে না, আর কোনো রাষ্ট্রদূত ক্ষোভ জানিয়ে আন্দোলনের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ফ্রীডম অব স্পিচের জন্য ফ্রান্সের সরকারকে সতর্ক করছে না, সহমর্মিতা নিয়ে দাঁড়াচ্ছে না বিক্ষোভকারীদের পাশে।
এবার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ফিরে যাই।
বাংলাদেশে ভিন্ন আচরণ
জুলাইয়ের মাঝামাঝি, যখন কোটা আন্দোলন সহিংস মোড় নিচ্ছে, তখনই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতেরা প্রকাশ্য বিবৃতি দিতে শুরু করেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন ও ভলকার টুর্ক সরকারের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি উদ্বেগ জানান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বড় অংশ আন্দোলনকে এক ধরনের নৈতিক সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করে, আর “বিপ্লব” শব্দটি দ্রুত আন্তর্জাতিক ভাষ্যে জায়গা করে নেয়।
তখন বাংলাদেশে পরিস্থিতি কেমন ছিল? থানায় অগ্নিসংযোগ হয়েছে, সরকারি স্থাপনা ও মেট্রোরেলের ক্ষতি হয়েছে, পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবনে আগুন লেগেছে।
ফ্রান্সে এই ধরনের ঘটনাই আজ “দাঙ্গা” বা “riot” নামে ব্যাবহার হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে ও মিডিয়ায়। বাংলাদেশে একই দৃশ্য “বিপ্লব” বা “uprising” ফ্রেমে বসিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর দুতাবাসের কূটনীতিকরা ?
আন্দোলনের চরিত্র এক, পার্থক্য আন্তর্জাতিক মনোযোগে
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাক্রম বুঝতে ১৬ জুলাই থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রংপুরে ছয়জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে আবু সাঈদ ছিলেন। এই মৃত্যুগুলোর পর সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নামে, আর ১৮ জুলাই আন্দোলন সহিংস মোড় নেয়: বিটিভি ভবনে আগুন লাগে এবং সরকার সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে। সরকারের ৩০ জুলাইয়ের চিঠি অনুযায়ী ২৩৫টি পুলিশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর বাংলাদেশ পুলিশের হিসাবে ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন।
ফ্রান্সেও একই চিত্র: স্কুল অবরোধ থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন সরকারি ভবনে আগুন ও পুলিশের ওপর আক্রমণে গড়িয়েছে, আর ২,৪০০ জনের বেশি মানুষ, যাদের বড় অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক, আটক হয়েছে।
দুই দেশের আন্দোলনের ধরন প্রায় এক, পার্থক্য গড়েছে আন্তর্জাতিক সমর্থনে। বাংলাদেশে মৃত্যুর খবরের পর আন্তর্জাতিক মহল ও গণমাধ্যমের মনোযোগ আন্দোলনকে গতি দিয়েছে, এবং নেতৃস্থানীয় সমন্বয়কেরা আটক হওয়ার পর মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অবস্থান সরকারকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে, যা আন্দোলনকারীদের সাহস বাড়িয়েছে।
ফ্রান্সে বিক্ষোভকারীরা এই মাত্রার আন্তর্জাতিক সমর্থন পাচ্ছে না, ফলে হাজার হাজার গ্রেপ্তারের পরও আন্দোলন সেভাবে গতি পাচ্ছে না। ফ্রান্সে আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশের মতো জীবনঘাতী হামলা শুরু হলে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে বিলম্ব করবে না হয়তো। আর সেটা গ্রহনযোগ্যও হয়ে উঠবে, কারণ ইতিমধ্যে মিডিয়া ফ্রেমিং হয়ে গেছে আন্দোলনকারীরা “looters” এবং “rioters”
বিবৃতির প্রভাব যে পার্থক্য গড়ে
এই যুক্তির সবচেয়ে ধারালো অংশ হলো আন্তর্জাতিক বিবৃতির ফল। একটি আন্দোলনকে যখন বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রকাশ্যে বৈধতা দেয়, তখন আন্দোলনকারীদের মনোবল ও দাবি বাড়ে, আর সরকারের ওপর চাপ তৈরি হয়। স্বাভাবিকভাবেই, এই বাড়তি বৈধতা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে, আন্দোলনকে কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং শান্ত হওয়ার সুযোগ কমিয়েছে। ফ্রান্সের সরকারকে বিশ্ব এমন কোনো বার্তা দিচ্ছে না, বরং বলছে সহিংসতা থামাও। মাপকাঠির এই ফারাকই মূল প্রশ্ন।
এখন আসা যাক লিথ্যাল উইপন ব্যবহারের বিষয়।
জুলাইয়ের ১৬ তারিখে যেই ৫ জন ছাত্র মারা যাওয়ার ঘটনা নিয়ে প্রাইভেট-পাবলিকসহ হাজার হাজার ছাত্র জুলাইয়ের ১৮ তারিখে রাস্তায় নেমে আসে, তার আগপর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রাথমিক প্রতিরোধ হিসেবে রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার শেলই ব্যবহার করেছে।
জুলাইয়ের ১৬ তারিখে আবু সাঈদ হত্যার বিষয়টিও এক বিশাল ধোঁয়াশা, কারণ পুলিশকে দেখা যায় তাদের দিকে তেড়ে আসা আবু সাঈদের উপর রাবার বুলেট ব্যবহার করতে, আর ফরেনসিক রিপোর্টে পাওয়া যায়, আবু সাঈদের মাথার পেছনে বড় একটি আঘাতে রক্তক্ষরণ থেকেই মৃত্যু হয়েছে, যা আন্দোলনকারীদের ছোড়া ঢিলের আঘাতেই হয়েছিল বলে বিভিন্ন সুত্রের বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়। আবু সাঈদের বাবাও এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, দাফনেরর আগে গোসল করানোর সময়েও মাথার পিছনের বড় ক্ষত থেকে রক্ত বের হয়ে আসছিলো ।
এ ছাড়া ১৬ তারিখে আর যেসব ছাত্র মারা যায়, তাদের মধ্যে ঢাকা কলেজের সামনে মারা যাওয়া ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগ এর সদস্য সবুজ আলী ও একজন হকার, যারা আন্দোলনকারীদের হাতে নিহত হয়। এ ছাড়া বাকি দুজন পুলিশের আক্রমণ থেকে পালাতে গিয়ে মারা যায়।
আন্তর্জাতিক মাধ্যমের সমর্থন আর মিডিয়ার সমর্থনে এই মৃত্যুগুলো এমনই রূপ ধারণ করে যে ১৮ই জুলাই সারা দেশের ছাত্ররা রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এরও অনেক পরে লিথ্যাল উইপনের ব্যবহার শুরু হয় জীবন বাঁচাতে।
এমন জীবনঘাতী হামলা যদি ফ্রান্সে শুরু হয়, ফ্রান্সের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি করবে?।
বরং ফ্রান্সের পুলিশ যেভাবে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে, সে নিয়ে আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো নীরব। কিন্তু বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনে ৫/৬ জন নেতৃস্থানীয় ছাত্র সমন্বয়ককে গ্রেপ্তার করার পরে তাদের মানবাধিকার রক্ষায় দাঁড়িয়ে যায় সকল মানবাধিকার সংস্থা।
এই কারণেও বাংলাদেশের সরকার ব্যাকফুটে যেতে থাকে আর আন্দোলনকারীরা সাহসী হয়ে ওঠে।
ফ্রান্স আর বাংলাদেশের আন্দোলনের ধরন আর চরিত্র একই, যা পার্থক্য গড়ে দেয়, সেটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সমর্থন। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের আবরণে সৃষ্টি হওয়া সরকারপতন আন্দোলন গতি পায় আন্তর্জাতিক সমর্থনে, আর ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের পরেও সেটা গতিশীল হতে পারছে না, কারণ বিশ্বনেতৃবৃন্দ, অ্যাম্বাসেডরদের আর জাতিসংঘসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছে না ফ্রান্সের বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা।
পতাকা হাতে আন্দোলন কি দেশাত্মবোধের পরিচয়?
ফ্রান্সের বিক্ষোভে আন্দোলনকারীদের হাতে জাতীয় পতাকা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টেও ঠিক এই দৃশ্য ছিল: পতাকা হাতে আন্দোলনকে দেশপ্রেমের রূপ দেওয়ার চেষ্টা।
কিন্তু জাতীয় পতাকা হাতে থাকলেই কোনো কাজ দেশাত্মবোধের পরিচয় হয়ে যায় না। যে পতাকা রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতীক, তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে যদি রাষ্ট্রের সম্পদ ধ্বংস করা হয়, দোকান লুট হয়, সরকারি ভবনে আগুন লাগে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিপন্ন হয় বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চলে, তবে সেটি দেশপ্রেম নয়, বরং সেই প্রতীকেরই অবমাননা। দেশকে ভালোবাসা মানে দেশের সম্পদ ও মানুষকে রক্ষা করা। দাবি যত ন্যায্যই হোক, সহিংসতা ও লুটপাট কখনোই তা আদায়ের বৈধ পথ হতে পারে না। পতাকা ব্যবহারের মাধ্যমে সহিংসতাকে নৈতিক বৈধতা দেওয়ার যে প্রবণতা, সেটি ফ্রান্স বা বাংলাদেশ, কোনো দেশেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কূটনীতিকদের কাজ হওয়া উচিত সব দেশে একই নীতিতে কথা বলা: সহিংসতা যে-ই করুক, নিন্দা; রাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে, তার জবাবদিহি; আর সহিংসতার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ দাবির পার্থক্য স্পষ্ট করা। যে ব্যবস্থা এক দেশে একই ঘটনাকে “বিপ্লব” আর অন্য দেশে “দাঙ্গা” বলে, তার সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
[TheChamp-FB-Comments]