চাইনিজ স্ক্যামারদের কাছে তরুণদের ডলারে বিক্রি – বর্ণমালা টেলিভিশন

চাইনিজ স্ক্যামারদের কাছে তরুণদের ডলারে বিক্রি

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ১৯ June, ২০২৬ | ৫:৪২ 160 ভিউ
কম্বোডিয়ায় মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভনে টার্গেট করা হচ্ছে দেশের তরুণদের। প্রযুক্তি, কম্পিউটার, সোশ্যাল মিডিয়া জানা এসব তরুণকে দেশটিতে নিয়ে গিয়ে চাইনিজ স্ক্যামারদের কম্পাউন্ডে ২ থেকে ৫ হাজার ডলারে বিক্রি করছে বাংলাদেশেরই একাধিক দালালচক্র। মূলত চীন, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারের অন্ধকার ডিজিটাল স্ক্যামিং-জগতের মাফিয়াদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এরা। কাঠখড় পুড়িয়ে কম্বোডিয়ার এসব স্ক্যামিং কম্পাউন্ড থেকে দেশে ফেরত ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন এসব কথা। জানিয়েছেন, কম্বোডিয়ার নানা শহরে চাইনিজরা বিশাল সব দালান বানিয়ে যার যার নিজস্ব স্ক্যামিংয়ের কম্পাউন্ড তৈরি করে রেখেছে। সেখানে তাদের ‘বিক্রির’ পর দালালরা সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর চাইনিজ বসরা তাদের বাধ্য করেছে সোশ্যাল মিডিয়া এবং নানা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ইউরোপ, আমেরিকার ধনীদের সঙ্গে প্রতারণা (স্ক্যাম) করতে। এই কাজে অস্বীকৃতি জানালে বা পারফরম্যান্স খারাপ হলে টর্চার সেলে নিয়ে চালানো হতো পৈশাচিক নির্যাতন। সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডগুলো থেকে প্রায় ২৫০ জন বাংলদেশিকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে আরও প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশিকে এসব কম্পাউন্ড থেকে ফিরিয়ে আনা হবে। বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়েই তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা : কম্বোডিয়ার স্ক্যামিং কম্পাউন্ড থেকে নানা কূটনেতিক প্রক্রিয়া ও এনজিও তৎপরতায় বাংলাদেশের তরুণদের দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তাদের কয়েকজন সঙ্গে কথা বলেন। প্রথম ভুক্তভোগী তরুণের বাড়ি শরীয়তপুরে। স্থানীয় দালাল রবিন শেখ ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে কম্বোডিয়ায় ৬০-৭০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেয়। বিভিন্ন ধাপে রবিন শেখকে টাকা দেওয়ার পর কম্বোডিয়ায় যাওয়ার জন্য ভিসা, বিমানের টিকিট ইস্যু করা হয়। গত বছরের ৫ জুন ভুক্তভোগী ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মালয়েশিয়ায় ট্রানজিট নিয়ে কম্বোডিয়ায় যান। সেখানে দালাল রবিনের একজন এজেন্ট তাকে নমপেন শহরে নিয়ে যায়। সেখানে ১৫-২০ দিন অবস্থানের পর তাকে নেওয়া হয় সিয়ানোক শহরে। সেখানে ভুক্তভোগীকে চাকরির কথা বলে একজন চাইনিজ বসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী জানান, কলোনির মতো বিশাল এলাকাজুড়ে ৫০, ৬০ তলার একেকটি বিল্ডিং। এখানে তরুণ-তরুণীদের রেখেই চলত স্ক্যামিংয়ের সব কাজ। চাইনিজ বস আমাকে পরদিন কম্পিউটার দিয়ে কাজে বসিয়ে ইনস্টাগ্রামের একটি অ্যাকাউন্ট দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে চ্যাট করতে বলে। স্ক্যামিং বিষয়টা বুঝতে পেরে আমি কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় আমার ওপর শারীরির ও মানসিক নির্যাতন। আমাকে জানানো হয়, এজেন্ট আমাকে তার কাছে ২০৮৭ ডলারে বিক্রি করেছে। দ্বিতীয় ভুক্তভোগীর বাড়ি জামালপুরে। পরিচিত একজনের মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিচয় হয় কম্বোডিয়ায় বসবাসরত শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। শরিফুল তাকে কম্বোডিয়ায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা খরচে এনে মাসে ৮০০ ডলারের কাজের প্রস্তাব দেয়। ভিসা নিয়ে কম্বোডিয়া আসার পর শরিফুল একেকবার একেক এজেন্টের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে ভিয়েতনাম সীমান্তের কাছাকাছি চেরাইথন এলাকায় অবস্থিত স্ক্যামিং কম্পাউন্ডে নিয়ে আসে। সেখানে তাকেও এক চাইনিজ বসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের এজেন্টরা তাকে বিক্রি করেছিল তিন হাজার ডলারে। এরপর তাকেও নিযুক্ত করা হয় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে স্ক্যামিংয়ের কাজে। তার পারফরম্যান্স ভালো ছিল না। ভুক্তভোগী বলেন, আমার কাজে সন্তুষ্ট ছিল না বলে একদিন নিয়ে যাওয়া হয় টর্চার সেলে। সেখানে ৬ জন চাইনিজ মিলে আমাকে দফায় দফায় মারতে থাকে। এরপর এমন একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ঠিকমতো বসা যায় না, ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। আমাকে ১১ দিন কোনো খাবার খেতে দেওয়া হয়নি। আমার শরীরে এই পুরো সময়ে পানি ঢালা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রায়ই মারধর এবং ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো। তিনি বলেন, প্রায় আধমরা অবস্থায় আমাকে আরেক স্ক্যামার বসের কাছে বিক্রি করা হয় ৫ হাজার ডলারে। সেখানেও চলে নির্যাতন। যেসব দালালের মাধ্যমে কম্বোডিয়া এসেছিলাম, তারা পরে আর ফোন ধরত না। স্ক্যামার কম্পাউন্ডের বসরা যে চাইনিজ সে বিষয়ে নিশ্চিত কীভাবে হলেন-এমন প্রশ্নে ভুক্তভোগীরা বলেন, কম্বোডিয়ায় সবাই এ বিষয়টি জানে। তারা যে ভাষায় কথা বলত, সেটিও আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি। কীভাবে করা হয় স্ক্যামিং : ভুক্তভোগী তরুণরা জানিয়েছেন, হাজার-হাজার তরুণ-তরুণীকে সেখানে স্ক্যামিংয়ের কাজে বাধ্য করা হয়। এসব স্ক্যামারদের টার্গেট হলো ইউরোপ, আমেরিকার ধনী মানুষরা। স্ক্যামিং কম্পাউন্ডে কম্পিউটার নিয়ে তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক দিয়ে প্রথমে শিকার খোঁজে। এসব অ্যাকাউন্টের প্রোফাইলে থাকে ধনী, বিলাসী জীবনযাপনকারী মেয়েদের ছবি। তাদের দৈনন্দিন জীবনের জমকালো ছবি, ভিডিও পোস্ট থাকে। কিন্তু এসব অ্যাকাউন্ট মূলত চালায় বাধ্য হয়ে স্ক্যামিংয়ে আসা তরুণরা। তারা ইউরোপ-আমেরিকার ধনী, বিত্তবান মানুষকে টার্গেট করে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে মেয়ে হিসাবে। ওপাশ থেকে যখন ইউরোপ-আমেরিকার পুরুষরা ভিডিও কল দেয়, তখন সেন্টারে অবস্থান করা প্রোফাইল ছবির মেয়েটি তাদের সঙ্গে কথা বলে। একপর্যায়ে বন্ধুত্ব খুবই জোরালো হয়। পুরুষটি যখন মেয়েটির এত জমকালো জীবনের রহস্য জানতে চায় তখন মেয়েটি চাইনিজ স্ক্যামারদের তৈরি করা ওয়েবসাইট ও পেইজে বিনিয়োগের মুনাফার কথা তুলে ধরে এবং সেখানে বিনিয়োগ করতে বলে। যেখান থেকে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের লাভ পাওয়া যায়। ধনী দেশগুলোর পুরুষরা বান্ধবীর কথা রেখে বিনিয়োগ করে। প্রথমে কয়েকবার মুনাফাও পায়। এভাবে যখন বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করা হয়, তখন পুরো টাকাই সরিয়ে নেওয়া হয়। কারণ, এসব ওয়েবসাইট বা পেজের সব নিয়ন্ত্রণ থাকে চাইনিজ স্ক্যামারদের হাতেই। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, সাইবার স্ক্যামের এই জগৎটি মানব পাচারের এক নতুন ধরন। বাংলাদেশের একজন তরুণকে থাইল্যান্ডে নেওয়ার কথা বলে হয়তো মিয়ানমার বা কম্বোডিয়ার সীমান্তে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে তাকে সাইবার কম্পাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চাইনিজদের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে সে অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার একজন মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। দেখা যাচ্ছে, এখানে কয়েকটি দেশ মিলিয়ে ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ ঘটছে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের নাগরিক এই স্ক্যামারদের ফাঁদে পড়ে বিলিয়ন ডলার খুইয়েছে। তাই এসব বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ আছে। তিনি বলেন, যাদের বাধ্য করানো হচ্ছে স্ক্যাম করতে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকরা আছেন। টার্গেট করা হচ্ছে যারা প্রযুক্তিজ্ঞান রাখে এবং মোটামুটিভাবে ইংরেজি লিখতে-পড়তে পারে তাদের। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে পুরো বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম-এই দেশগুলোয় যারা যাচ্ছেন, তাদের অনুমোদন দেওয়ার আগে ভালোভাবে বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা উচিত। কেউ বিপদে পড়লে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, ইন্টারপুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে কীভাবে দ্রুত উদ্ধার করা যাবে, দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে, সে বিষয়গুলোয়ও আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

[TheChamp-FB-Comments]
ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
শ্রমিক অসন্তোষে স্থবির দেশের প্রধান রপ্তানি খাত: বড় সংকটের মুখে তৈরি পোশাকশিল্প বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা ও দাফনে জামায়াত-শিবিরের বাধার ঘটনার প্রতিবাদে শৈলকুপায় মানববন্ধন ইউনূস আমলে হামের টিকার অনিয়ম তদন্তে কমিশন গঠন মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের জের ধরে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ ৫ই নভেম্বর, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এই অঞ্চলের একাধিক পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করছেন। একপর্যায়ে পুলিশের রক্তচক্ষু ও বাধা উপেক্ষা করে হাজারো শ্রমিক রাজপথে নেমে এলে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। সকালে সাভার ও আশুলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে শ্রমিকেরা যথারীতি উপস্থিত হলেও তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে কর্মবিরতির ডাক দেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সার্বিক নিরাপত্তাশঙ্কা দেখা দিলে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের জামগড়া, নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুর এলাকার একাধিক পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। কাঠগড়া এলাকার একটি বিশিষ্ট শিল্পগ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় এই অঞ্চলের অধিকাংশ কারখানাতেই ইতিমধ্যে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু কারখানায় শ্রমিকেরা ভেতরে থাকলেও তারা উৎপাদন কাজ বন্ধ রেখেছেন। সকাল ১০টার পর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পরিস্থিতি মোড় নেয় নতুন দিকে। সেখানকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা এক জোট হয়ে সড়কে অবস্থান নেন এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে বাধা দিলে তৈরি হয় মুখোমুখি অবস্থান, যা এলাকায় তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করে। পরে শ্রমিকেরা পুলিশের সে বাধা তোয়াক্কা না করেই একযোগে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং জামগড়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল, পদ্মার মোড় এবং আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের বিভিন্ন কৌশলগত ও সংবেদনশীল পয়েন্টে পুলিশ ছাড়াও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিক্ষোভরত শ্রমিকদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের কাছাকাছি অবস্থানে থেকে সতর্ক টহল দিচ্ছেন। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য পুরো শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ট্রাম্প শ্রমিকদের কারখানায় ফিরে আসার আহ্বান শ্রমমন্ত্রীর খুলনা অঞ্চলে চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্য সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে ফের সড়ক অবরোধ শেকৃবি শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করবে সংসদীয় ককাস যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ ইরান যুদ্ধ: জেডি ভ্যান্স ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ থেকে ডিজিই-পে বিচ্ছিন্ন করল বাংলাদেশ ব্যাংক তরঙ্গ নবায়ন ব্যয় যৌক্তিক করার আহ্বান মোবাইল অপারেটরদের এশিয়া ফাউন্ডেশনের প্রকল্পে ৯০ হাজার উদ্যোক্তাকে সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বাংলাদেশ নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা তদন্তের দাবি, ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর Newsmax-এ বিশেষ কলাম বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হতে চায় বাংলাদেশ: তিতুমীর শ্রমিক আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থানে সরকারঃ পুলিশ ও দলীয়কর্মী ছাড়াও ২৫ প্লাটুন যৌথ বাহিনী মোতায়েন জাতীয়ভাবে উপেক্ষিত জেলহত্যা দিবস, সিলেটে নিষেধাজ্ঞা, মব-গ্রেফতার হুমকির মাথায় নিয়েই আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতাদের স্মরণ জুলাইর ওয়াসিম হত্যা-মামলার আসামিকে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব দেওয়া কি পুরস্কার? প্রশ্ন- কারা মেরেছে তবে ওয়াসিমকে? বাপে মারছে সৈনিক, মায়ে মারছে কৃষক, পোলায় মারছে শ্রমিক’—এমন স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গতকাল মঙ্গলবারও এসব এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। আজ বুধবার সকালেও গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে নতুন করে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলগুলোয় অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গাজীপুরে হামলায় গুরুতর আহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেন। সোমবার গাজীপুরের জয়দেবপুরের বাহাদুরপুর এলাকায় নোমান টেরি টাওয়েল মিলসের সামনে সংঘর্ষের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করার সময় হামলার শিকার হন তিনি। পরে স্বজনরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি গাজীপুরের লায়লা স্টাইল লিমিটেডের শ্রমিক ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর পর গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকার কয়েকটি কারখানায় গতকাল ছুটি ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে প্রচলিত ন্যূনতম মজুরিতে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সংকটে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। এ অবস্থায় মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, শ্রমিকদের ওপর হামলা এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় চাকরিচ্যুতির অভিযোগেরও প্রতিকার চাইছেন শ্রমিকরা। আজ বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার সাইনবোর্ড, বাংলাবাজার ও মির্জাপুর এলাকায় দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়। পরে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। জয়দেবপুর, সালনা, রাজেন্দ্রপুর ও শফিপুর এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাংলাবাজার ও কাশিমপুর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। গাজীপুরের বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী এলাকাতেও সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। তাঁদের সরিয়ে দিতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর পর বাংলাবাজার এলাকার কয়েকটি কারখানায় বুধবারও ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে কতটি কারখানা বন্ধ ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সাভারের হেমায়েতপুরেও আজ সকালে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার হেমায়েতপুর এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। দুপুর থেকে বিকাল ৫টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত চলা অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। পরে শ্রমিকরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করলে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়ও আজ বুধবার নতুন করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের পাশে কুতুবাইল কাঠেরপুল এলাকায় জড়ো হন কয়েকটি কারখানার শ্রমিক। তাঁরা মূল সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের অভিযোগ, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। এ সময় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাঁদের ওপর হামলা চালান। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ছোড়া টিয়ার গ্যাসে স্থানীয় একটি হোসিয়ারি কারখানার শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাজধানীর মিরপুরেও গতকাল মঙ্গলবার শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। সংঘর্ষে চার পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে কালশী সড়কে এক পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংঘর্ষের কারণে মেট্রোরেল চলাচলেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। নিরাপত্তার কারণে মিরপুর-১০ স্টেশনে প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হয়। আজ বুধবার মিরপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের দাবি, বুধবার শ্রমিকদের সড়কে নামার সুযোগ হয়নি এবং অনেক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দৈনিক বাংলার প্রকাশিত বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ৩০৬টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এতে ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৭৯৩ শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হয়। এর আগে ১ নভেম্বর ৫২৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল এবং কর্মস্থল ছেড়েছিলেন ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ জন শ্রমিক। অর্থাৎ আন্দোলনের প্রভাবে একাধিক শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আজ বুধবার সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে মোট ২৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া ও বাইপাইল এলাকায় পাঁচ প্লাটুন, গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ১৩ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছয় প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করছে। এর পাশাপাশি পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও শিল্পাঞ্চলে টহল দিচ্ছেন। এদিকে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ছয় সদস্যের এ বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ বুধবার। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ আজাদ সোবহানি। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন এ বি এম সামসুদ্দিন ও আসিব আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাবুল আক্তার ও আনোয়ার হোসেন। শ্রমিকদের প্রত্যাশা, নতুন মজুরি বোর্ড দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন থামেনি; বরং রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের ক্ষোভ, অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার চাপ—সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক খাতের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ডিবি হেফাজতে ইকবাল সোবহান চৌধুরীঃ ২৭ মাস সমঝোতা করেও শেষ রক্ষা হলোনা শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টার