ভূমিকম্পে ঢাকায় কোন এলাকা নিরাপদ, ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ কোথায় – বর্ণমালা টেলিভিশন

ভূমিকম্পে ঢাকায় কোন এলাকা নিরাপদ, ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ কোথায়

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ | ৭:২৮ 74 ভিউ
বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকা শহরের ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে এবং দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা আছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নিজেই। এখন প্রশ্ন উঠছে, ঢাকায় কি কোনো নিরাপদ এলাকা নেই? এ নিয়ে রাজধানীবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এবং বিধিমালা অমান্য করে তৈরি বিপুল সংখ্যক বহুতল ভবনের ভিড়ে নিরাপদ জায়গা কোথাও আছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন ও ফল্ট লাইনের অবস্থান দুর্যোগ মোকাবিলায় অনুকূলে থাকলেও ভবন নির্মাণে অনিয়ম, ভরাট জমির প্রসার এবং অত্যধিক জনসংখ্যা শহরটিকে এক জটিল সমীকরণের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ভূমিকম্পে ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ কোন এলাকা কতটুকু নিরাপদ, তা বুঝতে হলে দুটি দিকে নজর দিতে হবে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।—এক. শহরের ভূতাত্ত্বিক গঠন। দুই. শহরের অবকাঠামো। ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার ভূতাত্ত্বিক বিষয়টিকে বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রায় একই। বেশির ভাগ অংশ, বিশেষ করে উত্তর দিকের মাটি মধুপুরের লাল মাটি। যেটি বেশ শক্তি।’ কিন্তু মোগল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ পিরিয়ড, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে উত্তর দিকে এবং বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে শহর খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। তখন এই লাল মাটি 'অকুপাইড' হয়ে যায়। এরপর শহর বাড়তে শুরু করে পূর্ব-পশ্চিমে। সেখানে নরম পলিমাটি এবং জলাশয় ছিল যা ভরাট করা হয়েছে। হুমায়ুন আখতার জানান, শুধু যদি ভূতাত্ত্বিক গঠন বিবেচনা করা হয়, তাহলে মধুপুরের লাল মাটির একই গড়নের যেসব এলাকা রয়েছে যেমন রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান, তেজগাঁও ইত্যাদি এলাকা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কিন্তু শুধু ভূতাত্ত্বিক গঠনের ওপর ঢাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নির্ভর করছে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলছেন, ‘ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ, কোনটি নয়, এটা বলা মুশকিল। যতক্ষণ না ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে, ততক্ষণ বলা যাবে না কোনটা ঝুঁকিপূর্ণ বা ঝুঁকিমুক্ত।’ লাল মাটির এলাকায় ভবন, তা-ও কেন ঝুঁকিপূর্ণ শক্ত মাটির এলাকাও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এর প্রথম কারণ, সেসব এলাকায় বহু পুরোনো ভবন রয়েছে যেগুলো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। পর্যবেক্ষণের অভাবে সেগুলোও এখন অনিরাপদ। আরও একটি কারণ উল্লেখ করে হুমায়ুন বলেন, ‘সেসব এলাকায় এমন ভবন আছে, যেগুলোর অনুমোদন ছিল হয়তো দুই বা তিন তলার জন্য, কিন্তু পরে সেগুলো বহুতলে রূপান্তরিত হয়েছে। ফাউন্ডেশন দুই তলার, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে সাত তলা। এগুলো অননুমোদিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ।’ এ ছাড়া নতুন যেসব ভবন তৈরি হচ্ছে, তাতে করা হচ্ছে অনিয়ম, ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্ন মানের কাঁচামাল। তাতে ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনীয় হিসেবে তৈরিই হচ্ছে না। ঢাকার ৯০ শতাংশ ভবন বিল্ডিং কোডের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে বলে রাজউকের পরিসংখ্যানের কথা সম্প্রতি উল্লেখ করেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তবে গত ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পের পর রাজউক জানিয়েছে, বাংলাদেশে গত কিছুদিনে কয়েক দফায় ভূমিকম্প হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে জরিপ চালিয়ে ঢাকায় ৩০০টি ভবনকে 'ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করেছে তারা। ভরাট জায়গায় নির্মিত ভবন কি অনিরাপদ বুয়েট অধ্যাপক আনসারী জানান, ঢাকার বিভিন্ন দিকে ডোবা ও জলাশয় ভরাট করে কিছু এলাকা গড়ে উঠেছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, আফতাবনগর—এ রকম প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। মধুপুরের লাল মাটির মতো প্রাকৃতিকভাবে শক্ত মাটি নেই এখানে। তাই এ ধরনের এলকায় ভবন তৈরির আগে সেখানকার মাটি বহুতল ভবন ধরে রাখার মতো সক্ষমতায় প্রস্তুত করে নিতে হবে। মেক্সিকোর সান হুয়ানিকো শহরের একটি উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘এই শহরটি চারদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। মাঝে গামলার মতো শহরটি ৪০ থেকে ৫০ মিটার মাটি দিয়ে ভরাট করা এবং সেখানেই গড়ে উঠেছিল নগর।’ ১৯৮৫ সালে সেখানে ৮ দশমিক ১ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয় এবং ৭০ শতাংশ ভবন ধসে পড়ে মারা যায় ১৫ হাজারের কাছাকাছি মানুষ। গবেষণায় উঠে আসে, সেখানকার মাটি ভরাট করার সময় মানা হয়নি 'গ্রাউন্ড ইম্প্রুভমেন্ট টেকনিক'। অধ্যাপক আনসারী বলেন, ‘এ রকম জায়গায় যদি মাটিকে দুর্মুজ না করা হয় বা প্রস্তুত না করা হয়, যেটাকে গ্রাউন্ড ইম্প্রুভমেন্ট টেকনিক বলে, এটি যদি না করা হয়, ভবন বেশি দুলে উঠবে এবং ভেঙে পড়বে।’ তার ভাষ্যমতে, মানুষ এখন পাইল করেই বিল্ডিং তৈরি করে ফেলছে। ‘পাইলও দিতে হবে, মাটিকেও প্রস্তুত করতে হবে। এমনটা যদি না করা হয়, তখন দূরে উৎপন্ন ভূমিকম্প হলেও মাটির কম্পন আর ভবনের কম্পন মিলে ভবন ধসে পড়ার শঙ্কা থাকে। আর কাছে উৎপন্ন ভূমিকম্প হলে তো কথাই নেই,’ বলেন তিনি। ভূমিকম্পে ঢাকায় কোন এলাকা নিরাপদ, ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ কোথায় পুরান ঢাকা কি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ আনসারীর মতে, আপাতদৃষ্টিতে পুরান ঢাকাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও, নতুন ঢাকা ও পুরান ঢাকার মধ্যে পার্থক্য একটাই। তা হলো পুরান ঢাকার সরু রাস্তা। রাস্তাগুলো সরু হওয়ায় দুর্যোগের সময় মানুষকে দ্রুত সরানো কঠিন হতে পারে। তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে পুরনো কিছু ভবন শত বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। কোনো ভূমিকম্পেও ভেঙে পড়েনি। তাই কাঠামোর মানই বেশি গুরুত্ব পায়। ঢাকার বিপদ ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ ঢাকার ভেতরে কোনো ফল্ট লাইন নেই। তবে বাংলাদেশের ফল্ট লাইন বা চ্যুতি-রেখার জন্য পাঁচটি জায়গা পরিচিত। বার্মা বা মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী, যাকে বলে প্লেট বাউন্ডারি ১; সেখানে ১৭৬২ সালে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। আরেকটা প্লেট বাউন্ডারি ২, যেটা নরসিংদীর ওপর দিয়ে চলে গেছে; অতীতে এখানে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এরপর প্লেট বাউন্ডারি ৩, যেটা সিলেট থেকে ইন্ডিয়ার দিকে চলে গেছে; এখানে ১৯১৮ এবং ১৯৬৯ সালে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। আর আছে ডাউকি ফল্ট, যেখানে ১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। সবশেষ আছে মধুপুর ফল্ট, যেখানে ১৮৮৫ সালে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। গবেষকদের মতে, এগুলোর কিছু জায়গায় ৩৫০ বছর, আবার কিছু জায়গায় ৯০০ বছরের মতো সময় পরে বড় ভূমিকম্প হতে পারে। তবে এর বাইরেও কিছু ফল্ট লাইন আছে, যেগুলোকে বলে 'ব্লাইন্ড ফল্ট'। ব্লাউন্ড ফল্ট হলো এমন ধরনের ফল্ট, যা ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাই ভূপৃষ্ঠে কোনো চিহ্ন না থাকায় সাধারণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে এটি দেখা যায় না বা শনাক্ত করা কঠিন হয়। এই ধরনের ফল্ট বিপজ্জনক। বাংলাদেশে দুটো চিহ্নিত ব্লাইন্ড ফল্ট আছে—একটি ময়মনসিংহে, অন্যটি রংপুরে। যেহেতু এই ফল্ট লাইনগুলো শনাক্ত করা কঠিন, তাই কোনো সতর্কবার্তাও পাওয়া যায় না। ঢাকার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে এই ব্লাইন্ড ফল্টগুলো। ঢাকাকে কি নতুন করে গোছানো সম্ভব ঢাকা শহরকে একটা 'সুশীল' বা সুশৃঙ্খলা জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না, এই বিষয়ে দ্বিমত আছে বিশেষজ্ঞদের ভেতরেও। স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে, ‘রেট্রোফিকেশন, পরিমার্জন, পরিশীলিতকরন, ব্যবহার পরিবর্তন—এই চারটি কাজের মধ্য দিয়ে ঢাকাকে নতুনভাবে সাজানো সম্ভব। শতভাগ না হলেও কিছু অংশে সম্ভব।’ এর সঙ্গে 'কিন্তু' শব্দটা জুড়ে দিয়ে কিছু শর্তের কথাও বলেছেন তিনি। যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়, যেমন নতুন ভবনের অনুমোদন দেওয়ার সময় সব নিয়ম মেনেছে কি না, যাচাই করা; ঢাকা শহরের প্রতিটি ভবন যাচাই করে নিরাপদ ভবনগুলোকে গ্রিন জোন, কিছু সংস্কার কাজ করে যেগুলোকে নিরাপদ বানানো সম্ভব, সেগুলোকে ইয়েলো জোন এবং অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে রেড জোন হিসেবে মার্ক করে সিলগালা করার যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করার কথা বলেন এই স্থপতি। তার মতে, নির্দয় না হলে এই শহরকে বাঁচানো সম্ভব নয়। পাশাপাশি ভূতত্ত্ববিদ হুমায়ুন আবার বলেন, ‘ঢাকা শহরে যেভাবে একটা ভবনের সঙ্গে আরেকটা ভবন লাগোয়া, একটি ভবন হেলে পড়লে অপরটির অটোমেটিক ক্ষতি হবে। এমন অবস্থায় কীভাবে রেট্রোফিট করা সম্ভব? এগুলো অনুমোদন দেওয়ার সময় যাচাই করার বিষয়।’ এখন একটি ভবন নিরাপদ হলেও তার পাশের ভবনের কারণেই হয়তো সেটি ঝুঁকির মধ্যে আছে বলে জানান তিনি। সূত্র : বিবিসি বাংলা

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
চাচার বাড়ি থেকে ফেরার পথে শিশুকে ধর্ষণ, গ্রেফতার ১ কেন ওয়াদুদকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন জানালেন মৌসুমী অবসরের ঘোষণা দিলেন নেইমার উল্টোরথে ব্রাজিলের ‘মিশন হেক্সা কমপ্লিট’ উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে ৮ জনের মৃত্যু দেশের ১২ জেলায় ঝড়সহ বজ্রবৃষ্টির আভাস উলিপুরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে রাতভর ধর্ষণ যুক্তরাষ্ট্র আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু, আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে উচ্ছ্বসিত মন্তব্য জামায়াত আমিরের মাদ্রাসাছাত্রকে বছরজুড়ে শিক্ষক ও ৩ ছাত্রের ধর্ষণ: ‘ইসলামের স্বার্থে’ আপোস মীমাংসায় অভিভাবকদের সম্মতি ফুটপাতে মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে ধর্ষণ, বিএনপিকর্মী ল্যাংড়া খোকন পলাতক তুরাগ হত্যাকাণ্ড: বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে উঠে এলো লীগ কর্মীদের নির্মমভাবে হত্যার আরও বিশদ তথ্য জুলাই সিডিআই বলায় শাওনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ, নাম আছে মাহিরও তারেক রহমান: বিচারের নামে কারো প্রতি যেন ‘অবিচার’ করা না হয় সোনাগাজীতে যুবদল নেতার নেতৃত্বে অর্ধকোটি টাকার মাছবোঝাই ট্রাক ছিনতাই ইউরোপজুড়ে তাপপ্রবাহের তাণ্ডব, তিন দেশে প্রাণ গেল ৩৭০০ মানুষের বিচারকের বাড়ি থেকে ১৯ লাখ টাকার সোনাসহ মামালাল চুরি: বিএনপির ২ নেতাসহ গ্রেপ্তার ৫ জুলাই চেতনা নিয়ে ব্যবসা, যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খামেনির জানাজায় যোদ দিলে সহায়তা বন্ধের হুমকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউটিউবে আসছে দৃষ্টিনন্দন ফিচার মেসিকে নিয়েই কেপ ভার্দের বিপক্ষে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা