খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ – বর্ণমালা টেলিভিশন

খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ১১ April, ২০২৫ | ৯:২৭ 198 ভিউ
বর্তমানে ব্যাংক খাতের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। গত বছরের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের সমস্যার সমাধান করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অংশ হিসাবে কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়াসহ আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশের সার্বিক হালনাগাদ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ব্যাংক খাতের সার্বিক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বর শেষে তফশিলি ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ২০ দশমিক ২ শতাংশ। সেপ্টেম্বর শেষে ছিল ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৭ শতাংশ। জুনে ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ১২ শতাংশ। জুন থেকে ডিসেম্বর-এ ছয় মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক দখল করে নজিরবিহীন লুটপাট করা হয়েছে। লুটপাটের টাকার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে ওইসব ঋণ এখন আদায় হচ্ছে না। আদায় না হওয়ার কারণে ব্যাংক সেগুলোকে খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করছে। এতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের এ বৃদ্ধিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইএমএফ উদ্বেগজনক হিসাবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের সমস্যা এখন অন্যতম একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যেসব ব্যাংকে বেশি জালজালিয়াতি হয়েছে, ওইসব ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ওই টাস্কফোর্স ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধার করতে কাজ করছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে চলমান সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও কয়েকটি ব্যাংকে সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থবছরের শুরুর দিকে ব্যাংকব্যবস্থায় ব্যাপক তারল্য চাপ ছিল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত নানাবিধ পদক্ষেপ এবং বিশেষ তারল্য সহায়তার কারণে ব্যাংক খাতের সার্বিক তারল্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি শেষে ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়ে অতিরিক্ত তরল সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকায়, যা সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছিল। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবে ব্যাংক খাতে সব ধরনের আমানত ও ঋণের সুদের হারও বেড়েছে। ঋণের সুদের হার বাড়ায় এবং সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির কারণে একদিকে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। অন্যদিকে আমানতের সুদের হার বাড়ায় গ্রাহকরা ব্যাংকে সঞ্চয় করতে উৎসাহিত হচ্ছেন। এছাড়া ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জালজালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা কিছুটা বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও তারল্যের জোগান বাড়ানো হয়েছে। এসব মিলে ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট ধীরে ধীরে কমে আসছে। প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার জন্য উচ্চ খাদ্যমূল্য, পণ্যের সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ অসম্পূর্ণ বাজার কাঠামোকে দায়ী করা হয়েছে। এসব সমস্যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম প্রভাবক হিসাবে কাজ করছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের সার্বিক অর্থনীতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো সামনে রেখে মাঝারি মাত্রার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারমূল্য বিশেষত খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে পণ্যমূল্যের স্তরে স্থিতিশীলতা আনয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরুরি ও প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করছে। সেগুলো বাস্তবায়নের জন্যও কাজ করছে। ফলে আগামী জুনের মধ্যে এ হার ৮ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। এদিকে বুধবার প্রকাশিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ডবল ডিজিটে অর্থাৎ ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত, সম্ভাবনা ও সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যব্যবস্থা দেশের অগ্রাধিকার খাতগুলোর বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি, রপ্তানিমুখী শিল্প, আমদানি বিকল্প শিল্প এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই) খাত। এসব খাতের বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর পদক্ষপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানার পাশাপাশি বর্তমান খেলাপি ঋণের মাত্রা হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়াও ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থসুরক্ষা ও আস্থা পুনরুদ্ধারসহ আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সঙ্গে সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

[TheChamp-FB-Comments]
ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
শ্রমিক অসন্তোষে স্থবির দেশের প্রধান রপ্তানি খাত: বড় সংকটের মুখে তৈরি পোশাকশিল্প বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা ও দাফনে জামায়াত-শিবিরের বাধার ঘটনার প্রতিবাদে শৈলকুপায় মানববন্ধন ইউনূস আমলে হামের টিকার অনিয়ম তদন্তে কমিশন গঠন মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের জের ধরে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ ৫ই নভেম্বর, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এই অঞ্চলের একাধিক পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করছেন। একপর্যায়ে পুলিশের রক্তচক্ষু ও বাধা উপেক্ষা করে হাজারো শ্রমিক রাজপথে নেমে এলে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। সকালে সাভার ও আশুলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে শ্রমিকেরা যথারীতি উপস্থিত হলেও তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে কর্মবিরতির ডাক দেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সার্বিক নিরাপত্তাশঙ্কা দেখা দিলে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের জামগড়া, নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুর এলাকার একাধিক পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। কাঠগড়া এলাকার একটি বিশিষ্ট শিল্পগ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় এই অঞ্চলের অধিকাংশ কারখানাতেই ইতিমধ্যে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু কারখানায় শ্রমিকেরা ভেতরে থাকলেও তারা উৎপাদন কাজ বন্ধ রেখেছেন। সকাল ১০টার পর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পরিস্থিতি মোড় নেয় নতুন দিকে। সেখানকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা এক জোট হয়ে সড়কে অবস্থান নেন এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে বাধা দিলে তৈরি হয় মুখোমুখি অবস্থান, যা এলাকায় তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করে। পরে শ্রমিকেরা পুলিশের সে বাধা তোয়াক্কা না করেই একযোগে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং জামগড়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল, পদ্মার মোড় এবং আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের বিভিন্ন কৌশলগত ও সংবেদনশীল পয়েন্টে পুলিশ ছাড়াও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিক্ষোভরত শ্রমিকদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের কাছাকাছি অবস্থানে থেকে সতর্ক টহল দিচ্ছেন। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য পুরো শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ট্রাম্প শ্রমিকদের কারখানায় ফিরে আসার আহ্বান শ্রমমন্ত্রীর খুলনা অঞ্চলে চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্য সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে ফের সড়ক অবরোধ শেকৃবি শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করবে সংসদীয় ককাস যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ ইরান যুদ্ধ: জেডি ভ্যান্স ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ থেকে ডিজিই-পে বিচ্ছিন্ন করল বাংলাদেশ ব্যাংক তরঙ্গ নবায়ন ব্যয় যৌক্তিক করার আহ্বান মোবাইল অপারেটরদের এশিয়া ফাউন্ডেশনের প্রকল্পে ৯০ হাজার উদ্যোক্তাকে সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বাংলাদেশ নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা তদন্তের দাবি, ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর Newsmax-এ বিশেষ কলাম বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হতে চায় বাংলাদেশ: তিতুমীর শ্রমিক আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থানে সরকারঃ পুলিশ ও দলীয়কর্মী ছাড়াও ২৫ প্লাটুন যৌথ বাহিনী মোতায়েন জাতীয়ভাবে উপেক্ষিত জেলহত্যা দিবস, সিলেটে নিষেধাজ্ঞা, মব-গ্রেফতার হুমকির মাথায় নিয়েই আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতাদের স্মরণ জুলাইর ওয়াসিম হত্যা-মামলার আসামিকে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব দেওয়া কি পুরস্কার? প্রশ্ন- কারা মেরেছে তবে ওয়াসিমকে? বাপে মারছে সৈনিক, মায়ে মারছে কৃষক, পোলায় মারছে শ্রমিক’—এমন স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গতকাল মঙ্গলবারও এসব এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। আজ বুধবার সকালেও গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে নতুন করে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলগুলোয় অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গাজীপুরে হামলায় গুরুতর আহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেন। সোমবার গাজীপুরের জয়দেবপুরের বাহাদুরপুর এলাকায় নোমান টেরি টাওয়েল মিলসের সামনে সংঘর্ষের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করার সময় হামলার শিকার হন তিনি। পরে স্বজনরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি গাজীপুরের লায়লা স্টাইল লিমিটেডের শ্রমিক ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর পর গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকার কয়েকটি কারখানায় গতকাল ছুটি ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে প্রচলিত ন্যূনতম মজুরিতে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সংকটে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। এ অবস্থায় মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, শ্রমিকদের ওপর হামলা এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় চাকরিচ্যুতির অভিযোগেরও প্রতিকার চাইছেন শ্রমিকরা। আজ বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার সাইনবোর্ড, বাংলাবাজার ও মির্জাপুর এলাকায় দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়। পরে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। জয়দেবপুর, সালনা, রাজেন্দ্রপুর ও শফিপুর এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাংলাবাজার ও কাশিমপুর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। গাজীপুরের বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী এলাকাতেও সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। তাঁদের সরিয়ে দিতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর পর বাংলাবাজার এলাকার কয়েকটি কারখানায় বুধবারও ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে কতটি কারখানা বন্ধ ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সাভারের হেমায়েতপুরেও আজ সকালে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার হেমায়েতপুর এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। দুপুর থেকে বিকাল ৫টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত চলা অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। পরে শ্রমিকরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করলে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়ও আজ বুধবার নতুন করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের পাশে কুতুবাইল কাঠেরপুল এলাকায় জড়ো হন কয়েকটি কারখানার শ্রমিক। তাঁরা মূল সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের অভিযোগ, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। এ সময় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাঁদের ওপর হামলা চালান। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ছোড়া টিয়ার গ্যাসে স্থানীয় একটি হোসিয়ারি কারখানার শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাজধানীর মিরপুরেও গতকাল মঙ্গলবার শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। সংঘর্ষে চার পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে কালশী সড়কে এক পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংঘর্ষের কারণে মেট্রোরেল চলাচলেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। নিরাপত্তার কারণে মিরপুর-১০ স্টেশনে প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হয়। আজ বুধবার মিরপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের দাবি, বুধবার শ্রমিকদের সড়কে নামার সুযোগ হয়নি এবং অনেক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দৈনিক বাংলার প্রকাশিত বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ৩০৬টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এতে ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৭৯৩ শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হয়। এর আগে ১ নভেম্বর ৫২৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল এবং কর্মস্থল ছেড়েছিলেন ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ জন শ্রমিক। অর্থাৎ আন্দোলনের প্রভাবে একাধিক শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আজ বুধবার সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে মোট ২৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া ও বাইপাইল এলাকায় পাঁচ প্লাটুন, গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ১৩ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছয় প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করছে। এর পাশাপাশি পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও শিল্পাঞ্চলে টহল দিচ্ছেন। এদিকে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ছয় সদস্যের এ বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ বুধবার। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ আজাদ সোবহানি। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন এ বি এম সামসুদ্দিন ও আসিব আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাবুল আক্তার ও আনোয়ার হোসেন। শ্রমিকদের প্রত্যাশা, নতুন মজুরি বোর্ড দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন থামেনি; বরং রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের ক্ষোভ, অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার চাপ—সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক খাতের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ডিবি হেফাজতে ইকবাল সোবহান চৌধুরীঃ ২৭ মাস সমঝোতা করেও শেষ রক্ষা হলোনা শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টার