ইউরোপের ‘ব্যতিক্রমী’ গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহে ধুঁকছে অর্থনীতি, শুকিয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো – বর্ণমালা টেলিভিশন

ইউরোপের ‘ব্যতিক্রমী’ গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহে ধুঁকছে অর্থনীতি, শুকিয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ২৫ August, ২০২৬ | ৫:২৯ 58 ভিউ
ইউরোপজুড়ে চলতি গ্রীষ্মের ভয়াবহ তাপপ্রবাহে মহাদেশের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। রাইন, দানিউব ও পো নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর পানির স্তর রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। জার্মানির কোলন শহরে রাইন নদীর পানির মাপক এই মাসের শুরুতে ১৮১৬ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায়। নদীর সবচেয়ে অগভীর অংশ কাউব-এ দুই সপ্তাহ আগে পানির স্তর নেমে দাঁড়ায় মাত্র ৬ সেন্টিমিটারে, যেখানে ২০১৮ সালের আগের সর্বনিম্ন রেকর্ড ছিল ২৫ সেন্টিমিটার। এই নদীগুলো আকারে ছোট হলেও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধমনী হিসেবে কাজ করে। এগুলো পানীয় জলের উৎস, বিদ্যুৎকেন্দ্র শীতলীকরণ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পর্যটনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের তাপপ্রবাহ একেবারে ব্যতিক্রমী পর্যায়ের এবং রাইন নদী এখন প্রায় বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে, যার মূল্য চোকাতে হবে ইউরোপের অর্থনীতিকে। তেল, পেট্রল ও রাসায়নিক পণ্যের মতো তরল পণ্য এবং লৌহআকরিক, কয়লা ও শস্যের মতো শুকনো পণ্য পরিবহনে নদীপথ চিরাচরিতভাবে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। নেদারল্যান্ডসের রটারডামের ইরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সরবরাহ-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রোমার্ট ডেকার বলেন, এমন পরিস্থিতিতে জলপথ ব্যাহত হওয়া বিরল ঘটনা, কিন্তু ঘটলে তার পরিণতি হয় ভয়াবহ, কারণ এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত থাকে না। এই গ্রীষ্মে রাইন নদীর পানির স্তর জার্মানির প্রয়োজনীয় কয়লা, রাসায়নিক দ্রব্য ও শস্য বহনের জন্য যথেষ্ট না থাকায় ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন শুরু হয়। জার্মানির একটি রাজ্য বাদে প্রায় সব রাজ্যেই রোববারে ট্রাক চলাচলের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করতে বাধ্য হতে হয়। অধ্যাপক ডেকার জানান, নৌপরিবহনের বিকল্প হিসেবে ট্রাক ও রেলপথ ব্যবহার অনেক বেশি ব্যয়বহুল—একটি বার্জের বদলে প্রায় ২০০টি ট্রাকের প্রয়োজন হতে পারে, যার ফলে উৎপাদনও কমে যাচ্ছে কারণ পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ইউরোপীয় অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বিশাল। ট্রায়োডস ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই গ্রীষ্মের কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৮০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ২৯৫ বিলিয়ন ডলার) ছুঁতে পারে, যা মোট জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান। ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্স সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—দেশটির প্রবৃদ্ধি প্রায় ১.৪ শতাংশ পয়েন্ট কমে অর্থনীতি সংকোচনের দিকে যেতে পারে। এরপরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইতালি ও স্পেন, এবং নেদারল্যান্ডসের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ০.৮ শতাংশ ধাক্কা লাগতে পারে। ট্রায়োডস ব্যাংকের প্রতিবেদনের সহলেখক অর্থনীতিবিদ আর্নস্ট হবমা জানান, পণ্য পরিবহন খাত এই অর্থনৈতিক ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ। ছোট জলপথগুলো ইতিমধ্যে পানির অভাবে নৌচলাচলের অযোগ্য হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটেছে। নদীর ধারে অবস্থিত এবং সরাসরি সেখান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খলের নিচের দিকে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রভাবিত হচ্ছে। নদীর পানি ফসলের সেচের জন্যও অপরিহার্য, ফলে খরার কারণে ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। হবমা বলেন, চরম তাপ ও খরার মধ্যে ফলন কমবে এটা নিশ্চিত, যা ভবিষ্যতেও কম ফলন এবং সম্ভবত খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে জিডিপিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপীয় শস্য সংস্থা কোসেরাল (Coceral)-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুন মাসের তাপপ্রবাহেই প্রায় ৯০ লাখ টন শস্য নষ্ট হয়ে গেছে, যার ফলে কৃষকদের প্রায় ২ বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক হিসাবে উঠে এসেছে। তীব্র গরমে কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে, বিশেষত যারা বাইরে কাজ করেন, যেমন নির্মাণ শ্রমিকরা। হবমা বলেন, তাদের বেশি বিরতি নিতে হচ্ছে এবং কাজের সময় পরিবর্তন করতে হচ্ছে, ফলে পরিকল্পিত সব কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ট্রায়োডস ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপজনিত কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা হ্রাসই অর্থনৈতিক ক্ষতির সবচেয়ে বড় কারণ, যদিও এর সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। হবমার ভাষায়, জলবায়ু-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাহীন অফিসগুলোতে অতিরিক্ত গরমে মানুষের মানসিক কর্মক্ষমতা কমে যায়। তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। দানিউব নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় হাঙ্গেরির পাক্স (Paks) পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করতে হয়েছে, কারণ চুল্লি শীতল রাখতে এই নদীর পানিই প্রধান উৎস। রোমানিয়ায় নৌবাহিনী পাথর সরিয়ে দেশের একমাত্র সচল পারমাণবিক চুল্লির দিকে পানি প্রবাহিত করতে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ চালায়, তবে পরে সেই কেন্দ্রটিও বন্ধ করে দিতে হয়। ফ্রান্সে, যেখানে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ পারমাণবিক শক্তি থেকে আসে, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বেড়ে যাওয়া জেলিফিশের ব্যাপক আধিক্যের কারণে বেশ কয়েকটি চুল্লি বন্ধ করে দিতে হয়। হবমা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের দাম বেড়ে গিয়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে আরও ক্ষতি হচ্ছে। পূর্ব ইউরোপে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়াকে তিনি “দ্বিমুখী আঘাত” বলে আখ্যায়িত করেন, এবং বলেন চরম জলবায়ু পরিস্থিতি সহনশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন জরুরি—ঘরবাড়ি অন্তরক (ইনসুলেটেড) করার মতো পদক্ষেপ জ্বালানি চাহিদা কমিয়ে জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। অধ্যাপক ডেকার জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষতির পরিমাণ প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাচ্ছে, কারণ বিকল্প হিসেবে গ্যাস ও কয়লা ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ইরানের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তেল সরবরাহে ইতিমধ্যে চাপ সৃষ্টি করেছে, এবং অধ্যাপক ডেকারের মতে তার সঙ্গে ইউরোপের এই তাপপ্রবাহ যুক্ত হয়ে দাম আরও বাড়িয়ে দেবে। এই খরার কারণে মহাদেশজুড়ে নদী-ক্রুজ ভ্রমণ বাতিল বা ব্যাহত হওয়ায় পর্যটন খাতেও ক্ষতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে তিনি জানান। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ব্যাপক খরা ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল সৃষ্টিতেও ভূমিকা রেখেছে, এবং সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তাপপ্রবাহের ঝুঁকি অব্যাহত থাকার আশঙ্কাসহ। ইউরোপীয় খরা পর্যবেক্ষণ সংস্থা (European Drought Observatory)-র তথ্যমতে, ইইউ এবং যুক্তরাজ্যের প্রায় অর্ধেক এলাকা বর্তমানে কোনো না কোনো মাত্রায় খরার কবলে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুন মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করেই পাঁচটি দেশে এই গ্রীষ্মের তীব্র গরমের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ১০ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক রিচার্ড অ্যালান বলেন, ইউরোপের সাম্প্রতিক চরম তাপ ও খরা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ক্রমাগত উষ্ণায়ন ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানলকে আরও তীব্র করে তুলবে। তিনি আরও বলেন, এর পাশাপাশি বরফ গলা ও সমুদ্রের পানি উষ্ণ হয়ে সম্প্রসারিত হওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি থেকে সৃষ্ট বন্যার ঘটনাও বাড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)-র তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম হারে উষ্ণ হওয়া মহাদেশ। অধ্যাপক অ্যালানের মতে, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই নীতি ও অনুশীলন গ্রহণ করে দ্রুত জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন করে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর মাধ্যমেই কেবল পৃথিবীর উষ্ণায়নজনিত ক্রমবর্ধমান ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

[TheChamp-FB-Comments]
ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন বন্ধ ও প্রত্যাহারের আহ্বান চীনের এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মধ্যরাতে ককটেল বিস্ফোরণ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল আর্জেন্টিনা নেতানিয়াহুকে বিশ্বাস করেন? জবাবে ট্রাম্পের কৌশলী উত্তর যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলে বন্দুক হামলা, ৩ শিশুসহ নিহত ৫ পাকিস্তানের পাশে থাকার ঘোষণা দিলেন বিজেপি নেতা ‘বড় হয়ে ইহুদিদের গুলি করতে চাই’—ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ১০ বছরের ছেলের চিঠি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজ থেকে টানা ১০ দিনের ছুটি শুরু ছুটির দিনে যেসব এলাকায় টানা ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না দুর্গোৎসব শুরু, আজ মহাষষ্ঠী ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে হত্যার নেতৃত্বে ছিল জামায়াতের নেতাকর্মীরা, বাড়ি-হাসপাতালে দু’দফা মব হামলা বছরে ইসরায়েল থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকার পণ্য আসছে বাংলাদেশে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ: ৪০ দিন বাকি, সাধারণ পরিষদের রায়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ “তোমরা একা নও, এই দেশ তোমাদেরও”: দুর্গাপূজায় সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে শেখ হাসিনার বার্তা; সম্প্রীতির ডাক পাকিস্তানে ট্রেনে নারী পর্যটকের মোজা-অন্তর্বাস শুঁকছে পুলিশ: “স্বাভাবিক কিনা?”, উঠেছে প্রশ্ন দিল্লি’তে হল্লাঃ আন্দোলনে অংশ নেয়ায় ইমরান খান-কে ভারত ছাড়ার নোটিশ; আজ প্রতীকী অনশন কর্মসূচি আম আদমি পার্টি’র সারকাণ্ডে কৃষকের পেটে লাথিঃ অবৈধ বিএনপি সিন্ডিকেটের নগ্ন স্বেচ্ছাচারের প্রমাণপত্র সারাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের অবাধ চলাফেরায় আপত্তি না থাকলেও ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের চলাফেরায় উষ্মা বিপ্লবী পরিষদের নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফাঁদে বাংলাদেশ, সামনে দীর্ঘ সংকট অপেক্ষমান জ্বালানির ভর্তুকি কমানো—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাপ দিচ্ছে আইএমএফ