নিউজ ডেক্স
আরও খবর
ভারতীয় পেঁয়াজের সাথে প্রতিযোগিতায় ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দিশেহারা কৃষক, ক্ষোভে পেঁয়াজ ফেলে দিচ্ছেন রাস্তায়-ডোবায়
সংকটে বিপর্যস্ত সাভারের চামড়া শিল্পনগরী: পচছে চামড়া, রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা, উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে
ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা: এক বছরেই ১৪৫ কোটি ইউরোর বাজার হারাল বাংলাদেশ
৫ আগস্ট থেকে চলতি জুন: সংকট-অস্থিরতায় ৭ শিল্প এলাকায় ৪৫৭ কারখানার ৮৬% স্থায়ীভাবে বন্ধ
চিংড়ির নামে পাতে সিলিকা বিষ
শেয়ারবাজারে ঢালাও দরপতন, কমেছে লেনদেন
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা বেড়েছে ৪১ শতাংশ: পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, বেড়েছে অর্থপাচার
এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের দর বেড়ে ১২৩.৫৫ টাকাঃ দুই সপ্তাহে বেড়েছে ৭০ পয়সা, আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির নতুন শঙ্কা
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী ডলারের দর। দেশের কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে সোমবার আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে প্রতি ডলারের দাম উঠেছে ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সায়। মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনের ব্যবধানে এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডলারের দর বেড়েছে প্রায় ৭০ পয়সা। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ব্যবসায়িক গ্রুপ, বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোমবার দেশের কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা দরে এলসি নিষ্পত্তি করেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে ডলারের দর ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা দেখাচ্ছে, বাস্তব বাজারে লেনদেন হচ্ছে তার চেয়ে বেশি দামে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গত দুই থেকে তিন সপ্তাহেই ডলারের বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায় পাওয়া যেত, এখন একই পরিমাণ ডলার কিনতে ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা গুনতে হচ্ছে।
ডলারের এই মূল্যবৃদ্ধি বড় আমদানিকারকদের ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। একটি ব্যবসায়ী গ্রুপ জানিয়েছে, ২০ লাখ ডলারের একটি এলসি নিষ্পত্তিতে আগের তুলনায় তাদের প্রায় ১৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যমূল্যে যুক্ত হয়ে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আগ্রাসী ডলার কেনাকাটা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। তাঁর ভাষ্য, কোনো ব্যাংক যদি রেমিট্যান্স হাউজ থেকে বেশি দামে ডলার কেনে, তখন রেমিট্যান্স হাউজগুলো একই বা কাছাকাছি দরে অন্য ব্যাংকের কাছেও ডলার বিক্রি করতে চায়। এর ফলে পুরো বাজারেই উচ্চমূল্যের চাপ ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ডলার সংগ্রহ করলেও বাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়। কারণ রেমিট্যান্স হাউজ থেকে যে দামে ডলার কেনা হয়, এলসি নিষ্পত্তির সময় তার সঙ্গে লাভের মার্জিন যোগ করে বিক্রি করা হয়।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন, কিছু ব্যাংক বেশি দামে ডলার কিনছে এবং এর প্রভাব পুরো বাজারে পড়ছে। তাঁদের মতে, যেসব ব্যাংক বাজারে অস্বাভাবিক দর বাড়ানোর পেছনে ভূমিকা রাখছে, তাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ব্যাংকাররা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ২০২২ সালের শেষ দিকে কয়েকটি ব্যাংকের অতিরিক্ত দামে ডলার কেনার কারণে বাজার বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে পড়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সেই সময়ের ঝুঁকির কথাই নতুন করে সামনে আনছে।
জ্বালানি আমদানির চাপ
ডলারের বর্তমান চাপের পেছনে সরকারি জ্বালানি তেল আমদানিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যাংকাররা। তাঁদের মতে, আগের তুলনায় একই পরিমাণ জ্বালানি তেলের এলসি নিষ্পত্তিতে এখন বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। সেই সময়ে খোলা এলসিগুলোর পেমেন্ট এখন বেশি দামে নিষ্পত্তি করতে হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে ডলারের চাহিদায়।
একজন ব্যাংকার বলেন, সরকারের জ্বালানি আমদানির চাহিদা বর্তমানে বেশি, কিন্তু সেই তুলনায় ডলারের প্রবাহ বাড়েনি। ফলে বাজারে সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
কমেছে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়
ডলারের বাজারে চাপ বাড়ার আরেকটি কারণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমে যাওয়া। ব্যাংকাররা বলছেন, জুন মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়েছে। জুনের প্রথম ২৮ দিনে দেশে এসেছে আড়াই বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি রেমিট্যান্স। অথচ গত ছয় মাসে গড়ে প্রতি মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে।
রপ্তানি আয়েও দেখা গেছে নিম্নমুখী প্রবণতা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সদ্য বিদায়ী মে মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-এর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আগের বছরের মে মাসে এ আয় ছিল ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার।
সামনে বাড়তে পারে চাপ
ব্যাংকারদের মতে, সামনের মাসগুলোতে ডলারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু ব্যবসা সম্প্রসারণ শুরু হলে নতুন এলসি খোলার হার বাড়বে। তখন ডলারের চাহিদা আরও তীব্র হতে পারে।
চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবু বাজারে ডলারের চাহিদা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
সোমবার বিভিন্ন ব্যাংকের বিসি সেলিং রেট ছিল ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা।
বাজারদর ও ঘোষিত দরের ফারাক
আহসান এইচ মনসুর বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রবণতা হচ্ছে ডলারের দর ধরে রাখা। এটা ঠিক নয়। ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। বর্তমানে যে দামে রেমিট্যান্স কেনা হচ্ছে, সেটিই ডলারের প্রকৃত দাম। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি গড় হিসাব দেখিয়ে ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায় ধরে রেখেছে, যা বাস্তব বাজারের সঙ্গে প্রতিফলিত নয়।”
তিনি বলেন, “ইন্টারব্যাংক মার্কেট সচল করা জরুরি। তবে এখনো ইন্টারব্যাংক মার্কেট কার্যকরভাবে সচল করা যায়নি।”
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইন্টারব্যাংক লেনদেন খুবই সীমিত। কারণ অধিকাংশ ব্যাংক রেমিট্যান্স হাউজ থেকেই ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা দরে ডলার কিনছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ কর্মদিবসে ইন্টারব্যাংক মার্কেটে লেনদেন হয়েছে সাড়ে ৬৩ মিলিয়ন ডলার।
আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের যে দর দেখাচ্ছে, বাস্তবে বাজারে লেনদেন হচ্ছে তার চেয়ে বেশি দামে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেখানো দর বাজার পরিস্থিতিকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করছে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষিত দর ও প্রকৃত বাজারদরের এই ব্যবধান যতদিন থাকবে, ততদিন ডলারের বাজারে অস্বস্তি কাটবে না। বরং সরবরাহ বাড়ানো, ইন্টারব্যাংক বাজার সক্রিয় করা এবং মূল্য নির্ধারণে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদার করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।