নিউজ ডেক্স
আরও খবর
বাসের পর লঞ্চেও অরাজকতা: নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা নেই, যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো আদায়
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ: ইউরোপের চার দেশের সমর্থন
ফেসবুকে তারেক রহমানের সমালোচনামূলক ভিডিওতে ‘লাইক’ দেওয়ায় বরখাস্ত শিক্ষক!
কৃষকের ভর্তুকির সার পাচার হয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারে, বিনিময়ে ঢুকছে ইয়াবা-অস্ত্র
ভারতীয় ইলিশে দেশের বাজার সয়লাব, ১৯০ টাকার ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৮শ টাকায়!
বনশ্রীতে পথকুকুরদের খাবার দেওয়া তরুণীকে পেটালেন যুবদলের নেতাকর্মীরা
এনসিপির জ্যেষ্ঠ আহ্বায়কের ভেজাল ওষুধ কারখানায় তৈরি হতো যৌন উত্তেজক বড়ি!
২৮০ কোটি টাকার সড়ক এখন চষা ক্ষেত: ‘লীগ-সম্পৃক্ততায়’ বাতিল ঠিকাদারের কার্যাদেশ, কাজও বন্ধ এক বছর ধরে
রূপসা নদীর ওপর নির্মিত খানজাহান আলী সেতু পেরিয়ে উত্তরের সংযোগ সড়ক ধরে খুলনা মহানগরীতে প্রবেশ করতে হয়। সেতু থেকে কিছুটা এগোলেই অবশ্য বদলে যায় দৃশ্যপট। শুরুতে বিটুমিনের কার্পেটিং থাকলেও প্রায় ১০০ গজ যাওয়ার পরই থমকে দাঁড়াতে হয়। সড়কের মাঝখানের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ফুট অংশে বিটুমিন তো নেই-ই, ইটের চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যায় না। কাদামাটির ওপর দিয়ে ট্রাক চলাচল করায় জায়গাটি দেখে মনে হয় সদ্য চাষ করা কোনো ক্ষেত।
খুলনা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ শিপইয়ার্ড সড়কের রূপসা সেতু সংযোগ অংশের বর্তমান চিত্র এটি। রূপসা ও লবণচরা এলাকার শতাধিক স’মিল, চালকল, তুষ মিল, বালুর গোলা, এসআরবি-৬ সদরদপ্তর, নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ ঘাঁটি সোলাম, রিভারভিউ পার্কসহ মাথাভাঙা এলাকার লক্ষাধিক মানুষের চলাচলের অন্যতম পথ এই সড়ক।
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সড়কটি ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। এটি প্রশস্ত করার জন্য ২০১৩ সালে প্রকল্প গ্রহণ করেছিল খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)। কিন্তু ১৩ বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। মানুষের দুর্ভোগও কমেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকল্প গৃহীত হয়। কিন্তু ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিহিংসাবশত দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের কার্যাদেশ বাতিল করা হয় ‘আওয়ামী সম্পৃক্ততার’ অভিযোগে।
ঠিকাদার বাতিলসংক্রান্ত জটিলতায় গত এক বছর ধরে সড়কটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের একটি প্রতিবেদনে সড়কটির ৩.৭৭৮ কিলোমিটার অংশের কাজ ১০ মাস ধরে স্থবির থাকার কথা উঠে এসেছে।
গত মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সড়কটির আশপাশে অবস্থান করেন এ প্রতিবেদক। ওই সময় ‘চষা ক্ষেতের’ মতো কাদাময় অংশ, পানি জমে থাকা ‘পুকুর’ এবং অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত পার হয়ে লবণচরা যেতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও স্থানীয় লোকজন গর্তের মধ্যে ইটের টুকরো ফেলে সাময়িকভাবে ভরাটের চেষ্টা করেছেন। এতে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। ওই অংশ দিয়ে চলাচলের সময় যানবাহনগুলোকে হেলে-দুলে এগোতে হচ্ছে।
সড়ক পুনর্নির্মাণের জন্য বিভিন্ন স্থানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইট-পাথর ফেলেছিল। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে সেগুলো সরে যাওয়ায় একাধিক জায়গায় গর্ত তৈরি হয়। পরে গাড়ি চলাচলের কারণে সেই গর্তগুলো ক্রমেই বড় হয়েছে। এর মধ্যে বর্ষা শুরু হওয়ায় অনেক গর্ত পানিতে ডুবে ডোবার আকার নিয়েছে। পুরো সড়কে এমন ডোবার সংখ্যা গুনে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু, আবার কোথাও ডোবা ও গর্ত—এসব এড়িয়ে ৩.৭৭৮ কিলোমিটার সড়ক ইজিবাইকে পাড়ি দিতে এ প্রতিবেদকের সময় লেগেছে ২৯ মিনিট। দীর্ঘক্ষণ এমন ঝাঁকুনির পর কোমরের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে পড়ে।
রূপসার কাছে দাদা ম্যাচ মিল মসজিদের পাশে একটি চায়ের দোকানে এ প্রসঙ্গে কথা হলে চালকল শ্রমিক আজিবর রহমান বলেন, ‘একদিনেই মাজা ব্যতা? আর আমাগো পেততিক দিন আওন-যাওন লাগে। আইতে-যাইতে জান বাইরাই যায়।’
সড়কের কিছু অংশ দিয়ে ইজিবাইক চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় এ প্রতিবেদক সেতুর নিচ দিয়ে অন্য পাশে যান। সেখানে দেখা যায় আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি। সড়কের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ফুটজুড়ে তৈরি হয়েছে বিশাল গর্ত। দূর থেকে সেটিকে পুকুর বলেই মনে হয়। লাঠি দিয়ে গভীরতা মেপে দেখা যায়, গর্তটির গভীরতা প্রায় ১৭ ইঞ্চি।
কাজ শেষ হয়নি, বেড়েছে খরচ
সড়কটি চার লেনে প্রশস্ত করে পুনর্নির্মাণের জন্য ২০১৩ সালের ৭ই মে ৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। দীর্ঘ নয় বছর পর ২০২২ সালের ১২ই জানুয়ারি কেডিএ কাজের কার্যাদেশ দেয় আতাউর রহমান লিমিটেড অ্যান্ড মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডকে (জয়েন্ট ভেঞ্চার)। ওই বছরের ২০শে জানুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণকাজ শুরু করে। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল।
কিন্তু ২০২৫ সালের ৭ই আগস্ট ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয় ‘আওয়ামী সম্পৃক্ততার’ অভিযোগে। এরপর থেকেই সড়কটির নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।
সড়কটির কাজ শেষ না হলেও প্রকল্পের ব্যয় একাধিক দফায় বেড়েছে। ২০২০ সালে প্রথমবার প্রকল্প সংশোধনের সময় ব্যয় বাড়িয়ে ২৫৯ কোটি টাকা করা হয়। পরে ২০২৬ সালে আবার সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় ২৮০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। জুনে একনেক সভায় প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রতার কারণ অনুসন্ধানে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৯৯ কোটি টাকার প্রাথমিক প্রকল্প ব্যয় একাধিক সংশোধনের পর ২৫৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল।
১৩ বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার কারণ খুঁজে বের করতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গত ৩১শে আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ১৪ জনকে দায়ী করে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
জনতার প্রতিবাদেও থামেনি দুর্ভোগ
শিপইয়ার্ড সড়ক মেরামতের দাবিতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী গত এক যুগে অন্তত আট দফায় মানববন্ধন করেছেন। মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পাশাপাশি খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয় (কেডিএ) ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা। কিন্তু এসব কর্মসূচির পরও সড়কটির দুরবস্থার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
সড়কটি পরিদর্শনের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ শিপইয়ার্ড সড়কের দুই পাশে রয়েছে ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একসময় আশপাশে ২৭টি চালকল এবং ২৫০টি কাঠ চেরাইকল ছিল। বান্দাবাজার এলাকায় ছিল ৪৫০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সড়কের নাজুক অবস্থার কারণে তাঁদের ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। পণ্য পরিবহনে ভোগান্তিসহ নানা কারণে গত এক যুগে ২১টি চালকল বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের বছরে ১০০ কোটি টাকারও বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে। কাঠ ব্যবসায়ীদের বিক্রিও অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধেক চেরাইকল বন্ধ হয়ে গেছে।
কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কাজী সেলিম আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ক্ষতি বলে বোঝানো যাবে না। বিক্রি কমে গেছে। অর্ধেকের বেশি ব্যবসায়ী এখন নিঃস্ব।’
নতুন ঠিকাদার নিয়োগের অপেক্ষা
কেডিএ চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা বলেন, রূপসা সেতুর অ্যাপ্রোচ অংশ কংক্রিট দিয়ে নির্মাণ করতে হবে। এ কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার আশা, আগামী একনেক বৈঠকে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন পাবে। এরপর দ্রুত নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা সম্ভব হবে এবং আগামী বছরের মধ্যে সড়কটির কাজ শেষ করা যাবে।
প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ২০২৬ সালের ৯ই জুন একনেক সভায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটি প্রায় ১৩ বছরেও বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণ খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।
এদিকে গত ছয় মাসে দুই দফায় জাতীয় সংসদে সড়কটির দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। তবে এরপরও নির্মাণকাজে দৃশ্যমান গতি আসেনি।
সংসদ সদস্য হেলাল বলেন, ‘ওই সড়ক দিয়ে আমাকে বাড়ি ফিরতে হয়। মানুষের কষ্ট আমি বুঝি। অন্যদের সেটি বোঝাতে পারছি না।’
সূত্র: দৈনিক সমকাল

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
[TheChamp-FB-Comments]