হামের প্রকোপ কমাতে দেশব্যাপী সরকারের টিকাদানের পদক্ষেপ – বর্ণমালা টেলিভিশন

হামের প্রকোপ কমাতে দেশব্যাপী সরকারের টিকাদানের পদক্ষেপ

আহসান হাবিব বরুন
আপডেটঃ ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ | ১০:০৮ 2 ভিউ
বাংলাদেশ আজ আবারও একটি পুরোনো কিন্তু ভয়াবহ সংক্রামক রোগের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—হাম। একসময় কার্যকর টিকাদান কর্মসূচির কারণে প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা এই রোগটি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার শক্তি, দুর্বলতা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ফাঁকফোকর—সবকিছুই যেন একসঙ্গে উন্মোচিত হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতিতে। এমন এক সময়েই সরকার মে মাসের ৩ তারিখের পরিবর্তে ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ‘বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে এর বাস্তবায়ন ঘিরে যে সংকট—বিশেষ করে সিরিঞ্জের ঘাটতি—তা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীরতর কাঠামোগত দুর্বলতার কথাই সামনে এনে দেয়। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে—যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি করে তুলেছে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদানে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, সেটিই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশই ২ বছরের নিচে, এমনকি ৯ মাসের আগের শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ৬ মাস বয়স থেকেই টিকাদান শুরু করার সরকারি সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি পরিবর্তন। সরকারি তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ডোজ হামের টিকা মজুদ রয়েছে—যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একই সঙ্গে যে তথ্যটি উদ্বেগজনক, তা হলো এই বিপুল টিকার তুলনায় ‘মিক্সিং সিরিঞ্জ’ রয়েছে মাত্র ৪৫ হাজার, যেখানে প্রয়োজন প্রায় ২০ লাখ। অর্থাৎ টিকা থাকা সত্ত্বেও তা প্রয়োগের মৌলিক উপকরণেই ঘাটতি—এ এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। এটি নিছক একটি লজিস্টিক সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতার অভাবের প্রতিফলন। আর এখানেই উঠে আসে আরও গভীর ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন—এই অপব্যবস্থাপনার পেছনে দায়ী কে? বাস্তবতা হলো, এটি কোনো একক ঘটনার ফল নয়। বরং দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কারণে যে জবাবদিহিহীন প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তারই পরিণতি আজকের এই সংকট। যখন একটি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা থাকে না, সমালোচনার সুযোগ সংকুচিত হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য নষ্ট হয়—তখন সেই ব্যবস্থার ভেতরে দুর্বলতা জমতে থাকে, যা একসময় বড় ধরনের বিপর্যয়ে রূপ নেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বহীনতা। টিকা ক্রয়ের মতো একটি সংবেদনশীল ও সময়সাপেক্ষ বিষয়ে নীতিগত দ্বিধা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সময়মতো টিকা ও সিরিঞ্জ সংগ্রহে ব্যর্থতা, আগাম পরিকল্পনার ঘাটতি এবং বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নে দুর্বলতা—সব মিলিয়ে একটি নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যার ফল এখন পুরো জাতিকে ভোগ করতে হচ্ছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনিক স্তরে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনার অভিযোগও উপেক্ষা করার মতো নয়। জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে যে কোনো সফল কর্মসূচিও হুমকির মুখে পড়ে। টিকা থাকা সত্ত্বেও সিরিঞ্জের অভাব—এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতীক। তবে এই সংকটের মাঝেও ইতিবাচক দিক রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইপিআই কর্মকর্তারা সীমিত সম্পদ নিয়েই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় টিকাদান শুরু হয়েছে, এবং নতুন করে সিরিঞ্জ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই তৎপরতা যেন কেবল আগুন নেভানোর মতো না হয়ে পড়ে—বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি একসময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। সেই সাফল্য ধরে রাখতে হলে এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনা এবং সংস্কার। বছরে একবার সমন্বিতভাবে টিকা ও সরঞ্জাম ক্রয়, জরুরি মজুদ গড়ে তোলা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি—এই পদক্ষেপগুলো এখন সময়ের দাবি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। টিকা নিয়ে গুজব, ভ্রান্ত ধারণা বা অবহেলা—এসব দূর না করতে পারলে কোনো কর্মসূচিই সফল হবে না। একটি শিশুর টিকা না নেওয়া মানে শুধু তার নিজের ঝুঁকি নয়; বরং পুরো সমাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করা। হামের বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু সরকারের একার নয়; এটি পুরো জাতির সম্মিলিত দায়িত্ব। তাই এই টিকাদান কর্মসূচিকে সফল করতে হলে—সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। হাম প্রতিরোধযোগ্য—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। এখন প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সম্মিলিত সচেতনতা। পরিশেষে বলা যায়, হামের বিরুদ্ধে এই লড়াই আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে—একটি কার্যকর ব্যবস্থাও যদি দীর্ঘদিন অবহেলা, স্বৈরতান্ত্রিক সংস্কৃতি, দায়িত্বহীনতা এবং দুর্নীতির শিকার হয়, তবে তা কত দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে। এখন সময় এসেছে সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এবং একটি শক্তিশালী, মানবিক ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার। কারণ, একটি শিশুর সুস্থতা মানেই একটি জাতির ভবিষ্যৎ। সুতরাং যে কোনো মূল্যে টিকাদান কর্মসূচিকে সফল করে তুলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা। ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
মাঝে মাঝে এমনটা হতেই পারে— হারের পর মিরাজ হরমুজ প্রণালি খোলার ঘোষণায় কমল তেলের দাম হামের প্রকোপ কমাতে দেশব্যাপী সরকারের টিকাদানের পদক্ষেপ ১০ দিন হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের কাছে থাকা সব ইউরেনিয়াম পাবে যুক্তরাষ্ট্র, দাবি ট্রাম্পের ‘জনপ্রিয়তায়’ আতিফ আসলামকেও ছাড়িয়ে যাওয়া কে এই তালহা আনজুম রাশেদ প্রধান লিমিট ক্রস করে বক্তব্য দিচ্ছে: রাশেদ খাঁন ‘শেখ হাসিনাকে ফেরতের বিষয়টি বিবেচনা করছে ভারত’ পঁচিশে সমুদ্রপথে ৯০০ রোহিঙ্গার প্রাণহানি প্রবাসীদের মাতাতে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রীতম-জেফার-পূজা-তমা ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ ১৬ জনের মনোনয়ন বাতিল জামিন পেলেন চিন্ময় কৃষ্ণ ফের ইরানে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল! দেশের রাজস্ব আদায় বাড়াতে বিদ্যমান কৌশল ব্যবহারের পরামর্শ আইএমএফের বাগেরহাটে কুমিরের মুখে কুকুর ছুঁড়ে দেওয়ার প্রমাণ মেলেনি: তদন্ত কমিটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য তেল পাম্পে জরুরি লাইন রাখার নির্দেশ চুক্তিতে রাজি না হলে আবারও ইরানে হামলা করবে যুক্তরাষ্ট্র লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে স্পষ্ট বার্তা যুক্তরাজ্যের মাউশির মহাপরিচালক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ হরমুজে পা রাখলেই সব যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের