নিউজ ডেক্স
আরও খবর
১৭ বছরের রুদ্ধশ্বাস বন্দিদশা পেরিয়ে ফিরল শহীদ জিয়ার মুক্ত স্মরণ
জিয়াউর রহমানের সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করলো ভারত
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ
স্বাবলম্বী সমাজ গড়তে সবার অংশগ্রহণ চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী দৈনিক ১৮-১৯ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছেন: গৃহায়নমন্ত্রী
ফুটপাত থেকে আইসিইউ, পরিচয়হীন এক নারীর বেঁচে থাকার লড়াই
বিএনপিতে ত্যাগীদের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে, মূল্যায়নের অভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় হাইব্রিডরা
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে ছিল। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দলটিকে পার করতে হয়েছে অসংখ্য প্রতিকূলতা।
মামলা, হামলা, কারাবরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন লাখ লাখ নেতাকর্মী। তবে দীর্ঘ এই আন্দোলন-সংগ্রামের পর বর্তমান সময়ে এসে দলের অভ্যন্তরে সবচেয়ে বড় যে ক্ষোভ এবং মনস্তাত্ত্বিক সংকটটি দেখা দিয়েছে, তা হলো ‘ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন’ এবং দলে নব্য সুবিধাবাদী বা ‘দুধের মাছিদের’ ক্রমবর্ধমান প্রভাব।
রাজনীতি বিশ্লেষক এবং দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এই সংকটের বহুমাত্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত একই চিত্র সর্বত্র।
কমিটি গঠন প্রক্রিয়াতেও ত্যাগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সাবেক প্রেসিডেন্ট ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হয়েছে।
কিন্তু ১৭ বছর পর বিএনপি ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানে থেকে শাহাদাৎ বার্ষিকী পালন করলেও এসব কর্মসূচি থেকে ত্যাগীদের দূরে রেখে হাইব্রিডরাই সম্মুখসারিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক ১০ নম্বর ওয়ার্ডের (বর্তমানে ১৪ নম্বর ওয়ার্ড) প্রতিষ্ঠাতা ছাত্রদলের সভাপতি আলী আরশাদ মামুন বাংলানিউজকে বলেন, আবুল খায়ের ভূঁইয়া বৃহত্তর মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। তার নেতৃত্বে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। এরপর বিএনপির ৯৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি এবং থানা বিএনপির বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছি। কখনও পিছু হটিনি। শুধু তাই নয়, ওয়ান-ইলেভেনের সময় খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে জিয়াউর রহমানের সমাধির সামনে থেকে আমাকে আটক করে পুলিশ। দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেছি। কিন্তু দল আমাদের মূল্যায়ন করেনি। বরং যারা আজ দল নিয়ে লাফালাফি করছেন, তাদের অধিকাংশই হাইব্রিড। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৭ বছর আপস করে চলেছে।
কাফরুল থানা বিএনপির এই যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, দীর্ঘদিন দলের পদও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মিল্টন সাহেব নির্বাচন করার আগে আমাদের বেশ কয়েকজনকে পদ ফিরিয়ে আনা হয়। নামেই পদ রয়েছে, কোনো কর্মসূচিতে ঠিকমতো বলা হয় না। হাইব্রিডদের বিচরণ বেড়েছে, ত্যাগীরা দলের ভেতরে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
তিনি বলেন, ৩০ মে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে যাব। সেখানে ম্যাডামের জন্যও দোয়া করে আসবো। আমি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনীতি করি। যতদিন বেঁচে থাকব, সেটা করে যাব। ১৭ বছর জেল-জুলুম খেটেছি। নিজের ব্যবসা শেষ হয়ে গেছে। পরিবারকেও অনেক কষ্ট দিয়েছি। তারপরও দল থেকে মূল্যায়ন পাইনি। এটা অনেক কষ্টের।
বিএনপির তৃণমূলের একটি বড় অংশের অভিযোগ, বিগত বছরগুলোতে যারা রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন, বারবার জেল খেটেছেন এবং যাদের পরিবার ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে, দলের পদায়ন বা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাদের অনেকেই পিছিয়ে পড়ছেন। বিপরীতে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় নিষ্ক্রিয় থাকা, সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বা দীর্ঘ সময় দলের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা অনেক ‘হাইব্রিড’ ও ব্যবসায়ী নেতা এখন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো সহজেই পেয়ে যাচ্ছেন।
কথা হয় কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, বিগত সময়ে আন্দোলন করতে গিয়ে ১৩টি মামলা খেয়েছি, প্রায় দুই বছর জেল খেটেছি। ৫ আগস্টের পর চিত্র পাল্টে গেছে। দলে নতুন মুখের আগমন ঘটেছে। নতুন করে স্বেচ্ছাসেবক দল কাফরুল থানা কমিটির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও আমাদের সেখানে স্থান হয়নি। নতুন কমিটিতে এমন কিছু নাম এসেছে, তারা বিএনপি কখনও করেছে কি না, আমার জানা নেই। শুধু আমি নই, দলের চরম খারাপ সময়ে যারা পরিবার-পরিজন ছেড়ে দলকে আঁকড়ে ধরে ছিল, তাদের মূল্যায়ন না হলে আগামীতে নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দেবে বলে তিনি মনে করেন।
ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবেক যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান। ৩০০টিরও বেশি মামলা নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, অথচ দল তাকে মূল্যায়ন করেনি। শুধু তাই নয়, তার সঙ্গে যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, তাদেরও মূল্যায়ন হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রায় অর্ধশতাধিক মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ১৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু হানিফ।
তিনি বলেন, ১৫ বছর ছাত্রদলের ওয়ার্ড সভাপতি ছিলাম। স্বেচ্ছাসেবক দলের থানার নেতৃত্বও দিয়েছি। দীর্ঘ সময় জেল খেটেছি। ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ছিলাম, সেই পদটিও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু এই ১৭ বছর নয়, এর আগেও দেখেছি বিরোধী দলের রাজনীতিতে বরাবরই গুটিকয়েক লোক ছাড়া কাউকে দেখা যায়নি। আজ যারা ভিড় করছেন, দলের খারাপ সময় এলে তারা হারিয়ে যাবেন।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে গত ১৭ বছরে শতাধিক মামলার আসামি হয়েছেন, দুই বছর কারাভোগ করেছেন। থানা ছাত্রদল ও যুবদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। শুধু তাই নয়, বিগত সময়ে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে কাউন্সিল নির্বাচন করেছেন। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্যও ছিলেন আহসান উল্লাহ চৌধুরী হাসান।
বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ওয়ার্ড, থানা ও মহানগর-সব পর্যায়েই হাইব্রিডদের জয়জয়কার। তাদের ভিড়ে ত্যাগীরা হারিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় পর দল শক্ত অবস্থানে এসেছে। ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, আন্দোলন করতে লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। আর আজ দুধের মাছিদের ভিড়ে ত্যাগীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। এটা ভালো লক্ষণ নয়। দুধের মাছিরা সময় খারাপ হলে কেটে পড়বে। শুধু তাই নয়, বিগত সময়ে যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে চলেছে, আজ তারাই দলের সম্মুখসারিতে জায়গা করে নিচ্ছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তৃণমূলের এক জেলা পর্যায়ের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যখন আন্দোলনের ডাক আসে, তখন পুলিশ আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে। আর যখন সুসময় বা কমিটি গঠনের কথা আসে, তখন ঢাকা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা সাহেবরা পদ পেয়ে যান। এই সংস্কৃতি দলকে ভেতরে ভেতরে দুর্বল করছে।
এদিকে একটি রাজনৈতিক দল যখন দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকে, তখন তার সাংগঠনিক কাঠামো সচল রাখতে বিশাল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। আইনি লড়াই পরিচালনা, কারাবন্দি নেতাকর্মীদের সহায়তা এবং দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য দলগুলোকে অনেক সময়ই আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সুযোগটিই নেয় সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। তারা সরাসরি রাজপথের আন্দোলনে না থাকলেও নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা বা ভবিষ্যৎ ক্ষমতার অংশীদার হতে দলে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ করে। ফলে দলের ভেতরের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ত্যাগীদের বাদ দিয়ে এই অর্থকড়িওয়ালা দুধের মাছিদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে দেয়।
তাদের মতে, দলের ভেতরের একটি বলয় বা সিন্ডিকেট নিজেদের আখের গোছাতে এবং নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ত্যাগী ও স্পষ্টভাষী নেতাদের কোণঠাসা করে রাখে। তারা শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে সুবিধাবাদীদেরই যোগ্য ও অনুগত হিসেবে উপস্থাপন করে, যা ত্যাগীদের অবমূল্যায়নকে আরও ত্বরান্বিত করে।
প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ত্যাগী বনাম নব্য দ্বন্দ্বের কারণে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করছে, যা দলের চেইন অব কমান্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নব্য অনুপ্রবেশকারীদের কারণে দলের মূল আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে, কারণ এই সুবিধাবাদীদের কাছে দলের নীতি বা আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থই প্রধান।
তবে একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরতান্ত্রিক বা প্রতিকূল পরিবেশের পর যেকোনো বড় দলেই এ ধরনের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর ও সংকট দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে বিএনপির মতো একটি জনভিত্তিসম্পন্ন দলের জন্য এর পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। রাজনীতিতে বাস্তবতার খাতিরে নতুন নেতৃত্ব বা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে দলে টানা জরুরি। কিন্তু তা যদি
দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও জীবন উৎসর্গ করা ত্যাগীদের লাঞ্ছিত বা অবমূল্যায়িত করে হয়, তবে দলের মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ মাঠের কর্মী হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে বিএনপি।
আগামী দিনে রাজপথের লড়াইয়ে বিএনপিকে অবশ্যই এদের দাপট কমিয়ে ত্যাগ ও মেধার সমন্বয়ে দল পুনর্গঠন করতে হবে। অন্যথায়, ক্ষমতার সুসময়ে এই সুবিধাবাদীরা যেভাবে দলে ভিড়েছে, সামান্য দুঃসময়ে বা চাপের মুখে তারা সবার আগে দল ত্যাগ করবে, যা অতীতেও বারবার প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে বিএনপিতে যদি তৃণমূলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীরা প্রকৃত অর্থে মূল্যায়িত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, তবে দলের ভেতর বা বাইরে কোনো পক্ষই ক্ষোভকে পুঁজি করে কৃত্রিম মব তৈরি করার বা দলকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ পাবে না বলেও মনে করেন তারা।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।