আয়নাবাজি: উধাও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রমজান, কারাগারে নিরপরাধ দিনমজুর সোনা মিয়া – বর্ণমালা টেলিভিশন

আয়নাবাজি: উধাও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রমজান, কারাগারে নিরপরাধ দিনমজুর সোনা মিয়া

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ১৪ August, ২০২৬ | ৫:১৫ 61 ভিউ
কক্সবাজারে মাদক মামলার তদন্ত ও আসামি শনাক্তকরণে ভয়াবহ গাফিলতির অভিযোগ সামনে এসেছে। ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় প্রকৃত আসামি নিজের পরিচয় গোপন করে পরিচিত এক ব্যক্তির নাম-ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন। সেই আসামি পরে জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যান। অথচ তার দেওয়া পরিচয়েই আদালতে মামলা চলে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয় নিরপরাধ এক দিনমজুরের। পুলিশের সাম্প্রতিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই ‘সোনা মিয়া’ আসলে মো. রমজান। আর বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়া এই মামলার আসামিই নন। ঘটনাটি যেন বাস্তবের ‘আয়নাবাজি’—একজনের অপরাধের দায় গিয়ে পড়েছে আরেকজনের ঘাড়ে। ২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার সদর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’ নামের একজনকে দেখানো হয়। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। তারপরও মামলার আসামির তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়েনি। পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ছিলেন মো. রমজান। তিনি নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়ে অন্য একজনের জন্মনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করেছিলেন। তদন্তে জানা যায়, রমজান ও প্রকৃত সোনা মিয়া একসময় রোহিঙ্গা শিবিরে এবং পরে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস করতেন। সেই সুবাদে রমজান সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের তথ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। পুলিশের প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই তথ্য ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন। মামলার পরবর্তী সময়ে তিনি জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যান। প্রকৃত রমজান থেকে যান আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিপরীতে তার দেওয়া পরিচয় বহনকারী সোনা মিয়ার নামেই চলতে থাকে মামলা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালত এই মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মামলার নথিতে থাকা ‘সোনা মিয়া’ও। পলাতক সোনা মিয়ার বিরুদ্ধে জারি হয় সাজা পরোয়ানা। এরপর র‌্যাব-১৫ রামু থেকে সোনা মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পর ওই ব্যক্তি আদালতে আবেদন করে জানান—তিনি এই মামলার আসামি নন। জীবনে কখনো ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হননি, এমনকি এই মামলায়ও তাকে কখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। গত ৫ জুলাই কক্সবাজার সদর থানা-পুলিশ আদালতে যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়, তাতে দুই ব্যক্তির পরিচয় ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে স্পষ্ট অমিল পাওয়া যায়। ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি, অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে রমজানের বয়স তখন ছিল ২৫ বছর। তার মায়ের নাম সোনারা বেগম, স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। দুই গাল ও ডান বাহুতে ক্ষতচিহ্ন ছিল। অন্যদিকে ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়ার বয়স ৩৪ বছর। তার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন, স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি। তার শরীরে শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহু, পেটের বাঁ পাশ ও পিঠের মাঝখানে তিল থাকার তথ্য রয়েছে। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মো. আলী জেলা কারাগারে গিয়ে দুই সময়ের বন্দীর সংরক্ষিত ছবি, শনাক্তকরণ চিহ্ন ও আঙুলের ছাপ যাচাই করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কোনো মিল পাওয়া যায়নি। একই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আরেক আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ জানতে পারে, তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়াকে চেনেন না। তদন্তে আরও উঠে আসে, বর্তমান সোনা মিয়া আগে কখনো গ্রেপ্তার হননি কিংবা কারাগারে বন্দী ছিলেন না। সব মিলিয়ে পুলিশের তদন্তে নিশ্চিত করা হয়েছে—কারাগারে থাকা সোনা মিয়া এই মামলার আসামি নন; মামলার প্রকৃত আসামি রমজান। ঘটনাটি সামনে আসার পর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় আসামির পরিচয় যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মন্নানের মতে, তদন্ত থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ছিল। অন্য ব্যক্তির জন্মনিবন্ধনের তথ্য যাচাই না করেই অভিযোগপত্র দেওয়ার কারণেই প্রকৃত আসামি রমজান পালিয়ে যেতে পেরেছেন এবং নিরপরাধ সোনা মিয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে কারাগারে বন্দী হয়েছেন। তিনি ঘটনাটির তদন্ত দাবি করেছেন। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া প্রকৃত আসামি নন এবং প্রকৃত আসামি রমজান—এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনটির ওপর আদালতের কোনো আদেশ এখনো পাওয়া যায়নি। এদিকে কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, তার স্বামী খেটে খাওয়া মানুষ এবং কখনো কোনো অপরাধ করেননি। রমজানের সঙ্গে তার পরিচয়ের কারণেই আজ তার স্বামীকে রমজানের অপরাধের খেসারত দিতে হচ্ছে। একজনের পরিচয় চুরি করে আরেকজন পালিয়ে গেলেন। সেই পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে মামলা হলো, সাজা হলো মৃত্যুদণ্ড। আর শেষ পর্যন্ত যার নাম ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই নিরপরাধ মানুষটিই এখন কারাগারে। এই ঘটনায় শুধু একজন নিরপরাধ মানুষের জীবনে নেমে আসা বিপর্যয়ই নয়, প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের মান, আসামি শনাক্তকরণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার বিতর্কে পদত্যাগ করলেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট ম্যাককেনা অতিরিক্ত যৌন আবেদনময় দৃশ্যে অভিনয় করতে চান না পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কারখানা বন্ধের ইঙ্গিত মালিকদের ইসলামী বক্তা ও জামায়াতের সাংসদ আমির হামজার নারীঘটিত অডিও-ভিডিও পাওয়ার দাবি রাশেদ খাঁনের পোশাক শ্রমিক নির্যাতন আড়াল করতে পারেনি সরকার, পুলিশি নির্যাতন ও রাজনীতিকরণে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ হামলা বন্ধে সৌদি’র ১ বিলিয়ন ডলার প্রস্তাব; জবাবে হুথিদের ৫১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ ও ইয়েমেনের শাসনভার দাবি শ্রমিক অসন্তোষে স্থবির দেশের প্রধান রপ্তানি খাত: বড় সংকটের মুখে তৈরি পোশাকশিল্প বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা ও দাফনে জামায়াত-শিবিরের বাধার ঘটনার প্রতিবাদে শৈলকুপায় মানববন্ধন ইউনূস আমলে হামের টিকার অনিয়ম তদন্তে কমিশন গঠন মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের জের ধরে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ ৫ই নভেম্বর, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এই অঞ্চলের একাধিক পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করছেন। একপর্যায়ে পুলিশের রক্তচক্ষু ও বাধা উপেক্ষা করে হাজারো শ্রমিক রাজপথে নেমে এলে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। সকালে সাভার ও আশুলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে শ্রমিকেরা যথারীতি উপস্থিত হলেও তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে কর্মবিরতির ডাক দেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সার্বিক নিরাপত্তাশঙ্কা দেখা দিলে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের জামগড়া, নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুর এলাকার একাধিক পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। কাঠগড়া এলাকার একটি বিশিষ্ট শিল্পগ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় এই অঞ্চলের অধিকাংশ কারখানাতেই ইতিমধ্যে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু কারখানায় শ্রমিকেরা ভেতরে থাকলেও তারা উৎপাদন কাজ বন্ধ রেখেছেন। সকাল ১০টার পর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পরিস্থিতি মোড় নেয় নতুন দিকে। সেখানকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা এক জোট হয়ে সড়কে অবস্থান নেন এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে বাধা দিলে তৈরি হয় মুখোমুখি অবস্থান, যা এলাকায় তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করে। পরে শ্রমিকেরা পুলিশের সে বাধা তোয়াক্কা না করেই একযোগে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং জামগড়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল, পদ্মার মোড় এবং আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের বিভিন্ন কৌশলগত ও সংবেদনশীল পয়েন্টে পুলিশ ছাড়াও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিক্ষোভরত শ্রমিকদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের কাছাকাছি অবস্থানে থেকে সতর্ক টহল দিচ্ছেন। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য পুরো শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ট্রাম্প শ্রমিকদের কারখানায় ফিরে আসার আহ্বান শ্রমমন্ত্রীর খুলনা অঞ্চলে চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্য সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে ফের সড়ক অবরোধ শেকৃবি শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করবে সংসদীয় ককাস যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ ইরান যুদ্ধ: জেডি ভ্যান্স ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ থেকে ডিজিই-পে বিচ্ছিন্ন করল বাংলাদেশ ব্যাংক তরঙ্গ নবায়ন ব্যয় যৌক্তিক করার আহ্বান মোবাইল অপারেটরদের এশিয়া ফাউন্ডেশনের প্রকল্পে ৯০ হাজার উদ্যোক্তাকে সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ