আয়নাবাজি: উধাও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রমজান, কারাগারে নিরপরাধ দিনমজুর সোনা মিয়া – বর্ণমালা টেলিভিশন

নিউজ ডেক্স
আপডেটঃ ১৪ আগস্ট, ২০২৬
৫:১৫ পূর্বাহ্ণ
2 ভিউ

আয়নাবাজি: উধাও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রমজান, কারাগারে নিরপরাধ দিনমজুর সোনা মিয়া

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ১৪ আগস্ট, ২০২৬ | ৫:১৫ 2 ভিউ
কক্সবাজারে মাদক মামলার তদন্ত ও আসামি শনাক্তকরণে ভয়াবহ গাফিলতির অভিযোগ সামনে এসেছে। ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় প্রকৃত আসামি নিজের পরিচয় গোপন করে পরিচিত এক ব্যক্তির নাম-ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন। সেই আসামি পরে জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যান। অথচ তার দেওয়া পরিচয়েই আদালতে মামলা চলে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয় নিরপরাধ এক দিনমজুরের। পুলিশের সাম্প্রতিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই ‘সোনা মিয়া’ আসলে মো. রমজান। আর বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়া এই মামলার আসামিই নন। ঘটনাটি যেন বাস্তবের ‘আয়নাবাজি’—একজনের অপরাধের দায় গিয়ে পড়েছে আরেকজনের ঘাড়ে। ২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার সদর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’ নামের একজনকে দেখানো হয়। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। তারপরও মামলার আসামির তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়েনি। পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ছিলেন মো. রমজান। তিনি নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়ে অন্য একজনের জন্মনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করেছিলেন। তদন্তে জানা যায়, রমজান ও প্রকৃত সোনা মিয়া একসময় রোহিঙ্গা শিবিরে এবং পরে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস করতেন। সেই সুবাদে রমজান সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের তথ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। পুলিশের প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই তথ্য ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন। মামলার পরবর্তী সময়ে তিনি জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যান। প্রকৃত রমজান থেকে যান আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিপরীতে তার দেওয়া পরিচয় বহনকারী সোনা মিয়ার নামেই চলতে থাকে মামলা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালত এই মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মামলার নথিতে থাকা ‘সোনা মিয়া’ও। পলাতক সোনা মিয়ার বিরুদ্ধে জারি হয় সাজা পরোয়ানা। এরপর র‌্যাব-১৫ রামু থেকে সোনা মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পর ওই ব্যক্তি আদালতে আবেদন করে জানান—তিনি এই মামলার আসামি নন। জীবনে কখনো ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হননি, এমনকি এই মামলায়ও তাকে কখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। গত ৫ জুলাই কক্সবাজার সদর থানা-পুলিশ আদালতে যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়, তাতে দুই ব্যক্তির পরিচয় ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে স্পষ্ট অমিল পাওয়া যায়। ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি, অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে রমজানের বয়স তখন ছিল ২৫ বছর। তার মায়ের নাম সোনারা বেগম, স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। দুই গাল ও ডান বাহুতে ক্ষতচিহ্ন ছিল। অন্যদিকে ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়ার বয়স ৩৪ বছর। তার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন, স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি। তার শরীরে শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহু, পেটের বাঁ পাশ ও পিঠের মাঝখানে তিল থাকার তথ্য রয়েছে। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মো. আলী জেলা কারাগারে গিয়ে দুই সময়ের বন্দীর সংরক্ষিত ছবি, শনাক্তকরণ চিহ্ন ও আঙুলের ছাপ যাচাই করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কোনো মিল পাওয়া যায়নি। একই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আরেক আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ জানতে পারে, তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়াকে চেনেন না। তদন্তে আরও উঠে আসে, বর্তমান সোনা মিয়া আগে কখনো গ্রেপ্তার হননি কিংবা কারাগারে বন্দী ছিলেন না। সব মিলিয়ে পুলিশের তদন্তে নিশ্চিত করা হয়েছে—কারাগারে থাকা সোনা মিয়া এই মামলার আসামি নন; মামলার প্রকৃত আসামি রমজান। ঘটনাটি সামনে আসার পর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় আসামির পরিচয় যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মন্নানের মতে, তদন্ত থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ছিল। অন্য ব্যক্তির জন্মনিবন্ধনের তথ্য যাচাই না করেই অভিযোগপত্র দেওয়ার কারণেই প্রকৃত আসামি রমজান পালিয়ে যেতে পেরেছেন এবং নিরপরাধ সোনা মিয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে কারাগারে বন্দী হয়েছেন। তিনি ঘটনাটির তদন্ত দাবি করেছেন। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া প্রকৃত আসামি নন এবং প্রকৃত আসামি রমজান—এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনটির ওপর আদালতের কোনো আদেশ এখনো পাওয়া যায়নি। এদিকে কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, তার স্বামী খেটে খাওয়া মানুষ এবং কখনো কোনো অপরাধ করেননি। রমজানের সঙ্গে তার পরিচয়ের কারণেই আজ তার স্বামীকে রমজানের অপরাধের খেসারত দিতে হচ্ছে। একজনের পরিচয় চুরি করে আরেকজন পালিয়ে গেলেন। সেই পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে মামলা হলো, সাজা হলো মৃত্যুদণ্ড। আর শেষ পর্যন্ত যার নাম ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই নিরপরাধ মানুষটিই এখন কারাগারে। এই ঘটনায় শুধু একজন নিরপরাধ মানুষের জীবনে নেমে আসা বিপর্যয়ই নয়, প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের মান, আসামি শনাক্তকরণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
ট্রাকচালক হোসেন হত্যা: শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের ৩৪ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ফের পেছাল অভিনব পদ্ধতিতে অগ্রণী ব্যাংকের ভল্ট থেকে সাড়ে ৪ কোটি টাকা সরিয়ে গড়া হয় খামার! সোনাগাজীতে স্কুলছাত্রীকে মারধোর করে কানের দুল ছিনিয়ে নিল যুবদলকর্মীরা ঝিনাইদহে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপি দু’পক্ষের সংঘর্ষে আহত ১০ ‘ছাদে লোক উঠে’, বাংলাদেশের জন্য তৈরি রেলকোচের ছাদ শক্ত করেছে ভারত আয়নাবাজি: উধাও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রমজান, কারাগারে নিরপরাধ দিনমজুর সোনা মিয়া দেশে ফিরলেন নেপালের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর, হাজারো সমর্থকের সংবর্ধনা জাতিসংঘের প্রতিবেদনে দিল্লির লাল কেল্লায় হামলায় আল-কায়েদা সংশ্লিষ্টরা: বাংলাদেশে সেল গঠনের চেষ্টা ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের দারুণ দিন: এক নজরে সব রেকর্ড চট্টগ্রামজুড়ে গ্যাসের তীব্র সংকট ও লোডশেডিং: যানচলাচল ও রান্নাঘর থেকে শিল্পকারখানায় হাহাকার এক্সপ্রেসওয়ে থেকে সিআরবি: চাঁদাবাজি, মারধর ও বাণিজ্যিক আধিপত্যের কবলে চট্টগ্রামের অর্থনীতি চট্টগ্রামে আধিপত্যের লড়াই: জমি দখল ও চাঁদাবাজির আড়ালে প্রাণহানির মিছিল ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক থেকে আওয়ামী লীগের ৫৩ নেতাকর্মীকে আটক সক্ষমতা, সাহস, সম্মান এবং শৈলী আবারও বাংলাদেশ ভ্রমণে উচ্চমাত্রার সতর্কতা জারি করল কানাডা আওয়ামী লীগ আমলের চুক্তি: ভারত থেকে আসছে নতুন প্রজন্মের রেলকোচের প্রথম চালান জিও-পলিটিক্যাল জটিল সমীকরণ এর কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ চরম পর্যায়ে লোডশেডিং: ভোগান্তিতে বাড়ছে জনরোষ, নিরাপত্তা শঙ্কায় বিদ্যুৎকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তির অভিঘাত: বাংলাদেশ সরকারের কেনাকাটার সকল তথ্য দাখিলের চাপ ৫০% চাঁদা না পেয়ে পুলিশের সামনেই ঠিকাদার ও সাংবাদিকের উপর কর্ণফুলী যুবদল নেতার হামলা