নিউজ ডেক্স
আরও খবর
গভীর রাতে নারীসহ আপত্তিকর অবস্থায় আটক যুবদল সভাপতিকে উত্তম-মধ্যম, দল থেকেও বহিষ্কার
দরিদ্র ছাত্রের বরাদ্দ সাইকেল নাতনিকে, ধরা পড়ে ফেরত জামায়াত নেতার: ছাগল-ফুটবল-সেলাই মেশিনও লোপাট
রণক্ষেত্র সাতকানিয়া: সশস্ত্র জামায়াত-শিবির কর্মীদের গুলিতে রক্তাক্ত আওয়ামী লীগ কর্মী, এলাকায় তীব্র ক্ষোভ
বিদ্যুতের লোডশেডিং অতিষ্ট যুবকের প্রধানমন্ত্রী ও জায়মাকে কটুক্তি, ফেনীতে যুবক গ্রেফতার
হাসপাতাল চালুর দাবিতে সড়ক অবরোধ, নবম দিনে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
কোটচাঁদপুরের ডেপুটি রেঞ্জার শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের একাধিক অভিযোগ
‘সংসার চলে না, চিকিৎসা বন্ধ’— ব্যাংক একীভূতকরণের জাঁতাকলে পিষ্ট ৩ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ
সম্পত্তির বিরোধ থেকে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, উচিৎ শিক্ষা দিতে সবার নামে জুলাই মামলা: আছেন ভূমিমন্ত্রী জাবেদসহ আওয়ামী নেতারাও
চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনে হামলার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলার আসামি তালিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মামলায় এমন অনেক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যাদের সঙ্গে বাদীর বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল বহু বছর আগে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক সহকর্মী, কলেজের শিক্ষক, পরিচালনা পরিষদের সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা, আত্মীয়-স্বজন—এমনকি ব্যক্তিগত ও সম্পত্তিগত বিরোধ থাকা ব্যক্তিদেরও একই মামলায় আসামি করেছেন বাদী।
আলোচিত এই বাদীর নাম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, যিনি জাহাঙ্গীর আলম দস্তগীর নামেও পরিচিত।
মামলার নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনায় জানা গেছে, তালিকাভুক্ত অনেক আসামির সঙ্গে জাহাঙ্গীরের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল চাকরিচ্যুতি, পুরোনো অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, সামাজিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে।
এমনকি এজাহার দায়েরের কিছুদিন পরই আরও বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে একই মামলায় আসামি করার আবেদন করা হয়েছিল, যদিও আদালত তা গ্রহণ করেননি।
মামলার সূত্রপাত
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর, একই বছরের ৫ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর আলম দস্তগীর।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট নগরীর জিপিও এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় তার ওপর হামলা করা হয়। এই মামলায় ১ নম্বর আসামি করা হয় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদকে।
মোট আসামির সংখ্যা ছিল ১৮ জন। সাবেক ভূমিমন্ত্রী ছাড়া মামলায় নাম থাকা ব্যক্তিদের একটি বড় অংশের সঙ্গে জাহাঙ্গীর দস্তগীরের ব্যক্তিগত নানা বিরোধ রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
কলেজকেন্দ্রিক পুরোনো বিরোধ
মামলার আসামিদের মধ্যে ২ নম্বরে রয়েছেন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার পশ্চিম পটিয়ার এজে চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন। জাহাঙ্গীর আলম এই কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। ২০০৬ সালে নানা অনিয়মের অভিযোগে কলেজ গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে তার চাকরি চলে যায়। এরপর থেকেই কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার বিরোধ চলে আসছিল।
চাকরিচ্যুতির পর তিনি কলেজের শিক্ষক ও পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে আসছিলেন।
মামলার ৩ নম্বর আসামি সমীর রঞ্জন নাথ একই কলেজের শিক্ষক। ৪ নম্বর আসামি মনোয়ারা বেগম কলেজটির ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ৫ নম্বর আসামি শামীমা আক্তার চৌধুরী ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক।
মামলার ১০ নম্বর আসামি এমএ সেলিম চৌধুরী ওই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল জলিল চৌধুরীর (এজে চৌধুরী) পরিবারের সদস্য এবং কলেজের দাতা সদস্য। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৪ সালের ২৪শে জুন থেকে ২রা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থান করছিলেন।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ
আসামি হওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি পুলিশ কমিশনার বরাবর দেওয়া আবেদনে নিজের পাসপোর্টের কপি জমা দেন, যা তার দেশের বাইরে অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
মামলার ১১ নম্বর আসামি আব্দুস সালাম ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এজে চৌধুরী কলেজ পরিচালনা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
মামলার ৬ নম্বর আসামি দিদারুল আলম চৌধুরীর বাড়ি শিকলবাহা এলাকায়, তার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের পূর্ববিরোধ রয়েছে। ৭ নম্বর আসামি মোস্তফা মোহাম্মদ এমরান একজন আইনজীবী ও একটি পত্রিকার প্রতিবেদক, যার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ রয়েছে।
এভাবে বেছে বেছে নিজের পুরোনো শত্রুদের বৈছা আন্দোলনের মামলায় আসামি করেছেন জাহাঙ্গীর আলম।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
সম্প্রতি অবসরে যাওয়া এজে চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে নারী সহকর্মীদের হয়রানি ও অর্থ আত্মসাতসহ বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। তার করা মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ঘটনার সময় আমি ঢাকায় ছিলাম। ২০২৪ সালের ৩রা আগস্ট আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম এবং ৫ই আগস্ট রাত ৯টায় চট্টগ্রামে ফিরে আসি।”
মামলার আরেক আসামি, আইনজীবী ও সাংবাদিক মোস্তফা মোহাম্মদ এমরান বলেন, “জাহাঙ্গীরের নানার বাড়ির সঙ্গে তাদের পরিবারের সম্পর্ক ছিল। জাহাঙ্গীর নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রচার করতেন। ওই সময় কয়েকটি প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর তিনি আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমার সহযোগিতা চেয়েছিলেন। সহযোগিতা করতে না পারায় আমার সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি নিয়েও বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জেরেও আমাকে মামলায় আসামি করা হয়ে থাকতে পারে।”
আরও ৮৮ জনকে আসামি করার চেষ্টা, তালিকায় খালাতো বোনের স্বামীও
মামলার শুরুতে ১৮ জনের নাম উল্লেখ করা হলেও, দুই সপ্তাহ পরে, ২০২৪ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীর আলম কোতোয়ালী থানার ওই মামলায় আরও আসামি অন্তর্ভুক্তির জন্য চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি আবেদন করেন। এতে তিনি এজাহারে আরও ৮৮ জনের নাম যুক্ত করার আবেদন জানান। তবে আদালত ওই আবেদন নামঞ্জুর করে দেন।
নতুন করে করা এই আবেদনে জাহাঙ্গীর তার নিজের গ্রামের বাড়ির আত্মীয়, একই এলাকার বাসিন্দা এবং সাবেক জনপ্রতিনিধিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
জানা গেছে, সেই তালিকায় ফটিকছড়ি ধর্মপুর গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান গোলাপ রহমানের (৭২) নামও ছিল। এমনকি তালিকায় ছিল তার নিজের আপন খালাতো বোনের স্বামী এবং একই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল আলম সওদাগরের নামও।
অভিযোগ রয়েছে, মামলা দায়েরের পর আসামিদের নাম প্রত্যাহার বা “অভিযোগ নেই” উল্লেখ করে আদালতে হলফনামা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করতেন জাহাঙ্গীর।
জানা গেছে, গত বছরের জুলাইয়ের শেষে নওশেদ জামাল নামে এক ব্যক্তিকে কোতোয়ালী থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর ৩রা আগস্ট আদালতে হলফনামা দিয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই বলে উল্লেখ করা হয়। আদালত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ঘটনা অর্থের বিনিময়ে ঘটেছে।
পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতারণা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর আলম দস্তগীর অতীতে কখনো নিজেকে আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী, কখনো কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, কখনো ম্যাজিস্ট্রেট, কখনো অধ্যক্ষ, আবার কখনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে পরিচয় দিতেন।
এসব পরিচয়ে তিনি পত্রিকাতেও বিজ্ঞাপন দিতেন। সেখানে তিনি দাবি করতেন যে ছাত্রজীবনে তিনি স্কুল শাখা ছাত্রলীগের জিএস ছিলেন। তবে অনুসন্ধানে তার আওয়ামী-সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ মেলেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ-সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম কোনো সংগঠনে তার নেতা হওয়া দূরের কথা, প্রাথমিক সদস্যপদও নেই।
তার বিরুদ্ধে নিজেকে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় দাবি করে বক্তব্য প্রদানের অভিযোগও রয়েছে। ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজেকে আওয়ামীবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি মামলা বাণিজ্য শুরু করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাদীর প্রতিক্রিয়া
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর আলম দস্তগীর ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে আসামি করার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে সার্বিকভাবে মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, “ঘটনার হুকুমদাতা হলেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তাই তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। প্রথম এজাহারে তাকেসহ ১৮ জনকে এবং সম্পূরক এজাহারে ৭০ জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রথম এজাহার একজনের ভুলের কারণে সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। এ কারণে দ্বিতীয় এজাহারে হত্যা এবং গুরুতর আঘাতের সংশ্লিষ্ট ধারা যুক্ত করা হয়েছে।”
তদন্ত কর্মকর্তা ও আইনজীবী সমিতির প্রতিক্রিয়া
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “আমরা সবগুলো বিষয় যাচাই-বাছাই করছি। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে তাই এখনই মন্তব্য করা যাচ্ছে না।”
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন বলেন, “জাহাঙ্গীর নিজেকে কখনো বিচারক, কখনো আইনজীবীসহ নানা পরিচয় দেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে। মূলত তিনি একধরনের পেশাদার প্রতারক। তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “বৈছা আন্দোলনের ঘটনায় জাহাঙ্গীর মামলা করে নিরীহ লোকজনকে আসামি করেছেন, যাদের সঙ্গে তার পূর্বশত্রুতা ছিল। বিষয়টি এখন সবাই জেনেছেন। আশা করি, নিরপরাধ ব্যক্তিরা তার মামলা থেকে রেহাই পাবেন।”
