আরও খবর
বন্ধ এলএনজি টার্মিনাল পুনরায় চালু, গ্যাস সরবরাহ বাড়ছে
আরেক দফা বাড়ল সবধরনের চালের দাম
দেশে এলপিজির মোট চাহিদার ৮৫ শতাংশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক দখলে
গ্যাসের দাম বাড়ার পঞ্চহেতু
তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছাড়াল ৭৪৭ কোটি ডলার
বাংলাদেশকে হরমুজ প্রণালী ব্যাবহারের প্রস্তাব ইরানের; বাধা হতে পারে ইউনূস সরকারের করা ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি’
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কারখানা বন্ধের ইঙ্গিত মালিকদের
নূর আলম ও আদম, দুই ভিন্ন পথের মানুষ
চিলমারী নদীবন্দরের বাজারে নূর আলমের সঙ্গে দেখা হয়। তাঁর বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের ব্যাপারীপাড়া। তিনি ৪০ বছর বয়সী এবং মাছ ধরার ঝুঁকি নিয়ে দেশান্তরী হওয়া এই এলাকার আরও অনেকের মতোই জীবনের কঠিন পর্যায়ে আছেন।
বিজ্ঞাপন
২৭‑২৮ বছর আগে তিনি প্রথম চাচার সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে আসামে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। তখন পাসপোর্ট‑ভিসার এত কঠোর ছিল না; গ্রামের অনেক মানুষই আসামে মাছ ধরতে যেতেন এবং তাদের সঙ্গে ছোট ছেলেও যেত। নৌকা ও বাসে প্রায় দুই দিনের পথ অতিক্রম করে তারা আসামের জোড়হাটে পৌঁছাতেন।
নূর আলম জানান, জোড়হাটে সবাই একেক জায়গায় মাছ ধরতে যান; তাদের বাপ‑দাদারা ঐ জায়গায় মাছ ধরতেন। জোড়হাটের মানুষরা ভালো এবং জলমহালের মালিক সাধারণত একজন থাকায় জেলেদের ভাগে বেশি মাছ পড়ে। তিনি বলেন, মাছ বিক্রির টাকার ৪০ শতাংশ জলমহালের মালিক পান, বাকি ৬০ শতাংশ জেলেদের।
চিলমারীতেও ব্রহ্মপুত্র, আসামেও ব্রহ্মপুত্র; তবু কেন আসামে যান? নূর আলমের ব্যাখ্যা হল, মাছ উজানের দিকে যায়। এছাড়া আসামে নদীর মাছ রক্ষায় বছরের কয়েক মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকে, ফলে নদীর ধারে বন ও জলাভূমি থাকে, যেখানে মাছ বড় হয় এবং পরিমাণে বেশি হয়। চাল‑সবজির দামও তুলনামূলক কম। নৌকা ভাড়া নিতে হয়, তবে জাল নিজেদের।
মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলে তারা বাড়ি ফিরে আসেন; ফেরার সময় নিজেদের জাল পরিচিত লোকজনের বাড়িতে রেখে যান, পরের মৌসুমে আবার ব্যবহার করার জন্য। একই ঘটনা দুইবার উল্লিখিত হয়েছে, কারণ এটি তাদের কাজের পদ্ধতি।
বিজ্ঞাপন
মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলে তারা বাড়ি ফিরে আসেন। ফেরার সময় নিজেদের জাল পরিচিত লোকজনের বাড়িতে রেখে আসেন, পরের মৌসুমে আবার ব্যবহার করবেন বলে।
মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলে তারা বাড়ি ফিরে আসেন। ফেরার সময় নিজেদের জাল পরিচিত লোকজনের বাড়িতে রেখে আসে, পরের মৌসুমে আবার ব্যবহার করবে।
মাছ ধরে ফিরে কখনো এক লাখ, কখনো দুই লাখ, এমনকি পাঁচ লাখ টাকাও আয় করেছেন নূর আলমরা দল বেঁধে। কিন্তু এত বছর মাছ ধরে আয় করেও নূর আলমের জীবনে স্বস্তি আসে নি। তাঁর ছেলেটি জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, স্ত্রী‑ও অসুস্থ। স্ত্রী ও সন্তানের চিকিৎসায় তাঁর ১৪‑১৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
নিজের কোনো জমি‑জমা ছিল না, ঘরও ছিল না। বড় ভাইয়ের দেওয়া সাড়ে তিন শতক জমিতে একটি ঘর তুলেছেন। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ের বয়স এক বছর। এখন তিনি বেকার; মাঝেমধ্যে বালুর ট্রলারে কাজ করতে যান।
বিজ্ঞাপন
আদমের বয়স ৩৬ বছর। তার বাবা রফিকুল ইসলাম। বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ফরিদাবাদ, ডাক্তারপাড়া। বর্তমানে কুড়িগ্রাম শহরের ঐশী রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন। বাবুর্চি হিসেবে এমন দক্ষতা অর্জন করেছেন যে কুড়িগ্রামের মতো শহরেও দৈনিক দেড় হাজার টাকা মজুরি পান; মাসে আয় ৪৫ হাজার টাকা। সামনের মাস থেকে দৈনিক মজুরি বেড়ে ২ হাজার ১০০ টাকা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
এর বাইরে প্রতিমাসে বিয়ের রান্নার কাজও পান। গড়ে চার‑পাঁচটি বিয়ের অনুষ্ঠানে কাজ করেন। প্রতিবার মজুরি পাঁচ হাজার টাকা। বিয়ের রান্না থেকে মাসে আরও ২০‑২৫ হাজার টাকা আসে। এই বাড়তি আয় তিনি জমিয়ে রাখেন।
আদমের ভাষায়, ‘সরকারি চাকরিতে যেমন পেনশন থাকে, আমারও তেমন। আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে কী করব? বাড়িতে যেগুলো দিয়েছি, সেগুলো তো কাজের মধ্যেই বন্ধ। কিছু করতে চাইলে মা বলবে, এটা করা ঠিক হবে? আব্বা বলবে, আচ্ছা থাক। ছোট ভাই মন খারাপ করবে। আর নিজের পুঁজি দিয়ে যখন কিছু করতে চাইব, তখন কেউ কিছু বলবে না। আল্লাহপাক সুস্থ রাখলে দুই বছর পর বাড়িতে যাব।’
আদমের বাড়ি ছাড়ার গল্প ২০০২ সালে শুরু হয়; তখন তাঁর বয়স ১১ বছর। বাড়িতে তাকে একটি কাজ করতে বলা হয়েছিল, তিনি তা করেননি। অভাবের সংসার, সারা দিন ঠিকমতো খাবার না পাওয়ায় তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে তারাগঞ্জ বাজারে দুই দিন কাটান। তৃতীয় দিন রওনা দিয়ে রংপুরের উদ্দেশে যান; তারপর দিনাজপুর, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট ও গাইবান্ধা ঘুরে এখন কুড়িগ্রামে পৌঁছেছেন।
বিজ্ঞাপন
ছোটবেলায় রংপুর‑দিনাজপুর চিনতেন না। রংপুরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন দিনাজপুরে। সেখানে একটি হোটেলে ১০‑১২ দিন কাজ করেন। বাসস্ট্যান্ডের পাশে ‘মায়ের দোয়া’ নামের একটি ছোট রেস্তোরাঁয়ও কাজ করেছেন; মালিক তাঁকে নিজের ছেলের মতো দেখতেন। কিন্তু সেখান থেকে আবার বাসে চড়ে রংপুরে ফিরে যান।
তখন অনেক জায়গা ঘুরে দেখার ইচ্ছা ছিল। ঘুরতে ঘুরতে নিজের টাকা শেষ হয়ে যায়। হোটেলে কাজ শুরু করেন। রাতে দায়িত্ব পালন করতেন, বিকেলে অবসর পেলে ঘুরে বেড়াতেন।
বাসস্ট্যান্ডের পাশে ‘মায়ের দোয়া’ নামের একটি ছোট রেস্তোরাঁয়ও কাজ করেছেন। মালিক তাঁকে নিজের ছেলের মতো দেখতেন। কিন্তু সেখান থেকে আবার বাসে চড়ে রংপুরে ফিরে যান। তাদের জমি‑জমা ছিল না। একটি হালের গরু ছিল, সেটিও দাদার। চাচার সংসার আলাদা, তাঁদের সংসারও আলাদা। তাঁদের থাকার ছোট্ট ঘরটি ছিল খড়ের। একদিকে হাঁস‑মুরগি থাকত, অন্যদিকে বাবা‑মায়ের সঙ্গে তিন ভাইবোন থাকতেন।
আদমের ভাষায়, ‘বৃষ্টির দিনে বৃষ্টি সরাসরি আমাদের গায়ে পড়ত। ঝড়‑তুফান হলে খাটের নিচে ঢুকতাম, এই বুঝি ঘর ভেঙে পড়ে!’
বিজ্ঞাপন
সেই দিন এখন অতীত। আল্লাহর রহমতে এখন তারা পাকা বাড়িতে থাকেন। পাঁচ‑ছয় বছর পর তাঁর বাবাও বাড়ি ফিরে এসেছেন। এখন সংসারের মূল চালিকা শক্তি তাঁর মা। টিনের ঘর করার পর বোনের বিয়ে দিয়েছেন। দুই ভাই কর্মক্ষম হয়েছে। এখন চার ঘরের ছাদঢালাই বাড়ি করেছেন। এখন তাদের প্রায় ৬০ শতক জমি আছে; প্রায় ৫১ শতক ধানের জমি, বাকিটা বাড়িভিটা।
কষ্টের জীবন পেরিয়ে আদমের এই জায়গায় পৌঁছানোর পেছনে দুটি বিষয় কাজ করেছে—ক্ষুধা আর মায়ের কষ্ট। তাঁর কথায়, ‘মা একমুঠো ভাত যেভাবে জোগাড় করে এনে দিতেন, তা ভোলার নয়। অনেক সময় আমাদের খাইয়েছেন, নিজে খাননি। এমন দিনও গেছে, ভাত ছিল না। মা আঁটিকলা সেদ্ধ করে খাইয়েছেন। মায়ের এই স্মৃত’

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
[TheChamp-FB-Comments]