নিউজ ডেক্স
আরও খবর
নূর আলম ও আদম, দুই ভিন্ন পথের মানুষ
বন্ধ এলএনজি টার্মিনাল পুনরায় চালু, গ্যাস সরবরাহ বাড়ছে
আরেক দফা বাড়ল সবধরনের চালের দাম
গ্যাসের দাম বাড়ার পঞ্চহেতু
তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছাড়াল ৭৪৭ কোটি ডলার
বাংলাদেশকে হরমুজ প্রণালী ব্যাবহারের প্রস্তাব ইরানের; বাধা হতে পারে ইউনূস সরকারের করা ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি’
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কারখানা বন্ধের ইঙ্গিত মালিকদের
দেশে এলপিজির মোট চাহিদার ৮৫ শতাংশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক দখলে
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১৭ লাখ ৪৩ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। দেশের বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণে। আগের অর্থবছরেও তাঁদের বাজার-অংশ প্রায় একই ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) আমদানির উৎসে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। এক বছর আগেও আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মূলত উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভর করত। তখন মোট এলপিজির ৪১ শতাংশের বেশি আসত ওমান থেকে।
ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও ছিল আমদানির উল্লেখযোগ্য উৎস। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। উপসাগরীয় দেশগুলোর বদলে যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের এলপিজির প্রধান উৎস। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট আমদানির প্রায় ৮৫ শতাংশ এসেছে দেশটি থেকে।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে মালয়েশিয়া থেকে এসেছে মোট এলপিজি আমদানির ৩ শতাংশ। আফ্রিকার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও রিপাবলিক অব কঙ্গো থেকে এসেছে প্রায় ৭ শতাংশ।
অর্থাৎ প্রচলিত মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক উৎস থেকে সরে এসে বাংলাদেশ এখন এলপিজির জন্য অনেকটাই দূরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
অথচ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের এলপিজি আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস ছিল ওমান। সে সময় মোট আমদানির ৪১ শতাংশের বেশি এসেছিল দেশটি থেকে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছিল ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ; ইরাক থেকে ২১ শতাংশ; মালয়েশিয়া থেকে ৫ শতাংশ; সৌদি আরব থেকে ৪ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২ শতাংশ।
এক বছরের মধ্যে আমদানির উৎসে এই বড় পরিবর্তন দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রশ্নও সামনে এনেছে।
বিইআরসির তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১৭ লাখ ৪৩ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। দেশের বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি অপারেটরদের হাতে, যা আগের অর্থবছরেও প্রায় একই ছিল।
আমদানির ওপর নির্ভরশীল এই বাজারে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে বা আমদানি ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও আমদানির ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা প্রায় একই মাত্রায় ছিল।
দূরের দেশ থেকে এলপিজি আনা বাড়লেও এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে দাম নির্ধারণে এর প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন বিইআরসির কর্মকর্তারা। তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিবহন ব্যয় ও সময় বাড়ার প্রভাব এলপিজির দামে পড়তে পারে কি না, তা তাঁরা পর্যালোচনা করছেন।
এ বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “এলপিজি আমদানির উৎস দেশ বদলে গেছে। কয়েক মাস ধরে এ পরিবর্তন ঘটছে। আগে উপসাগরীয় দেশ ওমান থেকে ৪১ শতাংশ এলপিজি আমদানি হতো। অথচ এক বছর ধরে দেশটি থেকে কোনো এলপিজি আসেনি। দূরবর্তী দেশ থেকে আমদানির কারণে জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন সময়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। আমরা এসব বিষয় বিবেচনায় নিচ্ছি।”
বাংলাদেশে এলপিজির দাম মূলত সৌদি আরামকোর ঘোষিত চুক্তিমূল্য বা সৌদি সিপির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে প্রোপেন ও বিউটেনের আলাদা দাম ঘোষণা করে। এই দুই উপাদানের মূল্য ধরে আমদানি ও পরিবহনের ব্যয়সহ পণ্যটি ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত অন্যান্য খরচ হিসাব করে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি, জাহাজ চলাচলে বাধা এবং বীমা ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিকারকেরা বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপিজি সংগ্রহ কঠিন হওয়ায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ান।
মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি পরিবহনের দূরত্ব অনেক বেশি। ব্যবসায়ীদের মতে, এর ফলে জাহাজ ভাড়া, পরিবহন সময়, বীমা ও অন্যান্য লজিস্টিক খরচ বাড়ছে, যার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ছে। একক কোনো দেশের ওপর আমদানির বড় অংশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় সরবরাহব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেন।
ফ্রেশ এলপি গ্যাসের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) আবু সাঈদ রাজা বলেন, “যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পণ্যের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের এলপিজি আমদানির উৎসও বদলে গেছে। বর্তমানে ৮৫ শতাংশ এলপিজি আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এতে আপত্তির কিছু নেই। তবে দুটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আসতে ৪৫-৫০ দিন লাগছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সর্বোচ্চ ১৫ দিন লাগত। দীর্ঘ পরিবহন সময়ের কারণে ঋণপত্র খুলে ব্যবসায়ীদের অর্থ আটকে থাকছে। দ্বিতীয়ত, একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সরবরাহ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কোনো কারণে একটি জাহাজ আটকে গেলেও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে।”
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়ে বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি তেলের সংকট অনেকটা কমলেও এলপিজির বাজারে অস্থিরতা এখনো রয়ে গেছে। আমদানির পরিমাণে বড় পরিবর্তন না হলেও সরবরাহ ও দাম নিয়ে সমস্যা কাটেনি।
বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ ওঠে। কোথাও কোথাও বাড়তি দাম দিতে চেয়েও ভোক্তারা সিলিন্ডার পাননি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনেই আমদানি হয় ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। বিইআরসির হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার থেকে দেড় লাখ টন। আমদানি ও চাহিদার পরিসংখ্যানে বড় ঘাটতি না থাকলেও খুচরা বাজারে সংকট দেখা দিয়েছিল।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, জাহাজ ভাড়া ও আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সংকটকে তীব্র করেছে। বাড়তি আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে দাম সমন্বয়ের অপেক্ষায় কিছু অপারেটর বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এরই মধ্যে ২ নভেম্বর বিইআরসি নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করে। আগের মাসে দাম ছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। ফলে এক মাসে সিলিন্ডারপ্রতি দাম বেড়েছে ২২৩ টাকা। সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইস বা সৌদি সিপি বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয়ের প্রভাব এই মূল্য সমন্বয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।
দেশের বাজারে প্রায় ৯৮ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করেন বেসরকারি অপারেটররা। আমদানি ও সরবরাহের কাজও মূলত তাঁদের হাতেই; বিইআরসি শুধু দাম ঘোষণা করে। বেসরকারি অপারেটরদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় উৎস থেকে এলপিজি আমদানি বন্ধ হওয়ায় তাঁরা পণ্যটির আমদানি ব্যয় বা সরবরাহে কোনো সংকট দেখছেন না।
তাঁদের ভাষ্য, বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে এলপিজির দাম কাছাকাছি; মূলত জাহাজ ভাড়ায় পরিবর্তন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিয়মিত এলপিজি আনা গেলে ক্ষতির কারণ নেই বলে তাঁরা মনে করেন। তাঁদের মতে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়াটাই জরুরি।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, “আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে এলপিজি আমদানি হতো, তার বড় অংশ এখন আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। উৎস পরিবর্তনে সমস্যা নেই।
গুরুত্বপূর্ণ হলো পণ্য দেশে পৌঁছাতে কত সময় লাগছে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকলে এটিও সমস্যা হতো না। বিগত সরকার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি, বেসরকারি খাতকেও সে সুযোগ দেয়নি। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রভাব আমাদেরও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তবে বিশ্ববাজারে এলপিজির দামে উৎসভেদে খুব বেশি পার্থক্য নেই।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানিনির্ভরতা এবং বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের এলপিজি বাজারের বড় দুর্বলতা। বছরে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে সরকারি সরবরাহ খুবই কম।
ফলে বড় কোনো আমদানিকারকের কার্যক্রম ব্যাহত হলে বাজারে সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ঝুঁকি কমাতে আমদানির উৎস বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি করা এবং পর্যাপ্ত মজুদ সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের মতে, বড় জাহাজ থেকে এলপিজি নামানোর উপযোগী টার্মিনাল ও সংরক্ষণাগার তৈরি হলে পরিবহন খরচ কমতে পারে। বর্তমানে ছোট জাহাজে আমদানি করায় প্রতি টনে ব্যয় বেশি হচ্ছে।

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
[TheChamp-FB-Comments]