নিউজ ডেক্স
আরও খবর
নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন রোববার
তনু হত্যায় দুই সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ইউনূসের থ্রি জিরোর পর এবার এলো তারেক রহমানের ‘থ্রি আর’ স্ট্র্যাটেজি
হামে শিশু মৃত্যু: ইউনূসসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণে রুল
স্বাস্থ্যমন্ত্রী: বিএনপি সরকারকে ব্যর্থ করতে দেশে বিভিন্ন সংকট সৃষ্টি করছে আওয়ামী দোসররা
অচেতন করে গণধর্ষণের পর তরুণীকে হাসপাতাল থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় যুবদল সম্পাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ভারতে আটক থাকা ফয়সাল ‘বাংলাদেশ ত্যাগ করতে পারবেন না’, নিষেধাজ্ঞা জারি
দ্বীনি শিক্ষার নামে মাদ্রাসায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমন্বয়ে ধর্ষকচক্র: ৭ বছরের ছাত্রের জবানবন্দিতে উঠে এলো ভয়ঙ্কর চিত্র
মাত্র সাত বছর বয়সের একটি শিশুর পৃথিবীজুড়ে থাকার কথা ছিল পড়াশোনা, খেলাধুলা আর পরিবারের ভালোবাসা। বাবা-মায়ের স্বপ্নও ছিল সন্তানের শিক্ষাজীবন সুন্দরভাবে গড়ে তোলার। সেই স্বপ্ন থেকেই সাভারের একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়েছিল শিশুটিকে।
কিন্তু ভর্তি হওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই তার জন্য হয়ে ওঠে আতঙ্কের জায়গা—এমন অভিযোগই উঠেছে। শিশুটির পরিবারের করা মামলায় মাদ্রাসাটির ১০ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শুরুতে মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর ২০-২১ দিনের মাথায় শিশুটির ওপর প্রথম নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এরপর অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তাকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন করা হয়।
এখন সেই শিশুটি বাড়িতে ফিরে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। কখনো কান্নাকাটি করছে, কখনো চিৎকার করছে। সন্তানের এমন অবস্থা দেখে বাবা-মা নিজেরাও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত—বলেছেন শিশুটির বাবা।
যে মাদ্রাসায় যাওয়ার জন্য শিশুটি নিজেই আগ্রহী ছিল
শিশুটির বাবা বলেন, তার সন্তান নিজ আগ্রহেই বড় একটি মাদ্রাসায় পড়তে চেয়েছিল। সেই আগ্রহ থেকেই তাকে ওই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সেই আগ্রহ টিকেছিল মাত্র ২০ দিনের মতো।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শিশুটির পাঠদানের সময় ছিল ফজরের নামাজ থেকে এশার নামাজের আগ পর্যন্ত। বাবা সপ্তাহে একদিন সন্তানের সঙ্গে দেখা করতেন এবং শুক্রবার ছুটিতে তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতেন।
পরিবারের অভিযোগ, ভর্তি হওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পর থেকেই শিশুটির ওপর কয়েকজনের কুনজর পড়ে। এরপর শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
২১শে ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় রোজার দিন সন্ধ্যায় মাদ্রাসার টয়লেটে এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শিশুটিকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার পর শিশুটি কান্নাকাটি করলে তাকে ভয় দেখানো হয় এবং কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করা হয়।
কিন্তু ঘটনাটি সেখানেই থামেনি—এমনটাই পরিবারের অভিযোগ।
একজনের ঘটনা জানতে পেরে আরেকজন, তারপর আরও অনেকে : এজাহারে উঠে এলো ভয়ঙ্কর তথ্য
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রথম ঘটনার কথা জানতে পেরে পাঁচ দিন পর আরেক শিক্ষার্থী শিশুটিকে ধর্ষণ করে। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরিবারটি জানায়, শিশুটি যেসব শিক্ষকের কাছে গিয়ে নিজের ওপর নির্যাতনের কথা জানিয়েছিল, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ তার অভিযোগের সুযোগ নিয়ে তাকে আবার নির্যাতন করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এভাবে কয়েক মাস ধরে শিশুটির ওপর নির্যাতন চলতে থাকে। সর্বশেষ ৬ই জুলাই পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, যে বয়সে একটি শিশু নিজের নিরাপত্তা ও বিপদের বিষয়গুলো পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই বড়দের ওপর নির্ভর করে, সেই বয়সেই সাহায্যের জন্য যাদের কাছে যাওয়ার কথা ছিল, অভিযোগ অনুযায়ী তাদের কারও কারও কাছ থেকেই সে নিরাপত্তা পায়নি।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, একপর্যায়ে মাদ্রাসার ভেতর শিশুটিকে ধর্ষণের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় অভিযোগ ওঠা এক শিক্ষার্থীকে ‘বড় হুজুর’ মারধরও করেছিলেন বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।
তবে পরিবারের অভিযোগ, এরপরও শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি এবং ঘটনাগুলোর বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অবশেষে ১২ই আগস্ট শিশুটি তার মাকে ঘটনাগুলো বিস্তারিত জানায়।
সন্তানের মুখ থেকে পুরো ঘটনা জানার পর পরিবার বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এজাহার অনুযায়ী, ১৫ই আগস্ট রাতে শিশুটির বাবা মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া ইবনে কাসেমের কাছে অভিযোগ করেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচালক তখন ৯৯৯-এ ফোন করে অভিযুক্তদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেন। একই সঙ্গে পুলিশ ও সাংবাদিকদের বিষয়টি জানাতে নিষেধ করেন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে শিশুটির বাবা জানতে পারেন, মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া ইবনে কাসেমের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে—এমন দাবি মামলার এজাহারে করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, পুলিশ জানতে পারলে পরিচালক নিজেও আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন—এই আশঙ্কায় বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
আদালতে মামলা, ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ঘটনার বিষয়ে শিশুটির বাবা ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করার উদ্যোগ নেন। গত ২৩শে আগস্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া ইবনে কাসেমসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার আবেদন করেন তিনি।
পরে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগটি সাভার মডেল থানায় এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। মামলায় পরিচালক ছাড়াও দুই শিক্ষক, দুই হাফেজ এবং পাঁচ শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মক্তব বিভাগের প্রধান ক্বারী রফিকুল ইসলাম (৫৬), সহকারী শিক্ষক হাফেজ মাওলানা জাবের হোসেন (২৯), হাফেজ সাব্বির (২৭) ও হাফেজ কামরুজ্জামান (২৮)। বাকি আসামিরা শিক্ষার্থী।
ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর ২৭শে আগস্ট সাভার থানা থেকে মামলার এজাহার আদালতে উপস্থাপন করা হয়। ওই দিন ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমদ এজাহারটি গ্রহণ করে ১৩ই অক্টোবরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
আদালতে শিশুর জবানবন্দি : গ্রেপ্তার হয়নি কেউ
মামলার কার্যক্রমের একই দিনে শিশুটিকে ঢাকার আরেক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফরোজা সুলতানা সুইটির আদালতে হাজির করা হয়।
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই বাহাজ উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে শিশুটি তার ওপর ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরে জবানবন্দি দেয়। পরে শিশুটিকে তার বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
এদিকে শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার বাবা।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আবুল কালামের দাবি, নির্যাতনের কারণে শিশুটির গুরুতর শারীরিক ক্ষতি হয়েছে। তিনি অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার এসআই সামরুল হোসেন বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মামলার তদন্ত চলছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
বাদীপক্ষের আইনজীবীর আশঙ্কা, দ্রুত গ্রেপ্তার করা না হলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যেতে পারেন।
এখানেই উঠছে আরেকটি প্রশ্ন—আদালতে গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও কেন এখনো কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি?
পরিচালকের বক্তব্য
মামলার অন্যতম আসামি এবং মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া ইবনে কাসেম অভিযোগ অস্বীকার বা সরাসরি স্বীকার না করে বলেন, ঘটনার সময় তিনি দেশের বাইরে ছিলেন।
তার ভাষ্য, তাবলীগ শেষে তিনি ফিলিপিন্স থেকে দেশে ফিরেছেন এবং মামলার বিষয়টি শুনেছেন। মামলায় তাকে ১০ নম্বর আসামি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, মাদ্রাসায় ছোট ছোট শিশু রয়েছে এবং সেখানে কোরআন-হাদিস শেখানো হয়। তার দাবি, কেউ কেউ নিজেরাই এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। তবে অভিযোগের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মাদ্রাসার ভাবমূর্তি নষ্ট করার কোনো চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধী থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনার পক্ষে মত দেন তিনি।
তবে মামলায় অভিযুক্ত অন্য শিক্ষক, হাফেজ ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা জানতে পরিচালকের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পরে তিনি ফোন কেটে দেন।
বাবার প্রশ্ন—সন্তানকে কোথায় নিরাপদ রাখবেন?
শিশুটির বাবা এখন একদিকে সন্তানের চিকিৎসা ও মানসিক অবস্থার কথা ভাবছেন, অন্যদিকে মামলার আসামিদের বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
তিনি বলেন, সন্তানকে বড় মাদ্রাসায় পড়ানোর যে স্বপ্ন ছিল, সেটিই এখন তার কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার ভাষায়, শিশুটি নিজের আগ্রহে মাদ্রাসায় গিয়েছিল। কিন্তু সেই আগ্রহ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ২০ দিন।
পরিবারের অভিযোগ, মামলায় উল্লেখ করা ১০ জনের বাইরেও আরও কয়েকজন শিশুটির সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করেছে। কাউকে ঘটনা জানালে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
শুধু কি একটি শিশুর ঘটনা?
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযুক্তরা একটি ‘সংঘবদ্ধ চক্র’ হিসেবে কাজ করেছে এবং মাদ্রাসার আরও অনেক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় তারা জড়িত।
এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তবে অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি কেবল একজন শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা, নজরদারি, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠবে।
একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়ে শিক্ষকের কাছে অভিযোগ জানায়, তখন তার প্রথম প্রত্যাশা থাকে নিরাপত্তা ও সাহায্য। সেই জায়গাটিই যদি তার জন্য নিরাপদ না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের সুরক্ষা কাঠামো কতটা কার্যকর—সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
এখন তদন্তের অপেক্ষা—অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা কতটা সত্য, কার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ পাওয়া যায় এবং শিশুটির অভিযোগের পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আসলে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
আর সবকিছুর বাইরে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি থেকে যায়: দ্বীনি শিক্ষার জন্য যে শিশুকে মাদ্রাসায় পাঠানো হয়েছিল, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের ছিল, তারা সেই দায়িত্ব কতটা পালন করেছিলেন?

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
[TheChamp-FB-Comments]