ইরান সংকটে আন্দোলনের ভেতরে যুদ্ধের ছায়া – বর্ণমালা টেলিভিশন

ইরান সংকটে আন্দোলনের ভেতরে যুদ্ধের ছায়া

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ১৫ January, ২০২৬ | ৮:১৯ 144 ভিউ
ইরানে যা চলছে তা আর বিক্ষোভ নয়। এ এক কৌশলগত মানসিক যুদ্ধ, যার এক পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষুব্ধ জনতা, অন্য পাশে বন্দুক, আদালত, ফাঁসির মঞ্চ ও ফায়ারওয়াল। মাঝখানে ট্রাম্পের টুইট, ড্রোনের ছায়া, আর কাতারের ফোনকল। ঘটনাগুলো যতটা অভ্যন্তরীণ, ঠিক ততটাই বৈশ্বিক—এই প্রতিবেদন খুঁজে দেখবে, কে আসলে নিয়ন্ত্রণে, আর কারা শুধু দাবি করছে তা। দ্রব্যমূল্য থেকে রাজপথে বিদ্রোহ: ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যখন ইরানজুড়ে নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে, তখন রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ মানুষ। তবে কয়েকদিনের মধ্যেই অর্থনৈতিক বিক্ষোভ রূপ নেয় শাসন ব্যবস্থাবিরোধী আন্দোলনে। এক পাশে ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে স্লোগান, অন্য পাশে নিরাপত্তা বাহিনীর তাণ্ডব। এ যেন শুধুই একটি অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল চেনা, কিন্তু আগ্রাসী—ব্রুটাল ফোর্স, গণগ্রেপ্তার এবং ভয়ানক তথ্য নিয়ন্ত্রণ। ফলে আন্দোলন থামেনি, বরং আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়েছে। নিহতের সংখ্যা, নিপীড়নের মাত্রা: এইচআরএএনএ (হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি) এবং আরও কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন বলছে, এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ১৮ হাজার। বহু মানুষ নিখোঁজ। তারাও সম্ভবত গ্রেপ্তার হয়ে নির্যাতিত হচ্ছে। ফাঁসি: ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি এ আন্দোলনে এক ভয়াবহ মোড় এনে দেয়। তার বিচার হয়েছে দ্রুত, আইনজীবীর প্রবেশাধিকার ছাড়াই। অভিযোগ ‘ঈশ্বরবিরোধী যুদ্ধ’। এই একটি কেসই ইঙ্গিত দেয়, আন্দোলন দমনে ইরান কেমন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চাইছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় টিভি প্রথমবার ‘অনেক শহীদের’ কথা স্বীকার করেছে—তবে এ শহীদের মানে জনগণ নাকি নিরাপত্তাকর্মী, সেটা বলা হয়নি। গতকাল তার ফাঁসি কার্যকর করার কথা থাকলেও রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকরের খবর পাওয়া যায়নি। ওয়াশিংটন বনাম তেহরান: টুইটের পর মিসাইল? এই উত্তাল সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন নিজের স্টাইলেই ঢুকে পড়েছেন ইরানের অভ্যন্তরে—‘বিক্ষোভ চালিয়ে যান, প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নিন... সাহায্য আসছে’—এই পোস্ট এখন শুধু স্লোগান নয়, রাজনৈতিক সংকেত। ট্রাম্প পরিষ্কার বলেছেন, ইরান যদি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা’ নেবে। এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণাও এসেছে। ফলে শুধু হস্তক্ষেপ নয়, অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। তেহরানের প্রতিক্রিয়া: পাল্টা যুদ্ধের প্রস্তুতি? ইরান বসে নেই। তারা আগেই জানিয়ে দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো হামলার লক্ষ্য হবে। এ ছাড়া কাতার, বাহরাইনসহ যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে সেগুলোকেও ‘টার্গেট লিস্টে’ রাখা হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা সরাসরি যোগাযোগ স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সঙ্গে। এটাও দেখায়, যুদ্ধ শুধু মাঠে নয়, কূটনৈতিক টেবিলেও জমে উঠছে। ইন্টারনেট বন্ধ, তথ্য অন্ধকারে: গত পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে ইরানজুড়ে ইন্টারনেট কার্যত অচল। স্টারলিংকের মাধ্যমে কিছু বিকল্প সংযোগের চেষ্টা হলেও তেমন ফল আসেনি। ফলে আন্দোলনের ভয়াবহতা বা নিপীড়নের প্রকৃত চিত্র সামনে আসছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্ভরশীল আন্দোলনের জন্য এটা একরকম চূড়ান্ত বাধা। অন্ধকারে পড়ে আছে অনেক সত্য, যা হয়তো সামনে আসবে না কখনো। বিচার নয়, প্রদর্শনী? ইরানের বিচার বিভাগ স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, আন্দোলনকারীদের ‘দ্রুত ও জনসমক্ষে’ বিচার করা হবে। এরই মধ্যে রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত হচ্ছে ‘স্বীকারোক্তি’, যেগুলো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে জোর করে আদায় করা। বিচারপতি মোহসেনি এজেই বলেছেন, ‘যদি কাউকে শাস্তি দিতে হয়, তা এখনই দিতে হবে। এক মাস পর দিলে সে প্রভাব থাকবে না।’ এ বক্তব্য বিচার নয়, বরং ভয় দেখানোর ভাষা বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া—দুই মেরু, দুই গল্প: ইসরায়েল স্পষ্টভাবে ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভায় ইরানে হস্তক্ষেপের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি একযোগে নিন্দা জানিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে কাতার উত্তেজনা প্রশমন করতে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান আলাদা—তারা বলছে, এটা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়, বাইরের হস্তক্ষেপ অগ্রহণযোগ্য। জাতিসংঘও হতাহতের ঘটনায় ‘বিস্মিত’ বলে জানিয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। তেহরান কি টিকে থাকবে: বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষমতাসীন শাসন ব্যবস্থা এখনো দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। সেনাবাহিনীর মধ্যে কোনো বিদ্রোহ বা ভাঙনের ইঙ্গিত নেই। রেভল্যুশনারি গার্ড এবং বাসিজ বাহিনী, প্রায় ১০ লাখ সদস্যের নিয়ন্ত্রণে থাকা শক্ত কাঠামো ভেঙে না পড়লে সরকার পতনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নীতি-পরামর্শক ভালি নাসর বলছেন, এই আন্দোলন সফল হতে হলে দুটি জিনিস ঘটতে হবে—এক, দীর্ঘস্থায়ী রাস্তায় উপস্থিতি; দুই, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ফাটল। ইরান ঘিরে চলমান পরিস্থিতি কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়—এটি এখন এক বহুরাষ্ট্রীয়, বহুকৌশলিক সংঘাত। টুইট, ট্যাংক, ট্রাইব্যুনাল—সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের এক অনিশ্চিত ম্যাপ তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, নীতিগতও—কে ঠিক, কে ভুল, নাকি উভয়ই নিজের মতো করে বিপজ্জনক?

বর্ণমালা টেলিভিশন এর সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

[TheChamp-FB-Comments]
ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
পরিকল্পিত অর্থনৈতিক স্থবিরতা (স্ট্যাগফ্লেশন) এবং মহা অস্বীকৃতি ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন: আওয়ামী লীগকে নিয়েই অবাধ নির্বাচন ও পুনর্মিলনের আহ্বান মানুষের পেটে ভাত নেই, ৭০% ছাড় দিয়েও বিক্রি হচ্ছে না জামা-কাপড়: ব্যবসা নেমেছে এক-তৃতীয়াংশে কেরানীগঞ্জে নিজ ফ্ল্যাটে আওয়ামী লীগ নেত্রী ডালিয়াকে জবাই করে হত্যা এখনই ১৮৩৭ টাকার সিলিন্ডার কিনছে ভোক্তারা ২৫০০-তে, নতুন প্রস্তাবে দাম ছাড়াতে পারে ৪ হাজার সাভারে মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ: শিক্ষক স্বামীকে সহায়তাকারী স্ত্রী গ্রেপ্তার ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা হুজুরের, মাদ্রাসা ভাঙচুর করে আগুন দিলেন এলাকাবাসী নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মনপুরায় রাজনৈতিক প্রভাবে মা ইলিশ শিকারের মহোৎসব টেকনাফে পাহাড়ে ৩ দিন নির্যাতন: ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণে বাড়ি ফিরলেন যুবক পটিয়ায় ছিনতাই হওয়া ২৮৪ বস্তা চিনি চকরিয়া থেকে উদ্ধার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে: নাহিদ ইসলাম বিশ্বের শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ ৪৫তম ফরিদপুরে বাস-অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩ রিকশাচালক হাফিজুল হত্যা মামলায় রিমান্ড শেষে কারাগারে দীপু মনি ফের দ্রুততম মানব-মানবী ইমরান-শিরিন, টাইমিং নিয়ে প্রথম দিনেই বিতর্ক নাটোরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ১২ জন্মদিন উদযাপনে যাওয়ার পথে নেতানিয়াহুর গাড়িবহরে হামলা দেশে হামের উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মূলত ‘পরজীবী’ সম্পর্কের উদাহরণ: আরাগচি ‘আমাকে হুমকি দিয়ে দমিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখো না’