সেই নারীকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণের দায় স্বীকার ২ জনের

9 October 2020, 10:47 AM
বাংলাদেশ

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাশপুরের বাড়িতে ঢুকে এক নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করার দায় স্বীকার করেছে গ্রেফতার এগারোজনের মধ্যে দুইজন। শুধু ভিডিও ধারণই নয়, সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার দায়ও তারা স্বীকার করেছে। ভিডিও ছেড়ে দেয়ার আগে তারা অনেকবার ওই নারীকে কুপ্রস্তাব দিয়েছিল বলে জানিয়েছে। নতুন করে সবুজ নামের আরও এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই। এই নিয়ে এ মামলায় এগারো আসামি গ্রেফতার হলো। এ ঘটনায় গ্রেফতার আসামি কালামকে তিন মামলায় ১০ দিন আর শাহেদকে এক মামলায় ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। এদিকে সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবারও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বিক্ষোভ করেছে। নোয়াখালীর ওই ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ ব্যাপারে ওই নারী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গত ২ সেপ্টেম্বর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে স্ত্রীর পিতার বাড়িতে যান ওই নারীর স্বামী। ওইদিন রাত ৯টার দিকে আচমকা শোবার ঘরের দরজা ভেঙ্গে ঢুকে একদল দুর্বৃত্ত। তাদের মধ্যে বাদল, রহিম, আবুল কালাম, ই¯্রাফিল হোসেন, সাজু, সামছুদ্দিন সুমন, আবদুর রব, আরিফ ও রহমত উল্লাহকে তারা চিনতে পারে। বাকিদের চিনতে পারেনি। তারা তার স্বামীকে মারধর করে পাশের কক্ষে নিয়ে আটকে রাখে। এক পর্যায়ে ধর্ষণের চেষ্টাকারীরা ওই নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। তাতে ব্যর্থ হয়ে ওই নারীকে বিবস্ত্র করে মারধর করে। সেই সঙ্গে চলে ধর্ষণের চেষ্টা। ধর্ষণে বাধা দেয়ায় আসামিরা তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। মোবাইল ফোনে ওই নারীর বিবস্ত্র করা ছবি ভিডিও করে। এ সময় তার আত্মচিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে গেলে আসামিরা কাউকে কিছু জানালে ওই নারীকে হত্যার হুমকি দিয়ে চলে যায়। আসামিরা চলে যাওয়ার পর কাউকে কিছু না জানিয়ে নির্যাতিতা নারী জেলা শহর মাইজদীতে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে থাকা অবস্থায় আসামিরা মুঠোফোনে তাকে কুপ্রস্তাব দিতে থাকে। প্রস্তাবে রাজি না হলে অশ্লীল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। এক পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুঠোফোনে ধারণকৃত ভিডিও ছড়িয়ে দেয়। ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ার পর সারাদেশে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় উচ্চ আদালত বিটিআরসিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে মামলার আলামত হিসেবে এককপি রেখে বাকি সব মুছে ফেলার নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় ওই নারী বাদী হয়ে ৪ সেপ্টেম্বর ২টি মামলা করেন। পরে দেলোয়ার ও কালাম নামের আরও দুইজনকে আসামি করে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন বেগমগঞ্জ মডেল থানায়। মামলা দায়েরের পর শুরু হয় আসামিদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান। একে একে এগারো জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মোঃ আলমগীর হোসেন জনকণ্ঠকে জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মামলার আসামি ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগ ও রহিমকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তারা পুলিশের কাছে আদালতে গিয়ে ঘটনার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে রাজি হয়। এ জন্য তাদের আদালতে পাঠানো হয়। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই দুইজনই আদালতে পুরো ঘটনার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নোয়াখালীর চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ৩নং আমলী আদালতের বিচারক মুসফিকুল হকের খাস কামরায় ঘটনার দায় স্বীকার করে সোহাগ মেম্বার ও রহিম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। অন্যদিকে একই আদালতে এ মামলার গ্রেফতারকৃত আসামি কালামকে তিন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে এবং শাহেদকে এক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে সোপর্দ করে পুলিশ। পুলিশের রিমান্ডের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত কালামকে তিন মামলায় ১০ দিন আর শাহেদকে এক মামলায় ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বলে সরকারী কৌঁসুলি এ্যাডভোকেট গুলজার আহমেদ জুয়েল জানান। এদিকে বৃহস্পতিবার ভোরে নোয়াখালীতে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের মামলার আসামি সামছুদ্দিন সুমনকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নোয়াখালী ও হবিগঞ্জ জেলা পিবিআইয়ের একটি বিশেষ টিম রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চলের ত্রিপুরা পল্লী থেকে তাকে গ্রেফতার করে। পিবিআই জানায়, সুমন রেমা-কালেঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। সে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হবিগঞ্জ পিবিআইয়ের পরিদর্শক মুক্তাদির হোসেন। তিনি জানান, সে ভারতে পালিয়ে যেতে ত্রিপুরা পল্লীতে আশ্রয় নিয়েছিল। বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই নারীর বাড়ি পরিদর্শন করেন নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক খোরশেদ আলম। এ সময় ওই নারীর পিতা নুর ইসলাম কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জীর্ণ শীর্ণ বসতঘরের সামনে দাঁড়িয়েই জেলা প্রশাসককে তার মেয়ের নির্মম নির্যাতনের বিচার দাবি করেন। পাশাপাশি তার মেয়ে যেন সুন্দরভাবে সমাজে বসবাস করতে পারেন সে ব্যবস্থা করে দেয়ার অনুরোধ জানান। তিনি আরও বলেন, তারা দেলোয়ার বাহিনীর অব্যাহত তা-বে অসহায় হয়ে পড়েছেন। দেলোয়ারের লোকজন আমাকেও বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়েছে। ইতোপূর্বে দেলোয়ার বাহিনীর লোকজন তার বসতঘরসহ দোকানপাটে হামলা চালিয়ে ক্ষতিগস্ত করেছে। এতে তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। এর আগে বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে একলাশপুর ইউনিয়ন পরিষদ অডিটরিয়ামে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে এখলাশপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদর সভাপতিত্ব করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী জেলা প্রশাসক খোরশেদ আলম খান, বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুন্নাহার, উপজেলা প্যানেল চেয়ারম্যান নুর হোসেন মাসুদ, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ঊর্মী আক্তার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। সভায় বক্তারা দোষীদের ফাঁসি নিশ্চিত করার দাবি জানান। এদিকে বৃহস্পতিবার ঢাকার সেগুন বাগিচা শিল্পকলা একাডেমির গেটের সামনে বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ ধর্ষণ, নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সমাবেশ করে। অবস্থান কর্মসূচীতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি হাসান আরিফ বলেন, দ্রুত বিচার আইনে ধর্ষকদের শাস্তির বিধান করতে হবে। এ লক্ষ্যে সংসদে আইন প্রণয়ন করতে হবে। রাষ্ট্রের পাশাপাশি ধর্ষণ প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সোচ্চার হতে হবে। শুধু তাই নয়, শিল্পের শক্তি দিয়ে এই অপকর্মের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। কারণ সমাজে সবসময়ই সংস্কৃতিচর্চার একটা প্রভাব থাকে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে অনেকেই সরকারের পতন চাইছে। কিন্তু আমরা সরকারের পতন চাই না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এই সরকারকে আমরা সমর্থন করি। আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া মানে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের সরকারকে ক্ষমতায় আনা। তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এ সরকারের জন্য সংস্কৃতিকর্মীরা আন্দোলন করেছে। তবে সরকারকেও মানুষের মনের ক্ষোভ অনুধাবন করতে হবে। পথনাটক পরিষদের সভাপতি মান্নান হীরা বলেন, দেশের এই অবস্থার জন্য দায়ী রাষ্ট্র ব্যবস্থা। দেশে ‘আপোস’ ও ‘ভয়’-এর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। দলীয় রাজনীতি এই দুর্বৃত্তদের সঙ্গে আপোস করছে, তারা ক্ষমতাসীন নেতাদের আশ্রয়ে দেশে ভয়ের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে। পরিষদের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ বারী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষকদের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসছে। এ ধরনের তৎপরতা আরও বেশি ভীতি ছড়াচ্ছে এবং অপরাধকে উসকে দিচ্ছে। তাই ধর্ষকদের মদদদাতাদের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমরা আস্থা রাখি। আমরা আশাকরি ধর্ষণ প্রতিরোধে তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন। মঞ্চশিল্পী নূনা আফরোজ বলেন, ধর্ষকদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। আর সেই শাস্তি এমন হতে হবে যেন এ ধরনের অপরাধ ঘটাতে অন্যরাও ভয় পায়। এছাড়া এ ধরনের অপরাধ প্রতিহতে সংস্কৃতিচর্চা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। যাতে শিশুকাল থেকে আমাদের সন্তানরা নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে। এছাড়াও প্রতিবাদী কর্মসূচীতে বক্তব্য রাখেন গণসঙ্গীত শিল্পী ও গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ফকির আলমগীর, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সহসভাপতি ঝুনা চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদ, নাট্যকার রতন সিদ্দিকী, নাট্যকর্মী শামীমা শওকত লাভলী, মিজানুর রহমান প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন পথনাটক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহাম্মেদ গিয়াস। বক্তব্য প্রদান শেষে সন্ধ্যায় প্রতিবাদী আলোর মিছিল বের হয়। এদিকে বৃহস্পতিবারও ধর্ষণ ও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে শাহবাগে বিক্ষোভ করে নারী, শিশু ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী জোট। সমাবেশে এসব কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক প্রগতি বর্মণ তমা। বিক্ষোভ থেকে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের মতোই হাত-পা, শারীরিক কাঠামো থাকলেই মানুষ হওয়া যায় না। থাকতে হয় মনুষ্যত্ব, মানবিকবোধ। সেটা নেই বলেই ধর্ষক দেলোয়াররা গ্রেফতারের পর হাজতে গিয়েও হাসতে পারে। এ রকম মনুষ্যত্বহীন সব দেলোয়ারকে রুখে দিতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্ষক নিপীড়কদের ঠাঁই হবে না।


Logo