পাঠ্যবইয়ের কাগজে টনপ্রতি ২২ হাজার টাকার কারসাজি: সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিল ৫৫ কোটি টাকা

৭ November, ২০২৬ | ৮:২৫ PM
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

মানসম্মত কাগজ বাতিল, নিম্নমানের কাগজে দ্রুত অনুমোদন—পাঠ্যবই ছাপায় সিন্ডিকেটের দাপট


❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য বিএইচএল পেপার মিলস লিমিটেড থেকে কাগজ কিনে নিজের ছাপাখানায় আনেন মহানগর প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন। তার কেনা কাগজ এনসিটিবির নির্ধারিত মান পূরণ করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু কাগজ ছাপাখানায় পৌঁছানোর পরপরই বিষয়টি পাঠ্যবই ছাপানোকে ঘিরে থাকা ‘শক্তিশালী সিন্ডিকেটের’ মূল হোতার কাছে পৌঁছে যায়। আধা ঘণ্টার মধ্যেই তিনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একটি দলকে সেখানে পাঠান। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এনসিটিবির দল কাগজগুলোকে পাঠ্যবই ছাপার অনুপযোগী বলে জানায়। ফলে ট্রাকে করে সেগুলো ফেরত পাঠাতে বাধ্য হন গিয়াস উদ্দিন। পরে সিন্ডিকেটের মূল হোতার প্রতিষ্ঠান—যেটি কাগজ বিক্রির এজেন্ট হিসেবেও কাজ করে—সেখান থেকে আগের চেয়ে নিম্নমানের কাগজ কিনে দ্রুত অনুমোদন পান তিনি। এ জন্য টনপ্রতি তাকে অতিরিক্ত ২২ হাজার টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ।

পড়ুন: এনসিটিবিতে দুর্নীতির পাহাড়: এক বছরে ২৭১১ কোটি টাকার মহালুটপাট

পড়ুন: আবারও পাঠ্যবই ছাপা হচ্ছে নিম্নমানের কাগজে! বাধার মুখে এনসিটিবির দায়িত্বশীলরা

পড়ুন: বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণে কারসাজি: এক বছরেই রাষ্ট্রের ৬৫৯ কোটি টাকা লুটে নিলো সিন্ডিকেট

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এনসিটিবির কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ওই সিন্ডিকেট মিলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপে রেখে এবার ছাপাখানাগুলোকে ২৫ হাজার টন কাগজ কিনতে বাধ্য করেছে। এই হিসাবে সিন্ডিকেটের বাড়তি আয় হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। এনসিটিবির পাঠ্যবই পরিদর্শনের দায়িত্ব পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, গিয়াস উদ্দিন প্রথমে যে কাগজ কিনেছিলেন, তা পরীক্ষা করে সঠিক মানের পাওয়া যায়। তারপরও অজানা কারণে এনসিটিবি সেটি অনুমোদন করেনি। জানা গেছে, সিন্ডিকেটের সরবরাহ করা কাগজের বাজারমূল্য টনপ্রতি ১ লাখ ৩ হাজার টাকা হলেও অনেক ছাপাখানাকে তা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে। প্রতি বছর পাঠ্যবই ছাপাতে প্রায় ৮০ হাজার টন কাগজ লাগে। এবারও এই পুরো পরিমাণ কাগজের অনুমোদন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সিন্ডিকেটটি বলে অভিযোগ।

পড়ুন: ব্যর্থতা-দুর্নীতির খতিয়ান: শিক্ষার্থীদের হাতে ২৯ ছাপাখানার নিম্নমানের পাঠ্যবই, ছিঁড়ে যাচ্ছে কাগজ

পড়ুন: পাঠ্যপুস্তক কেলেঙ্কারি: ৩৫৫ কোটি টাকা লুটে নিল ১৭টি ছাপাখানা!

পড়ুন: ছাপাখানার সাথে গোপন আঁতাতে শিশুরা পেল ৮ কোটি নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তক

তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ থাকা কয়েকটি ছাপাখানার মালিকের কারণে তারা সবার ক্ষেত্রে তা করতে পারেনি। শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে একটি ছাপাখানা ৯০০ টন কাগজের অনুমোদন পায়। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ‘ফ্রেশ পেপার’ ব্র্যান্ডের কাগজ অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছিল। কাগজের মান ভালো হওয়া সত্ত্বেও অনুমোদন আটকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। ছাপাখানার মালিক বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রীকে জানান। এরপর শিক্ষামন্ত্রী এনসিটিবির কর্মকর্তাদের ডেকে বলেন, কাগজের মান ঠিক থাকলে যেন অনুমোদন দিতে কোনো বাধা না থাকে। ফলে ওই ৯০০ টন কাগজকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেট ‘অনুমোদন বাণিজ্য’ করতে পারেনি। এদিকে, কয়েকটি ছাপাখানা চীন থেকে উচ্চমানের কাগজ এনে বই ছাপাচ্ছে। ছাপানো ২ লাখ পাঠ্যবইকে কাগজে-কলমে আড়াই লাখ দেখিয়ে অনুমোদন দিতে রাজি না হওয়ায় এনসিটিবির এক পরিদর্শন-এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের মালিককে চোখ উপড়ে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক ঘটনাটি নিশ্চিত করে বলেন, “ঐ ছাপাখানার লোক আমার বাসায় গিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে।” তিনি বিষয়টি এনসিটিবির একজন সদস্যকে জানিয়েছেন। সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

পড়ুন: পাণ্ডুলিপি ফাঁস, পাঠ্যবইয়ের আগেই গাইড বই ছাপানোর হিড়িক!

পড়ুন: পাঠ্যবইয়ে অজ্ঞাত পরিচয় জুলাই শহীদের নাম, চেনে না কেউ

পড়ুন: নিষিদ্ধ প্রেসে ছাপানো হচ্ছে পাঠ্যবই: পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর ক্ষেত্রে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ

সাধারণত নতুন বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হয়। এবার অবশ্য শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই বই বিতরণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনই ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আগামী ২৪শে ডিসেম্বর বই পাবে। মাধ্যমিক স্তরের বইও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। দেশে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। মাতুয়াইলের ১০টি ছাপাখানা ঘুরে দেখা গেছে, পাঠ্যবই ছাপার কাজ একটানা চলছে। মেশিনের শব্দ আর কাগজ-কালির মিশ্র গন্ধে মুখর পুরো এলাকা। একদিকে বই ছাপানো হচ্ছে, অন্যদিকে চলছে কাটিং, বাঁধাই ও প্যাকেটজাত করার কাজ। এনসিটিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের ৯৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে। ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরে ছাপার অগ্রগতি ৭২ দশমিক ১৩ শতাংশ। আগামী ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে সব বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনসিটিবি। কাজের অগ্রগতি বাড়াতে নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।

পড়ুন: পাঠ্যপুস্তক ছাপার প্রাক্কলিত দর ফাঁস, সমঝোতায় কাজ ভাগ-বাটোয়ারা, অতিরিক্ত ব্যয় ২৫২ কোটি টাকা

প্রাথমিক স্তরের বই পরিদর্শনের দায়িত্ব পাওয়া ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজীম মুনির জানান, প্রাক-প্রাথমিকের সব বই ছাপা শেষ হয়েছে। প্রথম শ্রেণির ৯৮ দশমিক ২২ শতাংশ, দ্বিতীয় শ্রেণির ৯৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, তৃতীয় শ্রেণির ৯৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, চতুর্থ শ্রেণির ৯৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণির ৯৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের বই পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ বেলাল হোসাইন জানান, ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৯৬ দশমিক ০৭ শতাংশ বই ছাপা শেষ হয়েছে। মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণির ৯২ দশমিক ১৮ শতাংশ, সপ্তম শ্রেণির ৯২ দশমিক ৩৭ শতাংশ, অষ্টম শ্রেণির ৬৬ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং নবম-দশম শ্রেণির ২৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ বই ছাপানো হয়েছে। ছাপার যে গতি রয়েছে, তাতে ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে সব বই ছাপানো শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন শেখ বেলাল হোসাইন। তার দাবি, এবার বই ছাপার কাজে নির্ধারিত মান বজায় রাখা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো মানের বই পাবে। উল্লেখ্য, কার্যাদেশ ও চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার কাজ শুরু হয় প্রাথমিক স্তরের কাজ শুরুর প্রায় এক মাস পরে। এ কারণেই মাধ্যমিকের বই ছাপার অগ্রগতি প্রাথমিকের তুলনায় কম। বই ছাপার কাজ দ্রুত শেষ করতে ৩২টি প্রেসকে চিঠি দিয়ে তাগাদা দিয়েছে এনসিটিবি। বইয়ের মান যাচাইয়ে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ৫৩টি পর্যবেক্ষক দল কাজ করছে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু গতকাল বলেন, নির্ধারিত রোডম্যাপ অনুসারেই বই সরবরাহ করা হচ্ছে।