বাংলাদেশ নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা তদন্তের দাবি, ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর Newsmax-এ বিশেষ কলাম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ২০২৪ সালের আন্দোলন এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম Newsmax-এ প্রকাশিত এক বিশেষ কলামে। গত ৩ নভেম্বর প্রকাশিত ‘What Did Biden’s State Department Know About Bangladesh?’ শীর্ষক নিবন্ধে লেখক অ্যাডেল নাজারিয়ান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। গত ১৯ অক্টোবর ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে সেন্টার ফর ইউএসএ-বাংলাদেশ রিলেশনসের আয়োজনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পরিপ্রেক্ষিতে কলামটি লেখা হয়েছে। এতে শেখ হাসিনার ছেলে ও সাবেক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আটক, হলি আর্টিজান হামলার দণ্ডপ্রাপ্তদের মুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কলামটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, লেখক শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেননি; বরং যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসকে বাইডেন আমলের অনুদান, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বাংলাদেশবিষয়ক নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের নথি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
দূতাবাসকর্মী হত্যার দণ্ডপ্রাপ্তদের মুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
কলামে সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। লেখকের সঙ্গে কথোপকথনে জয় দাবি করেন, বাংলাদেশে একজন মার্কিন দূতাবাসকর্মী হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের চাপের মুখে তৎকালীন সরকার হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে বিচারের মাধ্যমে সাজা নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন ওই হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য মার্কিন কংগ্রেসকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম, আদালতের রায়, মুক্তির অনুমোদনকারী নির্বাহী আদেশ এবং ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মূল্যায়ন সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছেন লেখক। এ বিষয়ে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন—দূতাবাসকর্মী হত্যার ঘটনায় যাদের বিচারের মাধ্যমে দণ্ডিত করা হয়েছিল, তাদের মুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটন অবগত ছিল কি না এবং মার্কিন কর্মকর্তারা এ নিয়ে কোনো আপত্তি জানিয়েছিলেন কি না। জয় আরও অভিযোগ করেন, ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে মুক্তি পেয়েছেন। লেখক এই অভিযোগেরও নথিভিত্তিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। ।শেখ হাসিনার পতনে বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের আহ্বান
কলামটির সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক অংশে সজীব ওয়াজেদ জয় অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পেছনে বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা ছিল। তাঁর দাবি, USAID-এর অর্থায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বিভিন্ন গণতন্ত্রবিষয়ক সংস্থার কার্যক্রম আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সংগঠিত করতে সহায়তা করেছিল। তবে লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও উল্লেখ করেছেন। কোনো মার্কিন অনুদান বা প্রকল্পের অস্তিত্ব থাকলেই প্রমাণ হয় না যে ওয়াশিংটন সরাসরি কোনো সরকারবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করেছে। কিন্তু মার্কিন করদাতাদের অর্থ কোন সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল, সেই অর্থ কী কাজে ব্যবহৃত হয়েছে এবং মার্কিন কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন—এসব তথ্য জানার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এ বিষয়ে কংগ্রেসের কাছে বাইডেন আমলের USAID অনুদানের নথি এবং বাংলাদেশের বিষয়ে মার্কিন কূটনীতিকদের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া যোগাযোগের রেকর্ড চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, বাইডেন হোয়াইট হাউস ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। সজীব ওয়াজেদ জয়ের অভিযোগ এবং মার্কিন প্রশাসনের অস্বীকৃতি—দুটি বিষয়ই কলামে উল্লেখ করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য? কলামটিতে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরা হয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিভাগে তাঁর সঙ্গে আলোচনার সময় কর্মকর্তারা জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু একই দপ্তরের রাজনৈতিক বিষয়ক বিভাগ দলটিকে বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করছে এখন। লেখক স্পষ্ট করেছেন, এটি জয়ের ব্যক্তিগত কথোপকথনের বিবরণ; যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় জামায়াতকে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো প্রমাণ নয়। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তারা জামায়াত বা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগ জানিয়েছিলেন কি না, সেই উদ্বেগ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছেছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন—এসব বিষয় কংগ্রেসের তদন্তের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন নাজারিয়ান। শেখ হাসিনা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিও স্বীকার কলামটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, লেখক শেখ হাসিনা সরকারের আমলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উপেক্ষা করেননি। তিনি উল্লেখ করেছেন, জাতিসংঘের তদন্তে ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনা সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর পদ্ধতিগত দমন-পীড়নের প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সজীব ওয়াজেদ জয়ও ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কিছু অংশের হস্তক্ষেপের কথা স্বীকার করেছেন বলে কলামে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের বক্তব্য, শেখ হাসিনার শাসনামলে যারা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একইভাবে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর যারা রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তাদেরও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ, লেখক বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে শুধু আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন হিসেবে দেখেননি; বরং অতীত ও বর্তমান—উভয় সময়ের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে এনেছেন। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মামলা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পদক্ষেপ শুরুর আহ্বান কলামের শেষাংশে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আটক ও বিচারপ্রক্রিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এবং উন্মুক্ত বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ দিতে পারেন। একই সঙ্গে তাঁর আটক অব্যাহত রাখার আইনি ভিত্তি সম্পর্কে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। এখানে লেখকের মূল বক্তব্য হলো, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত কথার বাইরে গিয়ে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া। কলামের শেষ প্রশ্নটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। লেখক স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, একসময় যুক্তরাষ্ট্র নিজের দূতাবাসকর্মীর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে বাংলাদেশের সরকারের ওপর চাপ দিয়েছিল। এখন সেই ব্যক্তিরা মুক্তি পেয়েছেন কি না, তা জানার জন্যও ওয়াশিংটনের যথেষ্ট আগ্রহ থাকা উচিত। লেখক অ্যাডেল নাজারিয়ান: সংক্ষিপ্ত পরিচিতি Adelle Nazarian
