ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীর মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় তৈরি পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতির কারণে একাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ এবং বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুরে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় শ্রমিকদের অবস্থানের পর মিরপুর-১১, মিরপুর-১২ ও প্রশিকা মোড় এলাকাতেও সড়ক অবরোধ করা হয়।
শ্রমিকদের প্রধান দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। তাদের অবরোধের কারণে এসব এলাকায় যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং আশপাশের সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জালাল উদ্দিন জানান, বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১২ এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছেন। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর ট্রাফিক বিভাগও এসব এলাকায় যান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
আশুলিয়ায় সংঘর্ষ, ২৫ কারখানায় ছুটি
এদিকে সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে কাঠগড়া, জিরাব, নরসিংহপুর ও আমতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়।
শ্রমিকদের দাবির মধ্যে রয়েছে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, অযৌক্তিকভাবে শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্ট করা বন্ধ এবং ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্বাসন।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শিল্প পুলিশের ছয় সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। আহত পুলিশ সদস্যদের একজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে দ্য ডেইলি স্টার।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কারখানায় ভাঙচুরসহ অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৫টি তৈরি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে কারখানার সংখ্যা প্রায় ৩০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংঘাতের মধ্যেই বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নিউ এইজ কারখানার সামনে থেকে হাতবোমাসদৃশ তিনটি বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো কারা সেখানে রেখেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।
শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে মজুরি বোর্ড গঠন নিয়ে ক্ষোভ
শ্রমিক সংগঠনগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবি দীর্ঘদিনের। এর পাশাপাশি শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্ট করা, অন্যায্যভাবে চাকরিচ্যুত করা এবং ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার্স ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী অক্টোবরের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ কারণে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শুক্রবার রাতে শ্রম মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আগামী রোববারের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানানো হয়েছে। তবে বৈঠকের সিদ্ধান্ত বা এ-সংক্রান্ত বার্তা শ্রমিকদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছায়নি বলে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
শিল্প উৎপাদন ও জনজীবনে প্রভাবের আশঙ্কা
একই দিনে রাজধানী ঢাকা ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আশুলিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে একাধিক কারখানা বন্ধ থাকা এবং শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে, মিরপুরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতেও ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাসংক্রান্ত দাবির পাশাপাশি শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।