২০ মাস ধরে বন্ধ আশুগঞ্জ সার কারখানা, রাষ্ট্রীয় ক্ষতি আড়াই হাজার কোটি টাকা
জ্বালানি সংকটে প্রায় ২০ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (এএফসিসিএল) ইউরিয়া উৎপাদন। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১১০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, উৎপাদন বন্ধের কারণে বিক্রয়মূল্য বিবেচনায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি। একই সঙ্গে বাড়ছে পরিচালন ব্যয় ও সার আমদানির ওপর নির্ভরতা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত কারখানাটিতে ১৯৮৩ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে দৈনিক সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ১৬০০ টন। বর্তমানে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে দৈনিক ১১০০ থেকে ১১৫০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করা সম্ভব। তবে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে গ্যাস রেশনিংয়ের কারণে কারখানাটি বছরের ছয় থেকে নয় মাস বা তারও বেশি সময় বন্ধ থাকছে। কোনো কোনো বছর পুরো সময়ই উৎপাদন বন্ধ থাকার নজির রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের মার্চ থেকে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কারখানার উৎপাদনক্ষমতা অনুযায়ী, গত ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত সাড়ে ১৯ মাসে প্রায় ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৫০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। প্রতি টন ইউরিয়ার বিক্রয়মূল্য ৪৮ হাজার টাকা ধরে এর পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে এটি সম্ভাব্য উৎপাদনের বিক্রয়মূল্যভিত্তিক হিসাব, সরাসরি নিট লোকসানের হিসাব নয়। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় টনপ্রতি উৎপাদন খরচও বেড়েছে। গত ১০ বছরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কারখানাটি ২০০ দিন বন্ধ ছিল এবং টনপ্রতি উৎপাদন খরচ ছিল ১২ হাজার টাকার বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৯৬ দিন বন্ধ থাকায় খরচ বেড়ে ২৬ হাজার টাকার বেশি হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৮৪ দিন বন্ধ থাকায় টনপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ৩৩ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪১ হাজার টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭১ হাজার টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৫৬ দিন বন্ধ থাকায় টনপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়ে ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা হয়। কারখানাটি ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত লাভজনক ছিল। পরের অর্থবছর থেকে লোকসান শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন বছরে কারখানাটির লোকসান হয়েছে। গত ১০ বছরে মোট লোকসানের পরিমাণ ১১০০ কোটি টাকার বেশি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় কারখানার যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতীতে দীর্ঘ বিরতির পর গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে উৎপাদন চালু করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে আবার উৎপাদন শুরু করতে গেলে বাড়তি জটিলতা তৈরি হতে পারে। কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক মো. আবু কাউছার বলেন, গ্যাস রেশনিংয়ের নামে উৎপাদন বন্ধ থাকায় একসময় লাভজনক কারখানাটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে সার আমদানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। সিবিএর সিনিয়র সহসভাপতি মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, কারখানাটি চালু থাকলে প্রতিদিন কমপক্ষে ১১৫০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করা সম্ভব। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয় এবং শ্রমিকেরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এ কারণে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী শেখ মো. আলী আশরাফ বলেন, কারখানায় গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
