আইনবহির্ভূত প্রক্রিয়ায় অস্ত্র হাতে ইশরাকের অভিযান নিয়ে তীব্র সমালোচনা

১৮ October, ২০২৬ | ১২:০৫ AM
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় হাতে পিস্তল নিয়ে প্রকাশ্য মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। এই অভিযানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই একজন জনপ্রতিনিধির এই ধরনের ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এখতিয়ার নিয়ে দেশজুড়ে জোর আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। আজ ১৭ই অক্টোবর, শনিবার গেন্ডারিয়ার রেললাইনসংলগ্ন একটি বস্তিতে এই বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ সময় মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে সন্দেহভাজন ছয়জনকে আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। পরবর্তীতে অভিযানটির একটি ভিডিও ক্লিপ তিনি নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও প্রকাশ করেন। তবে প্রকাশিত সেই ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীকে নিজ হাতে পিস্তল নিয়ে অভিযানে অংশ নিতে দেখা যাওয়ায় শুরু হয় যত বিপত্তি। যদিও ভিডিওর ওই অংশে অস্ত্রটি ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছিল, তবুও অস্ত্রটির ধরন, সেটি তার নামে বৈধ কি না কিংবা অভিযানের সময় কোনো ধরনের শক্তিপ্রয়োগ করা হয়েছিল কি না—তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এ বিষয়ে সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমিনুল হক পলাশ জানান, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ণ ও ব্যবহার নীতিমালায় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য প্রদত্ত লাইসেন্সের অধীনে ক্রয়কৃত আগ্নেয়াস্ত্র আত্মরক্ষা ব্যাতীত অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।। ইশরাক হোসেন যেভাবে ব্যক্তিগত অস্ত্র দেখিয়ে ভীতি প্রদর্শন করেছেন, সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর ফলে বাতিল হওয়ার কথা তার লাইসেন্সও। কিন্তু যেহেতু দেশে আইনের শাসন নেই, তাই তার বিরুদ্ধে এমন কোনো শাস্তি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এদিকে, ইশরাক হোসেনের মিডিয়া সেল জানিয়েছে, ঢাকা-৬ আসন সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এই ধরনের অভিযান নিয়মিত চলবে। এমন আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অভিযানকে বৈধতা দিয়ে উল্টো প্রতিমন্ত্রী জানান, মাদক কারবারিরা যতই প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক দলের হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি নিজের দলের কেউ এই অপরাধে জড়িত থাকলেও তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী আরও দাবি করেন, দীর্ঘ ছয় মাস ধরে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। মাদকের ভয়াল গ্রাসে যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তিনি শুধু নিজের এলাকা নয়, দেশব্যাপী এমন অভিযান পরিচালনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এদিকে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির গণমাধ্যমকে জানান, ছয়জনকে আটকের পর প্রতিমন্ত্রী থানায় যোগাযোগ করলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের থানায় নিয়ে আসে। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা সাদা পাউডারজাতীয় পদার্থ পরীক্ষার পরই সেটি হেরোইন কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, জনপ্রতিনিধি হয়েও প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে এমন অভিযানে অংশ নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক হাবিব উল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, একজন প্রতিমন্ত্রী কি এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে নিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন কি না। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মী ড. নাবিলা ইদ্রিস মন্তব্য করেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে জোর না দিয়ে মন্ত্রীর নিজেই অস্ত্র নিয়ে মাঠে নামা তার সাংবিধানিক পদের সঙ্গে কতটা মানানসই, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। একই সুরে সমালোচনা করেছেন ডাকসু নেতা মিফতাহুল মারুফও। উল্লেখ্য, এর আগেও ঢাকা-৬ আসনের বিভিন্ন স্থানে মাদকবিরোধী নানা কার্যক্রম চালিয়েছেন ইশরাক হোসেন। তবে এবারের অভিযানে প্রকাশ্যে অস্ত্র বহনের এই ঘটনাটি নতুন এক রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মাদকবিরোধী এই উদ্যোগ সাধুবাদ পেলেও জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের কাজের সীমারেখা নিয়ে এখন নানা মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।