একটির খরচে ৫টি নির্মাণের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল: ৩য় এলএনজি টার্মিনালে ব্যয় বৃদ্ধি ৩৫-৩৭ শতাংশ
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সকল মেগা প্রকল্প নিয়ে বিরোধীপক্ষের একটি সাধারণ সমালোচনা ছিল- একটির নির্মাণ ব্যয় দিয়ে ৫-১০টি নির্মাণ করা যেত। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। আর্থিক অনিয়ম হয়েছে এসব প্রকল্পে। কিন্তু ২০২৪-এর ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময় প্রকল্প ব্যয় সংকুলান করতে গিয়ে দেখা গেছে, একটির খরচে ৫-১০টি দূরে থাক, বরং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার ব্যয় থেকে প্রকল্প-বিশেষে ৩০-১৩০ শতাংশ অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। এমন নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এবার প্রস্তাবিত তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পুনঃগ্যাসীকরণ সেবার জন্য একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বর্তমান পরিশোধিত হারের চেয়ে ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি ফি দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মহেশখালীর কুতুবজোমে ৬০০ থেকে ৭৫০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার একটি অফশোর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) প্রস্তাব দিয়েছে। বিল্ড-ওন-অপারেট (বিওও) মডেলে ১৫ বছরের চুক্তির জন্য তাদের চাওয়া দৈনিক ফি ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার। বিওও মডেলে টার্মিনালের মালিকানা অনির্দিষ্টকাল ওই চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছেই থাকবে। আগের প্রস্তাবিত চুক্তিগুলোতে মূলত বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফার (বিওওটি) পদ্ধতি ছিল। সে মডেলে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে বিনা মূল্যে টার্মিনালের মালিকানা পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তরের শর্ত রাখা হয়েছিল। বর্তমানে চালু থাকা টার্মিনালগুলোর ফির সঙ্গে তুলনা করলে সিএনইইর প্রস্তাবিত অঙ্কটি বেশি। এক্সিলারেট এনার্জি দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার পায়, আর সামিট এলএনজি টার্মিনালের দৈনিক ফি ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার। সে হিসাবে সিএনইইর প্রস্তাব এক্সিলারেটের ফির চেয়ে প্রায় ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সামিটের ফির চেয়ে প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালের মার্চে সামিটের বাতিল হওয়া দ্বিতীয় এফএসআরইউর জন্য বিওওটি মডেলে পেট্রোবাংলা দৈনিক ৩ লাখ ডলার ফি নির্ধারণ করেছিল। নতুন বিওও চুক্তিতে প্রস্তাবিত দৈনিক ফি সেই অঙ্ককেও ছাড়িয়ে গেছে। চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত ফি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) ২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় সুপারিশ করা দৈনিক ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলারের বেঞ্চমার্ক হার থেকেও অনেক বেশি। বাতিল হওয়া সামিটের দ্বিতীয় এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পটি বিওওটি মডেলে করার পরিকল্পনা ছিল। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস বলছে, সামিট চুক্তিটি আবার চালু করার অনুরোধ জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১৫ বছর পর ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ), মুরিং ব্যবস্থা এবং সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মালিকানা বিনা মূল্যে পেট্রোবাংলার হাতে তুলে দেওয়া যেত। পেট্রোবাংলাকে পাঠানো সাম্প্রতিক এক চিঠিতে সামিট দৈনিক ফির পার্থক্য দেখিয়ে বলেছে, শুধু এই খাতেই ১৫ বছরে ২৩ কোটি মার্কিন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। দরকষাকষির একাধিক ধাপে সিএনইই তাদের প্রাথমিক প্রস্তাবের অঙ্ক কমিয়েছে। শুরুতে তারা দৈনিক ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৪ ডলার চেয়েছিল। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের দরকষাকষি কমিটি সরকারকে দুটি বিকল্প গ্রহণের সুপারিশ করেছে: বিওও মডেলে ১৫ বছরের জন্য দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার, অথবা ২০ বছরের জন্য দৈনিক ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলার। এই চুক্তির মোট আর্থিক বাধ্যবাধকতা প্রায় ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জাহাজ নির্মাণের সরঞ্জামের উচ্চমূল্যকে বাড়তি ফির কারণ হিসেবে দেখিয়েছে সিএনইই। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ছাড়া বিওও বা বিওওটি—কোনো ধরনের সিদ্ধান্তই অনুমোদন করা উচিত হবে না। তারা আরও বলেছেন, কোনো প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে এত বড় বিওও চুক্তি করা এবং অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও মাত্র ১৮ মাসে প্রকল্প শেষ করার প্রতিশ্রুতি—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্তটি নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে কাতার এনার্জি ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে। ফলে দেশে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। বাংলাদেশকে এখন স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি বেড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।
