ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে হত্যার নেতৃত্বে ছিল জামায়াতের নেতাকর্মীরা, বাড়ি-হাসপাতালে দু’দফা মব হামলা

১৫ October, ২০২৬ | ৮:১৪ PM
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে তুলে গণপিটুনিতে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছে তার পরিবার। সোমবার বাড়িতে হামলা ও মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফের হামলার পেছনে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা ছিল বলে দাবি স্বজনদের। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা। সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে দফায় দফায় হামলার শিকার হয়ে মারা গেছেন ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। মঙ্গলবার রাতে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে শামীমের বিরুদ্ধে লোকজনকে উসকে দেওয়া হয়। এরপর তার বাড়ি ও চিকিৎসাধীন অবস্থানে হামলা চালানো হয়। শামীমের ছোট ভাই তাওছিফ রহমান সাগর জানান, সোমবার প্রথমে তাদের বাড়িতে হামলা করা হয়। এ সময় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর একদল নেতাকর্মী লোকজন জড়ো করে হামলায় অংশ নেন। বাজারে থাকা জামায়াতের কার্যালয়ে সংগঠিত হয়ে সেখান থেকে লোকজন বাড়িতে হামলা চালাতে আসেন। সাগরের ভাষ্য, পারিবারিক কলহের সময় শামীমের বলা কিছু কথা রেকর্ড করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে ওই অডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে লোকজনকে তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলা হয়। একপর্যায়ে দলবদ্ধ লোকজন তাদের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। তবে স্থানীয় জামায়াত নেতা ও দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি কামরুল ইসলাম গাজী বাড়িতে হামলায় দলটির নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, শামীমের বাড়িতে স্ত্রীকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিরোধ হয়েছিল এবং আল্লাহ ও রাসুলের নামে কটূক্তির অভিযোগ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। গত সোমবার বাড়িতে হামলার পর রাতে শামীম বিষপান করেন। পরে তাকে স্থানীয় এক চিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হয়। চিকিৎসক তার অবস্থা শঙ্কামুক্ত বলে জানালেও পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু মঙ্গলবার বিকেলে ওই চিকিৎসকের চেম্বারেও দলবদ্ধ লোকজন হামলা চালায় জামায়াত কর্মীরা। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে শামীমকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এরপর সেখানেও তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে পুলিশ ও পরিবার। অবস্থার অবনতি হলে শামীমকে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম শাহীন জানিয়েছেন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীমের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম দফায় মারধরের খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলেও রাত সাড়ে আটটার দিকে উত্তেজিত জনতা ফের তার ওপর হামলা চালায়। শামীমের ছোট ভাই তাওছিফ রহমান সাগর জানিয়েছেন, শামীম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। কয়েক বছর আগে বাসে যাতায়াতের সময় অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ার পর থেকে তার আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। মাঝেমধ্যে তিনি মানসিকভাবে অসংলগ্ন আচরণ করতেন বলেও জানান সাগর। পরিবারের ভাষ্য, শামীমের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আইনগত প্রক্রিয়ায় তার বিচার হতে পারত। কিন্তু এভাবে গণপিটুনি দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। সাগর বলেন, উসকানিমূলক বক্তব্য বা অডিও ছড়িয়ে মানুষকে ক্ষুব্ধ করে পরিকল্পিতভাবে তার ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। মঙ্গলবার ফেসবুক পেজ থেকে একের পর এক ভিডিও প্রকাশ করে লোকজনকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান মো. ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তি। স্থানীয়ভাবে নিজেকে মুফতি পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্তেজনা ছড়ানো এবং মবের প্রতি উসকানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বিভিন্ন ভিডিওতে লোকজনকে ডাক দেন এবং একপর্যায়ে একদল মানুষকে নিয়ে মিছিল করতেও দেখা যায়। পরে মৃত শামীমের ছবি প্রকাশ করে উল্লাস প্রকাশের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন জানান, বিষয়গুলো পুলিশের নজরে এসেছে এবং তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন। বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। তবে ওই দিনের মধ্যেই পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শামীমের ছোট ভাই সাগর। শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় কারা সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছেন, কারা উসকানি দিয়েছেন এবং হামলার পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না—এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের দাবি উঠেছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থাকলেও কাউকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করার কোনো আইনি সুযোগ নেই, বলছেন মানবাধিকার কর্মীরা।