নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফাঁদে বাংলাদেশ, সামনে দীর্ঘ সংকট অপেক্ষমান

১৫ October, ২০২৬ | ৭:৫৯ PM
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

কাঠামোগত দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও সীমিত কর্মসংস্থানের চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে দেশের প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবসায়িক পরিবেশে কার্যকর সংস্কার এবং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে। এতে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অর্জনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। পরের অর্থবছরে তা আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে নামার আশঙ্কা রয়েছে। ২০৩০-৩১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৯৭ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে। একই সময়ে চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে সংস্থাটি। আইএমএফের এ পূর্বাভাস সরকারের মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের সঙ্গে বড় ব্যবধান তৈরি করেছে। গত আগস্টে প্রকাশিত সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোতে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ৪ শতাংশ। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রাক্কলনে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মূল্যায়নেও অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। এডিবির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, উচ্চ খেলাপি ঋণ, ব্যাংকগুলোর দুর্বল আর্থিক ভিত্তি ও উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন জটিলতা এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়াও নতুন বিনিয়োগের পথে বাধা তৈরি করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আইএমএফের পূর্বাভাস মূলত একটি ‘বেসলাইন সিনারিও’ বা ভিত্তিমূলক চিত্র। ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে ব্যর্থ হলে এ পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নিতে পারে। তিনি বলেন, “সংকটকে শুধুই বৈশ্বিক ঘটনার পরিণতি বলে চালিয়ে দেওয়া এক ধরনের ‘অর্ধ-সত্য’ ছাড়া কিছুই নয়।” তাঁর মতে, দেশের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সুশাসনের ঘাটতি অর্থনীতির দুর্বল পারফরম্যান্সের অন্যতম কারণ। ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার জরুরি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আইএমএফের অবনমিত পূর্বাভাস ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্থরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রতিফলন। সময়োপযোগী নীতির অভাব, সংস্কার বাস্তবায়নে অনীহা এবং সুদহারসংক্রান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সংকটকে গভীর করেছে। তিনি বলেন, “পরবর্তী পূর্বাভাস হয়তো কিছুটা ভালো বা খারাপ হতে পারে, তবে তাদের সর্বশেষ প্রাক্কলন পরিষ্কার বার্তা দেয় যে আমাদের অর্থনীতি দিন দিন দুর্বল থেকে আরও বেশি দুর্বল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।” ড. ফাহমিদা খাতুনের পরামর্শ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমাতে হবে। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে সরকারের উচিত প্রবৃদ্ধির পেছনে না ছুটে কেবল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দেওয়া। কারণ মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রাণান্তকর অবস্থা।” পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন কর্মসংস্থানের এক জটিল ফাঁদে আটকা পড়েছে। এর ফলে দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশের অতীত সাফল্য উল্টো পথে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এই বিপজ্জনক ফাঁদ ভাঙা অসম্ভব।” এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিকেন্দ্রীকরণ, সরকারি সেবার মান বৃদ্ধি, সমন্বিত নীতি প্রণয়ন এবং অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।