নোবেল জয়ের ২০ বছরে ইউনূস: অভিনন্দনের দিনেও হামে শিশুমৃত্যু থামেনি, সরকারি হিসাবেই ১,১৭০ ছাড়ালো শিশু মৃত্যুর সংখ্যা
২০০৬ সালের এই দিনে নোবেল শান্তি পুরস্কারের ঘোষণা আসে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামে। ২০ বছর পূর্তিতে যখন অনেকে তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, তখনও দেশে হামে শিশুমৃত্যু অব্যাহত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ি আজ ৬ শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যু বরণ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল সোমবার সকাল আটটা থেকে আজ সকাল আটটা পর্যন্ত সময়ে এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ১ হাজার ৬৬ জন। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১০৪ জনের। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৭০। দেশের ইতিহাসে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে ঘটেনি। প্রকৃত মৃত্যু বেশি, বলছেন বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, সরকারি হিসাবে প্রকৃত মৃত্যু পুরোপুরি ধরা পড়ছে না। উল্লেখ্য, প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত্যু ও আক্রান্তের তথ্য দুই সপ্তাহে তিনবার সংশোধন করেছিল । সংকটের পটভূমি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ২০২৪–২৫ সালে এমআর টিকার জাতীয় সরবরাহে সংকট দেখা দেয়, নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক তৈরি হয় এবং ২০২৫ সালে নির্ধারিত হাম-রুবেলা সম্পূরক গণটিকা কর্মসূচি হয়নি। বিডিডাইজেস্টের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা ইউনিসেফকে জানান, টিকার মজুত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফুরিয়ে যাবে। অথচ ইউনূস সরকার ক্রয়প্রক্রিয়া সংস্কার করে উন্মুক্ত দরপত্র চালু করায় নতুন বরাদ্দ আসতে দেরি হয়। ভ্যাক্সিন সংগ্রহে ইউনূস সরকারের সংস্কার তত্ত্ব আর খামখেয়ালীপনায় ঝরে গেল সহস্রাধিক শিশুপ্রাণ হাম-রুবেলা টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়া পরিবর্তন ও জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ২০২৫ সালের শেষ দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সময়ে প্রায় এক দশক ধরে চলে আসা হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ক্রয়প্রক্রিয়া সংস্কারের কথা বলে প্রচলিত পদ্ধতি বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এমআর টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইউনিসেফ ও গ্যাভি’র সহায়তায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই সরাসরি এসব টিকা আমদানি করা হতো। অনুসন্ধান অনুযায়ী, টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে বাধা সৃষ্টি এবং ২০২৫ সালে নির্ধারিত জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি আয়োজন না করার ফলে দেশে হাম প্রতিরোধ কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর ধারাবাহিকতায়, দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম আবারও ছড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয় । বিডিডাইজেস্ট এর অনুসন্ধান অনুযায়ি, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে পরবর্তী সাত মাসে হাম আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ২০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিত বয়সসীমা অনুযায়ী শিশুদের হামের টিকা না দেওয়া এবং সময়মতো টিকা আমদানি ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারাকে এই পরিস্থিতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানিয়েছিলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণ ছিল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার বিষয়ে (অন্তর্বর্তী সরকারের) মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্ত।’ বিস্তারিত সংবাদঃ ইউনূস সরকারকে টিকা সংকটের বিষয়ে সতর্ক করতে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। অন্য দিকে ২০১২ সালে এমআর টিকা চালুর পর থেকে কভারেজ ছিল ৯০–৯৫ শতাংশে। ডব্লিউএইচও-ইউনিসেফের হিসাবে ২০২৪ সালে প্রথম ডোজের কভারেজ ছিল ৯৭% এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯৩%। নিশ্চিত হামের রোগী ২০২২ সালে ছিল ৩১১ জন, ২০২৩ সালে ২৮০ জন। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সংকটের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করেছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হলো কেন। সেই সময়েই মৃত্যু হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
