‘শর্ত মানব না’ বলে চোটপাট: দু’দিন না যেতেই জ্বালানি খাতের জন্য বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাছে হাত পাতল বাংলাদেশ

১২ October, ২০২৬ | ১১:১৪ PM
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠিন শর্ত মেনে নতুন ঋণ নেওয়া হবে না বলে ব্যাপক চোটপাট দেখালেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার অর্থের ওপর নির্ভর করে দেশ পরিচালনার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার নতুন আর্থিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু এমন হম্বিতম্বি করার দু’দিন যেতে না যেতেই এবার জ্বালানি ব্যয়ের চাপ সামলাতে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সহায়তা চাইল বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ নানা বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি খাতে ব্যয় বাড়ছে। এই চাপ সামাল দিতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে দুই সংস্থার সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে। পাশাপাশি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে নতুন ঋণসহায়তা পাওয়ার বিষয়েও আইএমএফের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ১২ই অক্টোবর, সোমবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি খাতে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের আর্থিক সুরক্ষা দরকার। সে জন্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে সরকার আশা করছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা কেবল চলমান প্রকল্প বা বর্তমানে থাকা তহবিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জ্বালানি খাতের সংকটসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে যে বাড়তি ব্যয় তৈরি হচ্ছে, তা সামাল দিতেও সহায়তা দরকার। এ উদ্দেশ্যে দুই পক্ষের মধ্যে একটি অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তি তৈরির কাজ চলছে। অর্থমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় ভবিষ্যতে সহযোগিতাকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি; বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। নতুন ঋণ পেতে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় নতুন ঋণসহায়তা পাওয়ার জন্য আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়তে পারে, সেই সঙ্গে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বহুজাতিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়টি সরকারের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্যাংককে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের একাধিক বৈঠক হয়েছে। মঙ্গলবার অথবা বুধবার আরও একটি বৈঠক হওয়ার কথা। তবে নতুন ঋণসহায়তার সম্ভাব্য পরিমাণ, শর্ত কিংবা আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু করে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ওই কর্মসূচির ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে পেয়েছে ৩৮০ কোটি ডলার। চলতি বছরের মে মাসে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আট মাস আগেই ওই ঋণ কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর নতুন ঋণসহায়তার জন্য আইএমএফের কাছে আবেদন করে বাংলাদেশ। ৪০০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তার লক্ষ্য চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি ব্যাংককে এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে এ পরিকল্পনার কথা জানান। ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশের (ইউএনবি) প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এ অবস্থায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা মিললে সরকারের পক্ষে ব্যয় সামলানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সহজ হতে পারে। তবে নতুন ঋণসহায়তার পরিমাণ কত হবে, কখন অর্থ ছাড়া হবে এবং কী কী শর্ত থাকতে পারে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি। নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সমন্বয় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চলমান সহযোগিতায় সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার ওপরও জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তার বক্তব্য, দুই পক্ষের উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় করা গেলে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ানো এবং তা আরও কার্যকর করা সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে প্রস্তাবিত অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তি নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন এবং আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে সঠিক পথেই এগোচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামলানো, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কমানো এবং বাজেটের ওপর চাপ মোকাবিলার জন্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কাছ থেকে শেষ পর্যন্ত কতটা সহায়তা পাওয়া যাবে, এখন সরকারের নজর সেদিকেই।