জুলাই-আগস্টে সিলেটের থানা থেকে লুটের অস্ত্র মিলছে নদীর পাড়, চা বাগানে-জংলায়, জড়িতরা অধরা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের তথাকথিত আন্দোলন ও সন্ত্রাস চলাকালে ৪ঠা আগস্ট থেকে পরবর্তী কয়েকদিনে দেশের অন্তত ৪৬০টির বেশি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালায়, পুলিশ হত্যার পর অগ্নিসংযোগ করে আন্দোলনকারীরা। এসময় হাজার হাজার অস্ত্র, লক্ষ লক্ষ রাউন্ড গুলিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা সরঞ্জাম লুট হয়। একইসাথে লুট হয় বিভিন্ন থানায় গচ্ছিত রাখা সাধারণ নাগরিকদের অস্ত্রও। লুটপাটের পর এসব অস্ত্র যা চলে যায় সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের হাতে। যার একটা বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সিলেটের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া সব অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। দীর্ঘদিন সেগুলোর কোনো খোঁজ না মিললেও সম্প্রতি কিছু অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। সিলেটে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) অভিযান জোরদার হওয়ার পর লুটকারীরা নদীর পাড়, ঝোপঝাড় ও চা বাগানে অস্ত্র-গোলাবারুদ ফেলে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়ায় জড়িত ব্যক্তিরা এখনো ধরা পড়েনি। এসআরবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান বাড়ানোর পাশাপাশি লুটের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে বিভিন্ন তৎপরতা চলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে ১০১টি অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি অস্ত্র উদ্ধারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন এসএমপির উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। সিলেট জেলা পুলিশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া ৩১টি অস্ত্রের মধ্যে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ২১টি। জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবশিষ্ট অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা চলছে। র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের পর সিলেটে নতুন সংস্থাটির কার্যক্রম জোরদার করা হয়। দায়িত্ব শুরুর পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে অভিযান বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার এবং অস্ত্রের সন্ধান দিতে জনসাধারণকে উৎসাহিত করা হয়। অস্ত্রের তথ্য দিলে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব উদ্যোগে সিলেটে অস্ত্র লুটের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। অভিযান এড়াতে তারা নির্জন জায়গায় লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র, ম্যাগাজিন, গুলি, রাবার বুলেট ও গ্রেনেড ফেলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে এসআরবি। চার দিনে তিনটি অভিযান চালিয়ে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি অংশ উদ্ধার করেছে সংস্থাটি। এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার রাতে সিলেট এয়ারপোর্ট থানার লালিছড়া চা বাগানের একটি ঝিরি থেকে চীনে তৈরি ৭.৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের টাইপ-১৯৫৬ মডেলের একটি রাইফেল উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, রাইফেলটি থানা থেকে লুট হয়েছিল। এর আগের দিন, রোববার জৈন্তাপুর উপজেলার বাউরভাগ মল্লিফৌদ গ্রামসংলগ্ন সাফরি নদীর পাড় থেকে পুলিশের লুণ্ঠিত রাইফেলের দুটি ম্যাগাজিন, দুটি হ্যান্ডগ্রেনেড এবং থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের ১১১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে এসআরবি। এ ছাড়া ২৫শে সেপ্টেম্বর জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর বাজারের কাছে হাউদপাড়া এলাকার একটি জঙ্গল থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিদেশি একটি দোনলা বন্দুক উদ্ধার করা হয়। সেখানে থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের চার রাউন্ড রাবার কার্তুজ ও দুই রাউন্ড রাইফেলের গুলিও পাওয়া যায়। এসআরবির ধারণা, ওই এলাকায় সক্রিয় সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা অস্ত্র ও গুলিগুলো নিজেদের কাছে রেখেছিল। অভিযান বাড়ানোর খবর পেয়ে তারা সেগুলো জঙ্গলে ফেলে যায়। এসআরবি-৯-এর মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, এসআরবি গঠনের পর থেকে অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে অভিযান জোরদার করায় যাদের হেফাজতে সেগুলো ছিল, তারা নির্জন এলাকায় ফেলে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হলেও সেগুলোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে এসআরবির গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
