পদ্মার চর পেরিয়ে সোনা যাচ্ছে ভারতে, ঢুকছে হেরোইন-ফেনসিডিল
পদ্মার চর ঘেঁষা বিস্তীর্ণ জনপদ, কাছেই কাঁটাতারের বেড়া। দিনের বেলায় কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকে মানুষ, কিন্তু রাত নামলে সীমান্তের চেনা দৃশ্য পাল্টে যায়। দুর্গম চর, নদীপথ এবং কম ব্যবহৃত সীমান্তপথ ধরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হচ্ছে সোনা; বিপরীতে ভারত থেকে দেশে আসছে হেরোইনসহ নানা মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কখনো বড় চালান আটক হলেও অধিকাংশ ঘটনায় গ্রেপ্তার হচ্ছে বাহকরা। নেপথ্যের মূল কারবারিরা থেকে যাচ্ছে অধরা। রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও আশপাশের সীমান্তে মাদক, হুন্ডি এবং স্বর্ণ পাচারের নেটওয়ার্ক সক্রিয়—এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবগত। তাদের প্রতিবেদনেও গোদাগাড়ী ও পাশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তকে মাদক ও সোনা পাচারের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, মাদক কারবারিদের তালিকা হালনাগাদ করার পাশাপাশি মাদকের অর্থে গড়ে তোলা সম্পদ শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একের পর এক হেরোইনের বড় চালান এসআরবির (সাবেক র্যাব) দুই বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দ্বিগুণের কাছাকাছি হেরোইন জব্দ হয়েছে। ২০২৫ সালে উদ্ধার হয়েছিল ১৪ দশমিক ২৬৯ কেজি। এ বছরের ২৯শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ২৬ দশমিক ৪১৩ কেজি। বিজিবি গত বছর ৩০০ গ্রাম হেরোইন জব্দ করলেও চলতি বছরের নয় মাসেই উদ্ধার করেছে ৯০০ গ্রাম। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এক কেজি হেরোইনের দাম কমপক্ষে ১ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযান সীমান্ত দিয়ে হেরোইন প্রবেশের ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। সর্বশেষ, গত পরশু চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে অভিযান চালিয়ে ৬ কেজি ৭৫১ গ্রাম হেরোইনসহ মেহেদী হাসান (৩৫) নামের এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৫ (এসআরবি-৫)। এর আগে ২৪শে সেপ্টেম্বর গোদাগাড়ীর কবুতরপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ কেজি ১৭৩ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করে এসআরবি-৫। চলতি বছরের জুলাইয়ে গোদাগাড়ীর লালবাগ হেলিপ্যাড এলাকায় র্যাবের অভিযানে ৩০০ গ্রাম হেরোইনসহ একজন গ্রেপ্তার হন। এ ছাড়া গোদাগাড়ীর এক মাদক কারবারির বাড়িতে স্টিলের ভল্ট ভেঙে সাড়ে ৭ কেজি হেরোইন, সাড়ে ২৪ লাখ টাকা, ২৫৮ গ্রাম স্বর্ণালংকার এবং ১৮ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে জেলা পুলিশ। ২০২৫ সালের এপ্রিলে গোদাগাড়ী থেকে ৬ দশমিক ৫ কেজি হেরোইনসহ একজনকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সরকারি এই সংস্থার প্রকাশিত তথ্যেও ঘটনাটিকে মাদকের ‘গডফাদার’ গ্রেপ্তারের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্তের চরাঞ্চল থেকে সড়কপথ হয়ে শহরমুখী বিভিন্ন পর্যায়েই হেরোইনের চালান ধরা পড়ছে। রাজশাহী এসআরবি-৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়সাল ইসতিয়াক জানান, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত দিয়ে হেরোইন পাচারের ঘটনা বেশি ঘটে। কঠোর অবস্থানের কারণে তাঁদের বাহিনী বেশ কয়েকটি বড় চালান উদ্ধার করতে পেরেছে। রাজশাহী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মেহেদী হাসানও বলেন, দুই জেলার সীমান্তপথে হেরোইনের কারবার বেশি। তাঁর মতে, এ কারণে কারবারিরা প্রায়ই কম পরিচিত ও অপ্রচলিত পথ ব্যবহার করে। সোনা যাচ্ছে কোন পথে মাদক পাচারের পাশাপাশি রাজশাহী সীমান্তকে স্বর্ণ পাচারের পথ হিসেবেও ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, তিনি দীর্ঘদিন রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলার সীমান্ত নিয়ে কাজ করেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া তাঁর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বড় চালানে বাংলাদেশে আসা সোনার একটি অংশ ঢাকা থেকে রাজশাহীতে নেওয়া হয়। পরে ছোট ছোট চালানে রাজশিয়ার বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে তা ভারতে পাচার করা হয়। ওই প্রতিবেদনে তদন্তসংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বরাতে আরও বলা হয়েছে, সোনার বিনিময়ে ভারত থেকে হেরোইন ও ফেনসিডিল—যা ‘স্কার্ফ’ নামেও পরিচিত—দেশে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ১লা এপ্রিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে থেকে ৯টি সোনার বারসহ কামরুজ্জামান ডাবলু (৬০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার আলীমগঞ্জে। রাজশাহী সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়া সোনার চালান সেখানেও আটক হচ্ছে। ৬ই জুলাই রাজশিয়া সীমান্তের বিপরীতে ভারতের জলঙ্গী থেকে ৫৬৫ গ্রাম সোনা জব্দ করা হয়। বাইসাইকেলের রডের ভেতরে লুকিয়ে সোনাগুলো পাচারের চেষ্টা হচ্ছিল। জেলা পুলিশের মুখপাত্র সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘যারা ধরা পড়ছে, তারা বহনকারী। পুলিশ তাদের হোতাকে ধরার চেষ্টা করছে।’
