পদ্মা সেতুকে ঝুঁকিতে ফেলে সাড়ে ৬ কোটি ঘনফুট বালু তোলার অনুমতি পেল গায়েবি প্রতিষ্ঠান!

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

‘আইকনিক সোর্সিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান পদ্মা নদী থেকে বালু তোলার আবেদন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনের প্যাডে অফিসের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে ১১৫/১ বছিলা মেইন রোড, ঢাকা। তবে সরেজমিনে ওই ঠিকানায় খোঁজ করেও প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি ওই ঠিকানায় ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের কথা স্থানীয় কেউ জানেন না। আবেদনে দেওয়া মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ। অথচ এমন একটি প্রতিষ্ঠানকেই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পদ্মা সেতুর কাছাকাছি এলাকা থেকে ৬ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুটের বেশি বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া জোরেশোরে এগোচ্ছে। বিষয়টি আরও বিস্ময়কর, যে এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানেই নদীভাঙন ঠেকাতে সরকার ৫২৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ওই এলাকা থেকে বালু তোলা হলে পদ্মা সেতুর নদীশাসন ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। এসব তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান যে বালু তুলতে চায়, সেটি সরকারি কোনো প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসনের কাছে সুস্পষ্ট তথ্য নেই। মূলত বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির উদ্দেশ্যেই বালু উত্তোলন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। আর সেই সুযোগ তৈরি করতেই তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) অনাপত্তি দিয়েছে। এমনকি ওই অনাপত্তির নথিতে অনুমোদন দিতে রাতে সই করেছেন সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। শুধু বিআইডব্লিউটিএর অনাপত্তি নিয়েই প্রশ্ন নেই, এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অবস্থানও বদলেছে। অনাপত্তি বাতিলের জন্য প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছিল। পরে সম্প্রতি সেই মন্ত্রণালয়ই প্রতিষ্ঠানটিকে বালু তোলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়ে আরেকটি চিঠি দিয়েছে। ওই চিঠিগুলোতে কাটার সাকশান ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের শর্ত দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের ড্রেজার কোম্পানি হিসেবে বিআইডব্লিউটিএতে নিবন্ধিত নয়। এদিকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি যাচাই করতে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন। তবে বালু তোলার নামে অপরিকল্পিতভাবে খনন করা হলে নদীভাঙন বাড়তে পারে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় পুলিশ, মৎস্য বিভাগ ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। মুন্সীগঞ্জে এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব আশঙ্কার কথা জানান। কারিগরি কমিটির প্রধান এবং লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু মঙ্গলবার বলেন, কিছু বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে কমিটির কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার নেই। তারা তাদের ফাইন্ডিংস দিয়েছেন। কমিটি কী ধরনের সুপারিশ করেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাতে রাজি হননি। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ বলেন, আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী বালুমহাল ঘোষণা করে টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারাদার নির্ধারণ করার বিধান রয়েছে। এ কার্যক্রম স্থানীয় জেলা প্রশাসন পরিচালনা করে। বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানকে এভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সরকারি কোনো প্রকল্পের উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কখনো কখনো বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বালু উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছে। আইনগতভাবে অনুমোদন দেওয়া সম্ভব কি না, সেটি যাচাই করা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু একটি কেপিআই (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা), পাশাপাশি এলাকাটি নদীভাঙনপ্রবণ—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, বিআইডব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতামত এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পদ্মা সেতুর কাছাকাছি এলাকায় বালু উত্তোলন করা হলে ভয়াবহ নদীভাঙন এবং জন-অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন দুজন প্রকৌশলী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, নদী থেকে বালু উত্তোলনকারী ব্যবসায়ীরা সাধারণত দেশীয় প্রযুক্তির ড্রেজার ব্যবহার করেন। একই জায়গা থেকে এভাবে বালু উত্তোলন করলে নদীতে গভীর খাদ তৈরি হয়। এর ফলে আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিতে পারে। তাদের ভাষ্য, এখানেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখলাক উল জামিল গত ৯ই সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসককে দেওয়া এক চিঠিতে পদ্মা সেতুর ভাটিতে নদীভাঙন রোধে চলমান একটি প্রকল্পের তথ্য তুলে ধরেছেন। চিঠিতে তিনি জানান, লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় নদীভাঙন ঠেকাতে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, ড্রেজিংয়ের আওতায় থাকা চরটি এরই মধ্যে মরফোলজিক্যাল পরিবর্তনের কারণে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট ইমেজেও নদীভাঙনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। পদ্মা সেতুর ভাটিতে ১৬ কিলোমিটার নদীতীর ভাঙনপ্রবণ হলেও এর মধ্যে ৯ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাকি ৬.৯ কিলোমিটার এলাকার নদীতীর সংরক্ষণের জন্য মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের সরকারদলীয় সংসদ-সদস্য আব্দুস সালাম আজাদ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার (চাহিদাপত্র) দিয়েছেন। পাওয়া যায়নি আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব গত ৪ঠা মে ‘আইকনিক সোর্সিং’-এর প্রোপ্রাইটার সৈয়দ সাদাব মাহবুব বিআইডব্লিউটিএতে পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলনের আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, পদ্মা সেতুর মূল ঠিকাদারের ক্রেন চলাচল এবং পলি অপসারণের জন্য দেশীয় ড্রেজার দিয়ে একটি চ্যানেল তৈরির অনুমোদন দেওয়া হলে নিজস্ব অর্থায়নে কাজটি করবেন তিনি। পাশাপাশি ডিসি (জেলা প্রশাসক) অফিসের মাধ্যমে বালি বা মাটির নির্ধারিত ফি সরকারকে পরিশোধ করার কথাও আবেদনে উল্লেখ করেন। তবে উত্তোলন করা বালু কোথায় ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে আবেদনে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। আইকনিক সোর্সিংয়ের ব্যবহৃত প্যাডে অফিসের ঠিকানা হিসেবে লেখা রয়েছে ১১৫/১ বছিলা মেইন রোড, ঢাকা। প্যাডটিতে প্রতিষ্ঠানের সিল কিংবা ওয়েবসাইটের ঠিকানা নেই। প্রতিষ্ঠানটি কী ধরনের কাজ করে, সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। আবেদনে দেওয়া মোবাইল নম্বরটিও বর্তমানে বন্ধ। সরেজমিনে বছিলা মেইন রোডে গিয়ে ১১৫/১ নম্বরের কোনো হোল্ডিংয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সেখানে ১১৫ নম্বর হোল্ডিংয়ে টিন দিয়ে তৈরি কয়েকটি ছোট মুদি দোকান, লাইব্রেরি, মোবাইল ফ্লেক্সিলোড ও চায়ের দোকান রয়েছে। সেখানকার হাফসা টেলিকমের মালিক মিয়া হোসেন বলেন, ১১৫/১ নামে কোনো হোল্ডিং নেই। ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের কথাও তিনি কখনো শোনেননি। এদিকে প্রতিষ্ঠানটির হয়ে সরকারি দপ্তরে অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করছেন সৈয়দ সাদাব মাহবুবের ভাই হিসেবে পরিচয় দেওয়া কাজী মো. লিয়াকত। তার সঙ্গে তিন দিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাদাব মাহবুবের মোবাইল নম্বর কিংবা প্রতিষ্ঠানটির সঠিক ঠিকানা দিতে রাজি হননি। ভুয়া ঠিকানা ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী মো. লিয়াকত শুধু বলেন, ‘যেই মাধ্যমে আপনি তথ্য পাচ্ছেন, তারাই ভালো বলতে পারবে।’ সূত্র: দৈনিক যুগান্তর