জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ: ইউরোপের চার দেশের সমর্থন

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে মধ্য ইউরোপের চার দেশ—পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ভারত-ভিশেগ্রাদ গ্রুপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক থেকে এ সমর্থনের কথা জানানো হয়। বৈঠকের পর স্লোভাকিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুরাজ ব্লানার বলেন, ভিশেগ্রাদ গ্রুপের চার সদস্যই মনে করে, গ্লোবাল সাউথের অংশ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উদীয়মান শক্তি হিসেবে ভারতের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়া উচিত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের মতো একটি দেশকে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ভিশেগ্রাদ গ্রুপ বা ভি-৪ হলো মধ্য ইউরোপের চার দেশের আঞ্চলিক জোট। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র এ জোটের সদস্য। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জোট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে কাজ করে। নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারে ভারতের দাবি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য বর্তমানে পাঁচটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। এসব দেশের প্রত্যেকেরই ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। এর বাইরে আরও ১০টি দেশ অস্থায়ী সদস্য হিসেবে দুই বছরের জন্য নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচিত হয়। দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা ও কাঠামো পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে ভারত। নয়াদিল্লির যুক্তি, ১৯৪৫ সালে নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিষ্ঠার সময়কার বিশ্বের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনমিতিক বাস্তবতার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। তাই এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবিতে ভারত ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপানের সঙ্গে জি-৪ জোটের অংশ হিসেবেও কাজ করছে। এই জোট নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী—উভয় ধরনের সদস্যপদ কাঠামোয় সংস্কার এবং স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। বৈঠকে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর আলোচনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে ভি-৪ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রথম যৌথ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। ২১শে সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ভারত ও চার ইউরোপীয় দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, যোগাযোগ, শিক্ষা, মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র উঠে আসে। ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও যোগাযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন মন্ত্রীরা। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতার বিষয়েও মতবিনিময় হয়। জয়শঙ্কর বৈঠকটিকে একটি ‘নতুন ঐতিহাসিক’ উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেন। বৈঠকের পর তিনি জানান, ভারত ও ভি-৪ দেশগুলো প্রতিবছর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন এবং একটি বার্ষিক ব্যবসায়িক ফোরাম চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে। এ ছাড়া প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, গবেষণা ও শিক্ষা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, মহাকাশ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো বিষয়েও দুই পক্ষ কাজ করবে বলে জানান তিনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, V4+India কাঠামোটি চার দেশের সঙ্গে ভারতের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি নতুন সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। সমর্থন মিললেও স্থায়ী সদস্যপদের পথ এখনও জটিল ভিশেগ্রাদ গ্রুপের চার দেশের সমর্থন ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নতুন ইউরোপীয় সমর্থন যোগ করেছে। তবে এই সমর্থনের ফলে ভারতের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে না। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য জাতিসংঘ সনদ সংশোধনসহ সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমঝোতা প্রয়োজন। নতুন স্থায়ী সদস্য যুক্ত হলে তাদের ভেটো ক্ষমতা থাকবে কি না, কতটি নতুন স্থায়ী আসন সৃষ্টি হবে এবং কোন অঞ্চল থেকে কতটি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে—এসব বিষয়েও জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে ভি-৪ভুক্ত চার দেশের সমর্থন ভারতের দাবির পক্ষে একটি নতুন কূটনৈতিক সমর্থন তৈরি করলেও নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের চূড়ান্ত অগ্রগতি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমঝোতার ওপরই নির্ভর করবে। নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণ নিয়ে বিভিন্ন দেশের অবস্থান ও ভেটো ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও মতভেদ রয়েছে।