কৃষকের ভর্তুকির সার পাচার হয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারে, বিনিময়ে ঢুকছে ইয়াবা-অস্ত্র
দেশের প্রান্তিক কৃষকেরা যখন সার ডিলারের দরজায় দরজায় ঘুরে এক বস্তা সারের জন্য হাহাকার করছেন, ঠিক তখনই সরকারি ভর্তুকি দেওয়া সার রাতের আঁধারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে যাচ্ছে মিয়ানমারে। সীমান্ত পারাপারের এই বাণিজ্যে যুক্ত হয়েছে মারাত্মক এক ‘বার্টার সিস্টেম’ বা পণ্য বিনিময় প্রথা—বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে ইউরিয়া ও টিএসপি সার, আর বিনিময়ে দেশে প্রবেশ করছে কোটি কোটি টাকার মরণনেশা ইয়াবা, আইস এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। সম্প্রতি সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া থেকে শুরু করে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং দেশের একাধিক সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির সম্পদ। বাংলাদেশে সরকার নির্ধারিত দামে ১ বস্তা ইউরিয়া সারের মূল্য প্রায় ১,৩৫০ টাকা। অথচ সীমান্ত পার করে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পৌঁছালে একই বস্তা বিকোচ্ছে প্রায় ৮,০০০ টাকায়! রাখাইনে গৃহযুদ্ধ এবং জান্তা সরকারের সরবরাহ বন্ধ থাকার সুযোগে তৈরি হওয়া এই বিপুল চাহিদাকে পুঁজি করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে পাচারকারী চক্র। একইসাথে বিভিন্ন তথ্য বলছে, রাসায়নিক সার দিয়ে সেখানে বোমা তৈরি হচ্ছে যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য। রাসায়নিক সারে ব্যবহৃত নাইট্রেটসহ বিভিন্ন উপাদান বোমা তৈরির অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে জঙ্গিরা। আইইডিসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ঙ্কর বোমায় ব্যবহৃত হয় এসব উপাদান। পাচারকারীরা সার সংগ্রহের জন্য কোনো নতুন রুট তৈরি করেনি; দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত মাদক ও মানবপাচারের ১৫টিরও বেশি রুট (যেমন: উখিয়ার আনজুমানপাড়া, টেকনাফের উলুবনিয়া, কানজরপাড়া, হ্নীলা ইত্যাদি) ব্যবহার করছে তারা। তিনটি স্তরে ভাগ হয়ে কাজ করছে এই সিন্ডিকেট: • প্রথম স্তর: অসাধু ডিলার, ভুয়া কৃষিকার্ডধারী এবং স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সার সংগ্রহ ও মজুদ। • র্থিতীয় স্তর: অর্থের বিনিময়ে কাজ করা পরিবহন শ্রমিক, নৌকার মাঝি ও রাখালদের মাধ্যমে সীমান্ত পারাপার। • তৃতীয় স্তর: নেপথ্যে থাকা অর্থদাতা ও মূল হোতা, যারা মূলত পুরোনো মাদক ও অস্ত্র কারবারের সঙ্গে যুক্ত। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসে কক্সবাজার জেলায় চাহিদার চেয়েও বেশি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কার্ডধারী প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করে খুচরা বিক্রেতা ও পাচারকারীদের হাতে সার তুলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সার না পেয়ে দেশের সীমান্তে ক্ষোভ ও গুদাম ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটছে। বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের অভিযানে চলতি বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কেজি সার জব্দ করা হয়েছে এবং ১১৭ জনকে আটক করা হয়েছে। ১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন ডিলারের নাম কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে অধিকাংশ সময় কেবল ভাড়াটে শ্রমিক বা মাঝিরাই ধরা পড়ছে, অধরা থেকে যাচ্ছে নেপথ্যের ‘গডফাদাররা’। কৃষকের জন্য দেওয়া সরকারি ভর্তুকির সার সীমান্ত পেরিয়ে চলে যাওয়া এবং তার বিনিময়ে দেশে বিষাক্ত মাদক প্রবেশ করা—একই সাথে দেশের কৃষি অর্থনীতি এবং জননিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকি। সীমান্ত পাহারা জোরদারের পাশাপাশি সারের বণ্টন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল মনিটরিং নিশ্চিত করা এবং মূল হোতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
