মানবতার লজ্জাজনক পরাজয়: ঢাবিতে তোফাজ্জল হত্যার দুই বছর হলেও শুরু হয়নি বিচার
২০২৪ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে ঘটে যাওয়া সেই নির্মম ঘটনাটি আজও দেশের মানুষের স্মৃতিতে টাটকা। চোর সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জল হোসেনকে ধরে এনে পিটিয়ে হত্যা করার আজ দুই বছর পূর্ণ হলেও এখনো থমকে আছে বিচার প্রক্রিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করা মামলা এবং পরবর্তীতে নিহতের পরিবারের আবেদনের পর ২৪ মাস অতিবাহিত হলেও বিচার শুরু না হওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনরা। ঘটনার দিন ১৮ই সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৮টার দিকে ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিলেন বরগুনার পাথরঘাটার ছেলে তোফাজ্জল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএম কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞানে মাস্টার্স করা এই যুবক মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছিলেন। শিক্ষার্থীরা তাকে ধরে এনে মোবাইল চুরির অভিযোগে প্রথমে অতিথি কক্ষে নিয়ে চড়-থাপ্পড় মারে। তোফাজ্জল ‘মানসিক রোগী’ বুঝতে পেরে তাকে হলের ক্যান্টিনে খাবারও খাওয়ানো হয়। কিন্তু সেই খাবারের রেশ কাটতে না কাটতেই তাকে হলের দক্ষিণ ভবনের অতিথি কক্ষে নিয়ে জানালার সাথে হাত বেঁধে স্ট্যাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তোফাজ্জলের নিরপরাধ চেহারা ও ভাত খাওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি করে। তোফাজ্জলের পরিবার বলতে কেউ অবশিষ্ট ছিল না। আট বছর আগে বাবা, পাঁচ বছর আগে মা এবং ২০২৩ সালে পুলিশের এসআই থাকা একমাত্র বড় ভাই ক্যান্সারে মারা যাওয়ার পর তোফাজ্জল পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। পাবনার মানসিক হাসপাতালে নেওয়ার দিন সকালে শিকল ভেঙে পালিয়ে ঢাকা চলে আসেন তিনি। তোফাজ্জলকে পেটানোর খবর পেয়ে তার মামাতো বোন আসমা আক্তার তানিয়া ফোনে শিক্ষার্থীদের তোফাজ্জলের শারীরিক অবস্থা জানিয়ে ছেড়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্বজনদের অভিযোগ, অনুরোধের পর নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার পর ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্টসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করেন তানিয়া। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলার সাথে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত। তবে দুই বছর পার হলেও বিচার কাজ শুরু না হওয়ায় তানিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “দুই বছর হয়ে গেছে এখনো বিচার শুরু হয়নি। আমাদের তো একটা ক্ষোভ থাকতেই পারে। আমরা বিচার চাই।” অন্যদিকে, ঢাবি এস্টেট অফিসের পক্ষ থেকেও প্রকৃত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। একটি সুখী পরিবারের করুণ পরিণতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনা আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
