ফ্লোর প্রাইস উঠুক চান না বিনিয়োগকারীরা

31 August 2020, 12:27 AM | আপডেট:  21 November 2020 , 13:28 PM
বাংলাদেশ

দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে দেশের শেয়ারবাজার। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম। এতে প্রায় সবকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম ফ্লোর প্রাইসের (সর্বনিম্ন দাম) ওপরে উঠে এসেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে ফ্লোর প্রাইস। এ পরিস্থিতিতে যেকোনো মুহূর্তে ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে নেয়া হতে পারে বলে শেয়ারবাজারে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বলছেন, ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়ার সময় এখনো হয়নি। এই মুহূর্তে ফ্লোর প্রাইস তুলে নিলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আরও একটু সময় নিয়ে ফ্লোর প্রাইস উঠানো উচিত। অপরদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ফ্লোর প্রাইসের আর ভূমিকা নেই। তারপরও আপাতত ফ্লোর প্রাইস উঠানো হবে না। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই ফ্লোর প্রাইস উঠানো হবে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাংলাদেশে শুরু হয় গত ৮ মার্চ। ওইদিন বাংলাদেশে প্রথম তিনজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ পায়। করোনার প্রভাবে ৯ মার্চ শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস নামে। ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স একদিনে রেকর্ড ২৭৯ পয়েন্ট পড়ে যায়। এরপর দফায় দফায় দরপতন হতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯ মার্চ থেকে শেয়ারবাজারে লেনদেনের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়। এরপরও পতন ঠেকানো না গেলে প্রতিটি কোম্পানির শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস (দামের সর্বনিম্ন সীমা) নির্ধারণ করে দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। এর মাধ্যমে শেয়ারবাজারের পতন কিছুটা হলেও থামানো যায়। এক পর্যায়ে করোনাভাইরাসের প্রকোপ সামাল দিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এতে ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত টানা ৬৬ দিন বন্ধ থাকে শেয়ারবাজারের লেনদেন। এর মধ্যেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়। নতুন কমিশন দায়িত্ব নিয়ে শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয়। কয়েকটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বাতিল করে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে অনিয়মের কারণে বেশকিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বড় জরিমানা করা হয়। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে শেয়ারবাজারে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হারানো আস্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফলে প্রায় দুই মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে শেয়ারবাজার। এতে প্রতিনিয়ত তালিকাভুক্ত প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। ফলে একসময় যেখানে সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম ফ্লোর প্রাইসে আটকে ছিল, এখন তা হাতেগোনা কয়েকটিতে দাঁড়িয়েছে। তুহিন নামে একজন বিনিয়োগকারী বলেন, ‘বিএসইসি সম্প্রতি শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ার কারণে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা দিয়েছে।’ এই মুহূর্তে ফ্লোর উঠিয়ে নিলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে বলে মনে করেন এই বিনিয়োগকারী। তিনি বলেন, ‘আতঙ্কে অনেকের সেল প্রেশার বাড়বে। তখন সার্বিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই ফ্লোর প্রাইস উঠানোর ক্ষেত্রে আরও একটু সময় নেয়া উচিত। টানা একমাস প্রতি কার্যদিবসে হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হলে তখন ফ্লোর প্রাইস উঠানোর ক্ষেত্রে পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে।’ শেয়ারবাজারে আরেক বিনিয়োগকারী সোহাগ বলেন, ‘ফ্লোর প্রাইস বিনিয়োগকারীদের রক্ষাকবচ। এই ফ্লোর প্রাইসের কারণেই আজ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি কিছুটা বেঁচে আছে। ফ্লোর প্রাইস না থাকলে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়ে যেত। বিনিয়োগকারীদের রক্ষাকবচ এই ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে নেয়ার সময় এখনো হয়নি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি না ফেরা পর্যন্ত ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে নেয়া উচিত হবে না।’ মিলন নামের আরেক বিনিয়োগকারী বলেন, ‘দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে শেয়ারবাজার এখন ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে। সূচক বাড়ার সঙ্গে লেনদেনের গতিও বেড়েছে। ফলে শেয়ারবাজার নিয়ে আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছি। বাজারের এই চিত্র আর মাস দুয়েক থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অনেক বেড়ে যাবে। তখন ফ্লোর প্রাইস উঠানোর বিষয়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ফ্লোর প্রাইস উঠানো উচিত হবে না।’ এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সম্প্রতি বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ফ্লোর প্রাইসের তো তেমন কোনো ভূমিকা নেই। তারপরও আমরা আপাতত ফ্লোর প্রাইস তুলে নিচ্ছি না।’ তিনি বলেন, ‘ফ্লোর প্রাইস উঠানোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার বিষয়টি আগে বিবেচনা করা হবে। আমরা বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার সব ধরনের পদক্ষেপ নেব। সুতরাং ফ্লোর প্রাইস নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’


Logo