উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের অযুহাতে ইউনূসের বন্ধ রাখা তেল বিদ্যুতকেন্দ্র গুলোতেই লোডশেডিং এর সমাধান খুঁজছে সরকার

৩১ আগস্ট, ২০২৬ | ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

লোডশেডিং পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দিকেই ঝুঁকছে সরকার। শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এই লক্ষ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। উচ্চমূল্যের অজুহাতে বন্ধ ছিল যেসব কেন্দ্র আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত এই বেসরকারি তেলভিত্তিক (কুইক রেন্টাল ও আইপিপি) কেন্দ্রগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলে আসছিল। অভিযোগ ছিল, উৎপাদন ছাড়াই এসব কেন্দ্র চুক্তি অনুযায়ী বিপুল অঙ্কের “ক্যাপাসিটি চার্জ” নিয়ে যাচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। এই যুক্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর “বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বিশেষ বিধান আইন” স্থগিত করে, যে আইনের সুবাদে আওয়ামী লীগ আমলে বিতর্কিত এসব বিদ্যুৎ চুক্তি করা হয়েছিল। উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার অভিযোগ তুলে এই সময় থেকেই একাধিক তেলভিত্তিক কেন্দ্র কার্যত অলস বসিয়ে রাখা হয় বা সীমিত পরিসরে চালানো হয়। এর ফল হিসেবে গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে লোডশেডিং রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। জ্বালানি সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একপর্যায়ে দেশের ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে এবং গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে দেখা যায়, যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ—কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছিল না। একইসঙ্গে দেশের ৫৩টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েলের মজুত স্বাভাবিক ১৫ দিনের বদলে ৭-৮ দিনে নেমে আসায় এসব কেন্দ্রের উৎপাদন এক-চতুর্থাংশে সীমিত হয়ে পড়ে। এখন সেই বন্ধ রাখা কেন্দ্রগুলোতেই ফেরার চেষ্টা লোডশেডিং কমাতে ব্যর্থ হয়ে সরকার এখন সেই তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতাই পুরোপুরি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে, যেগুলো এতদিন উচ্চমূল্যের অজুহাতে সীমিত রাখা হয়েছিল। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) ২৪ থেকে ৩০ অগাস্টের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেসরকারি ৩৯টি এইচএফও কেন্দ্র ও ইউনিটের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ৩২৮ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত উৎপাদন তার অর্ধেকের কিছু বেশি। ২৩ অগাস্ট সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে ৩৬টি কেন্দ্র থেকে মোট প্রায় ২ হাজার ৯১৩ মেগাওয়াট উৎপাদিত হলেও তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২৯ অগাস্ট সন্ধ্যায় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৫৭০ মেগাওয়াটে। গ্যাসের বদলে ফার্নেস অয়েলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হলে শিল্পখাতের জন্য কিছুটা গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব হবে বলে মনে করছে পিডিবি। তবে এর বিনিময়ে বিদ্যুৎ খাতকে গুনতে হবে বিপুল বাড়তি খরচ—গ্যাসভিত্তিক উৎপাদনের তুলনায় তেলভিত্তিক উৎপাদনের ব্যয় প্রায় ছয়গুণ বেশি। এ প্রসঙ্গে পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, “মাঝে মাঝে তো গভর্মেন্টকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট করতে হয়।” বিশ্লেষকদের ভাষ্য, যেসব কেন্দ্রকে একসময় “লুটেরা মডেল” ও অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি চার্জের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে দূরে রাখার চেষ্টা হয়েছিল, লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে এখন সেই একই কেন্দ্রগুলোর ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে। স্বল্পমেয়াদে বিকল্প সীমিত হলেও, বাড়তি ব্যয়ের এই চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দামের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।