বিষাদময় গ্রীষ্ম পার করার পর এখন মেসির সামনে কী?

৩০ আগস্ট, ২০২৬ | ৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে ট্রফি হাতছাড়া হয়েছিল আর্জেন্টিনার। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নিজ শহর রোসারিওতে ফিরে আরও বড় এক শোকের মুখামুখি হন মেসি—বাবা হোর্হে মেসিকে হারান তিনি। ৩৯ বছর বয়সে এসে মেসির ফুটবল ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে হারের পর থেকে মেসি ঠিক কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে দ্য অ্যাথলেটিক-এর এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত উঠে এসেছে। সেখানে এমন একজন ফুটবলারের ছবি ফুটে উঠেছে, যিনি ব্যক্তিগত জীবনের চরম কষ্ট বুকে চেপেও ফুটবল মাঠ আঁকড়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আর সেখানেই উঠে আসছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি: মেসি আসলে এখন কী করতে চান? বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে আর্জেন্টিনা দলের অন্যদের মতো মেসি সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফেরেননি। তবে কিছুদিন পর যখন রোসারিওতে ফিরলেন, সেখানে খুব সাধারণ এক স্থানীয় ম্যাচ দেখতে গ্যালারিতে হাজির হতে দেখা যায় তাকে। নিউ জার্সির সেই জমকালো বিশ্বকাপ ফাইনালের মেজাজের সঙ্গে এর কোনো মিলই ছিল না। লাখ লাখ আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে খেলার বদলে মেসি তখন নিজের বাড়ির কাছের এক ছোট্ট স্টেডিয়ামে সাধারণ সমর্থকদের মাঝে বসে ছিলেন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ফুটবল যাকে কখনো ছেড়ে যায়নি, সেই ফুটবল তখনও তার সঙ্গেই ছিল। কিন্তু সামনে যে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছিল! গত ৮ আগস্ট ৬৮ বছর বয়সে মারা যান হোর্হে মেসি। মেসির ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনে তার বাবার অবদান ছিল অপরিসীম। রোসারিওর শুরুর দিনগুলো থেকে শুরু করে বার্সেলোনায় পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত—যা মেসির পুরো জীবনটাই বদলে দিয়েছিল—প্রতিটি পদক্ষেপে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন তিনি। বাবার মৃত্যুর পর মেসি নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি আর কতদিন খেলা চালিয়ে যাবেন, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানেন না। তার এই মন্তব্যটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এতদিন মেসির ভবিষ্যৎ মানেই ছিল নতুন ট্রফি, চুক্তির অঙ্ক কিংবা মাঠের পারফরম্যান্সের হিসাব-নিকাশ। কিন্তু এখন বিষয়টি রূপ নিয়েছে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এক দোলাচালে। ‘মেসি’ নামক নামটার পেছনে যে অপরিসীম চাপ ও প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে, তিনি কি এখনও সেটি বহন করতে চান? আপাতত মনে হচ্ছে, তার উত্তরটা ‘হ্যাঁ’। বিশ্বকাপের ধাক্কা সামলে তিনি ইন্টার মিয়ামির হয়ে মাঠে ফিরেছেন এবং বাবার মৃত্যুর পরও খেলা থামাননি। মাঠে নেমে গোলও পেয়েছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তার ভবিষ্যতের সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। ইন্টার মিয়ামি সম্প্রতি ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগছে। ক্লাবটি এখন তাদের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে ক্রিস্টিয়ান ‘কিলি’ গনজালেসকে। সাবেক এই আর্জেন্টাইন তারকার মূল দায়িত্বই হবে মেসি ও দলের অন্য অভিজ্ঞ তারকাদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনা। মিয়ামির জন্য মেসিকে শারীরিকভাবে ফিট রাখার পাশাপাশি মানসিকভাবে অনুপ্রাণিত রাখাটাও হবে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই বয়সে এসেও মেসি একা হাতেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, কিন্তু মনে রাখতে হবে, তার বয়স এখন ৩৯। আগের মতো প্রতি সপ্তাহে একা পুরো দলকে টেনে নিয়ে যাবেন, এমনটা আশা করা অন্যায়। মেসি যদি তার বর্তমান চুক্তির শেষ দিন পর্যন্ত খেলে যান, তবে মিয়ামিকে এমন একটি দল গঠন করতে হবে যা তাকে সহায়তা করবে—শুধু তার ওপর নির্ভর করে থাকার দিন শেষ। কিন্তু জাতীয় দল আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে কী হবে? আসল প্রশ্ন তো সেখানেই। বিশ্বকাপের আগেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। ৩৯ বছর বয়সে আরও একটি ফাইনাল খেলার পর তিনি যদি জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে সেটি হবে খুব স্বাভাবিক এক পদক্ষেপ। আর তিনি যদি সেই পথেই হাঁটেন, তবে দীর্ঘ দুই দশক ধরে যাকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনা ফুটবল দল ঘূর্ণিত হয়েছে, তাকে ছাড়াই দল গোছানোর পরিকল্পনা শুরু করতে হবে। অবশ্য বড় দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত থাকা ফুটবলারের অভাব নেই। হুলিয়ান আলভারেজ কিংবা লাউতারো মার্তিনেসরা আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দিতে পারেন, আর তরুণদেরও নিতে হবে বাড়তি দায়িত্ব। তবে মেসিকে তো আর কেবল একজন স্ট্রাইকার হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, তাই তার বিকল্প খুঁজে নেওয়াও অত সহজ হবে না। দীর্ঘদিন ধরে আর্জেন্টিনার পুরো খেলার ধরণই তৈরি হয়েছে মেসিকে কেন্দ্র করে। সুযোগ তৈরি করা, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং শূন্য থেকে অলৌকিক কিছু করে দেখানোর যে ক্ষমতা তার রয়েছে—সেটাই ছিল আর্জেন্টিনার যাবতীয় সাফল্যের আসল চাবিকাঠি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচ লিওনেল স্কালোনির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। স্কালোনি ও মেসি—দুজনই যদি সরে দাঁড়ান, তবে আর্জেন্টিনার আন্তর্জাতিক ফুটবলের নতুন অধ্যায় এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে। অবশ্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মেসির এখনই কোনো তাড়াহুড়ো নেই। ফুটবলে যা কিছু জেতা সম্ভব, তার সবই তিনি জিতেছেন। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পাশাপাশি আটবার ঘরে তুলেছেন ব্যালন ডি’অর। ইন্টার মিয়ামির সঙ্গে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তার চুক্তি রয়েছে, ফলে নিজের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিনি যথেষ্ট সময় পাচ্ছেন। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, যে গ্রীষ্মে ফুটবল তাকে চরম হতাশা এবং একই সঙ্গে সান্ত্বনা জোগাল, সেই বিষাদময় সময়ের পরও তিনি খেলা চালিয়ে যেতে চান। তবে এই পথচলা কতদিন থাকবে, তা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে না। মেসি সারাজীবন ছুটেছেন পরবর্তী ম্যাচ কিংবা পরবর্তী ট্রফির পেছনে। ৩৯ বছর বয়সে এসে, বাবাকে হারানোর পর এবং আরও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের তিক্ততা নিয়ে এখন আর তার নতুন করে কিছু প্রমাণ করার নেই। আসল প্রশ্ন হলো—তার ভেতরে কি খেলার সেই পুরনো ক্ষুধাটা এখনও রয়ে গেছে? আপাতত মেসি এখনও মাঠেই আছেন। আর ফুটবলপ্রেমীদের জন্য সম্ভবত এইটুকুই আপাতত যথেষ্ট।