রাশিয়ার মিগ-২৯ থেকে চীনা জে-১০: গল্পটি সক্ষমতার, মিথ্যা এবং ধোঁকাবাজিরও

২৯ আগস্ট, ২০২৬ | ৫:৩২ অপরাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

বর্তমান বাংলাদেশের বিমান বহরের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান হচ্ছে মিগ-২৯। বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর ইতিহাসে এই যুদ্ধবিমান একদিকে যেমন অত্যন্ত স্মরণীয় একটি অধ্যায়, অন্যদিকে তেমনি এক দীর্ঘ দুঃখগাথারও নাম। এই বিমানকে ঘিরে থাকা ইতিহাসের পেছনে একটু ফিরে তাকানো যাক। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৯ সালে রাশিয়ার সঙ্গে আটটি যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি হয়। সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত যুদ্ধবিমান ছিল মিগ-২৯। দাম ও মান—দুই দিক বিবেচনায় এটি ছিল তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সস্তা বিকল্প। কিন্তু এই বিমানচুক্তির পরপরই কিছু দেশের মাথা খারাপ হয়ে গেল। বাংলাদেশের মতো একটি পুঁচকে দেশ, দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসা একটি দলের সরকার—সারা বিশ্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনার সাহস দেখিয়েছে! ব্যস, সঙ্গে সঙ্গেই দেশীয় দালালদের সক্রিয় করে দেওয়া হলো। প্রথমেই বিমান কেনাকে ঘিরে বিতর্ক শুরু করল সংসদের বিরোধী দল। তাদের দাবি ছিল—সংসদের যথাযথ অনুমোদন না নিয়েই এই বিমান কেনা হচ্ছে। সংসদে যুক্তি-তর্কের পরও যখন কোনোভাবে বিষয়টি আটকানো গেল না, তখন হাইকোর্টে রিট করা হলো, যাতে এই বিমান কেনা বন্ধ হয়ে যায়। সব বাধা অতিক্রম করে মাত্র ১১৪ মিলিয়ন ডলারে প্রথম দফায় মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান কেনা হয়। সেই সময়ে মিগ-২৯-এর সঙ্গে তুলনা করে অন্যান্য যুদ্ধবিমানের আনুমানিক দাম ছিল— MiG-29: প্রায় $১৪-২০ মিলিয়ন F-16C/D: প্রায় $২৪-২৫ মিলিয়ন Mirage 2000: প্রায় $২৯-৩০ মিলিয়ন Gripen: প্রায় $৩৫ মিলিয়ন Su-27: প্রায় $৩৫ মিলিয়ন Su-30: প্রায় $৩৭-৪০ মিলিয়ন F/A-18: প্রায় $৪২-৫০ মিলিয়ন Rafale: প্রায় $৫৮ মিলিয়ন F-15E: প্রায় $৭৫ মিলিয়ন পরবর্তীতে ২০০০ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে রাশিয়া বাংলাদেশকে মিগ-২৯ বিমান সরবরাহ করে। এরপর বিমান বাহিনীর পজিটিভ রিভিউ এর ভিত্তিতে রাশিয়ার কাছে আরও নতুন করে ১৬টি বিমান অর্ডার দেওয়া হয়। কিন্তু এর মধ্যেই ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার পরাজিত হয়। ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। ক্ষমতায় এসেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়—অভিযোগ ছিল, মিগ-২৯ জঙ্গি বিমান কিনে নাকি দেশের ৭০০ কোটি টাকা ক্ষতি করা হয়েছে। কীভাবে সেই ক্ষতি হয়েছে, তার প্রমাণ অবশ্য কোনোদিন দেওয়া যায়নি। বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশের নাকি ৭০০ কোটি টাকা খরচ করে যুদ্ধবিমান কেনার কোনো প্রয়োজনই ছিল না—এগুলোই ছিল তাদের যুক্তি। এরপর রাশিয়া বাংলাদেশকে কিস্তিতে এই বিমানগুলো সরবরাহ করেছিল। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে রাশিয়াকে কিস্তির অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে রাশিয়া ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেই মামলা লড়তে যান প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম স্যার। সেখানেও একই যুক্তি উপস্থাপন করা হয়—রাশিয়ার বিমান কিনে আওয়ামী লীগ সরকার নাকি বাংলাদেশের ৭০০ কোটি টাকা ক্ষতি করেছেন। তার মতো খ্যাতনামা একজন আইনজীবীও এর বাইরে আর কোনো যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেননি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেই মামলায় হেরে যায় এবং রাশিয়ার পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য হয়। এর শাস্তিস্বরূপ পরবর্তীতে রাশিয়া আর কখনো বাংলাদেশকে যুদ্ধবিমান বিক্রি করেনি। আওয়ামী লীগ সরকার পরবর্তীতে ক্ষমতায় ফিরে এলেও রাশিয়ার কাছ থেকে নতুন করে যুদ্ধবিমান কেনার সাহস করেনি। সাহস না করার কারণও ছিল—২০০১ সালে যে কারণে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, মিগ-২৯ তার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারাও পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে কোনো যুদ্ধবিমান কিনতে পারেনি। বাংলাদেশকে যেন এক অলিখিত শাস্তি দেওয়া হয়েছিল—তারা নিজেরাও বাংলাদেশকে যুদ্ধবিমান বিক্রি করবে না, আবার অন্য কোনো দেশ থেকে আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করতেও দেবে না। মিগ-২৯ চুক্তি বাতিলের পর জনগণের চাপে পরবর্তীতে চীন থেকে কিছু মোটামুটি মানের যুদ্ধবিমান কেনা হয়। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় সেসব বিমান আধাঘণ্টাও টিকবে না। ৭০০ কোটি টাকার যুদ্ধবিমান কেনার জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এবং শেখ হাসিনার সরকারকে যে শাস্তি পেতে হয়েছে, ১৪ হাজার কোটি টাকার চীনা অত্যাধুনিক বিমান কিনতে গিয়ে এখন কী পরিণতি টেনে আনবে—তা এখন পর্যন্ত জানি না। যারা বর্তমানে চীনের যুদ্ধবিমান নিয়ে গালগল্প শোনাচ্ছেন, তাদের প্রকৃত চরিত্র নিয়ে আশা করি আর কিছু বলতে হবে না। চীনের J-10C যুদ্ধবিমান ক্রয় শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—আল্লাহ মালুম।