আয় বাড়ছে না, ক্রমশ বেড়ে চলেছে জীবনযাত্রার ব্যয়

২০ আগস্ট, ২০২৬ | ৫:০৭ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও ইউটিলিটি—জীবনযাত্রার প্রায় সব খাতেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও বাজারে পণ্য ও সেবার দাম আগের তুলনায় কমেনি। ফলে আয় না বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে টান পড়ছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কিনতে গিয়ে ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিদিনের বাজারদরের তথ্যেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে চালের কিছু ধরনসহ হাতে গোনা কয়েকটি পণ্যের দাম স্থিতিশীল বা কিছুটা কমলেও ভোজ্যতেল, লবণ, আটা, ডাল, আলু, রসুন, ডিম ও গুঁড়া দুধসহ বেশ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। মৌসুম পরিবর্তনের কারণে কাঁচা সবজির দামও বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও সাধারণ মানুষের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছিল, তা এখনো ৯ শতাংশের কাছাকাছি। ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় রমজান ও ঈদকেন্দ্রিক বাড়তি চাহিদার মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠেছিল। পরে কিছু পণ্যে শুল্ক ছাড় ও নতুন ফসল বাজারে আসায় মূল্যস্ফীতি কমেছে। কিন্তু এতে ভোক্তার ব্যয় কমেনি। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পেছনে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারও বড় ভূমিকা রেখেছে। কয়েক বছরে ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে এখন প্রায় ১২৩ টাকায় উঠেছে। ফলে আমদানিনির্ভর পণ্য ও কাঁচামাল কিনতে ব্যবসায়ীদের আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সরকারকে তুলনামূলক বেশি দামের বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায়। শেষ পর্যন্ত তার প্রতিফলন দেখা যায় বাজারদরে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভর্তুকির চাপ সামলাতে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। ফলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—দুই ধরনের পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রেই মানুষের ব্যয় বাড়ছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে গিয়ে ভোক্তাদের আগের চেয়ে কম খরচ করতে হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বিএনপি সরকারের মেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে এবং বিনিময় হারও তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ায় এর প্রভাব বাজারে পড়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের আগেই প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সুদহার কমানোসহ সম্প্রসারণমূলক আর্থিক ও মুদ্রানীতি নেওয়া হচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক নয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজ করছে না। সরকারের বিভিন্ন নীতির মধ্যেও পারস্পরিক অসংগতি রয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা আরও বলছেন, একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, অন্যদিকে ঋণের সুদহার কমানো, বন্ধ কারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন, সম্প্রসারণমূলক বাজেট বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগানের মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হতে পারে। এর বাইরে এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির থাকায় কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। ফলে পণ্যের দাম বাড়লেও আয় না বাড়ায় পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে টিসিবির ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। তবে সরবরাহ সীমিত হওয়ায় এসব পণ্য কিনতে অনেক সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে এসব কর্মসূচি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় এর সুফল বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ওপর দৃশ্যমানভাবে পড়েনি। ফলে বাজারে পণ্যের দাম ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধানই এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার কমলেও আয় ও কর্মসংস্থান না বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনে তার সুফল পৌঁছানো কঠিন। বর্তমান পণ্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট নন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। তবে দাম কমানো শুধু বাজার তদারকির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য, ঋণের সুদ, উৎপাদনশীলতা, পরিবহন ও অবকাঠামোর মতো বিষয় জড়িত। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে লজিস্টিক ব্যয় আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেশি হওয়ায় এর প্রভাব পড়ে বাজারদরে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। দ্রব্যমূল্য কমাতে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার আশা না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জ্বালানি সক্ষমতা তৈরিতে সময় লাগবে। নতুন এলএনজি অবকাঠামো, গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি দৃশ্যমান হওয়ার আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেটে বাড়তি ব্যয়ের চাপই বহাল থাকছে। আয় না বাড়লেও খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের সঞ্চয় কমছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় খরচও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতির হার কমার পরিসংখ্যানের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার যে ফারাক, সেটিই এখন জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র।