এক্সপ্রেসওয়ে থেকে সিআরবি: চাঁদাবাজি, মারধর ও বাণিজ্যিক আধিপত্যের কবলে চট্টগ্রামের অর্থনীতি
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম নগরীজুড়ে বিভিন্ন খাত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার, দখলদারিত্ব এবং চাঁদাবাজির এক নতুন চিত্র সামনে এসেছে। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে, কাঁচাবাজার দখল এবং চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়ন প্রজেক্টগুলোকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা। চকবাজার ও বাকলিয়ায় দখলদারিত্বের থাবা গত ৫ আগস্টের পর নগরীর চকবাজার, ডিসি রোড ও এক্সেস রোডসহ বাকলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ভয়ভীতি প্রদর্শন করে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন যুবদল নেতা এমদাদুল হক বাদশা। কোনো ধরনের দরপত্র বা সরকারি প্রক্রিয়া ছাড়াই চকবাজার কাঁচাবাজার দখলে নেওয়ার মারাত্মক অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। দখল ও চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পরবর্তীতে নগর যুবদলের বিলুপ্ত কমিটির এই সাংগঠনিক সম্পাদককে দল থেকে বহিষ্কার করে জাতীয়তাবাদী যুবদল। এছাড়াও একই এলাকায় গত বছরের ২৫ অক্টোবর এক গোলাগুলির ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় আসেন পটিয়ার জঙ্গলখাইন ইউনিয়ন তাঁতী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম এবং চকবাজার থানা ছাত্রদলের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক বোরহান উদ্দিন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এদের দুজনের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদকসংক্রান্ত আটটি করে পৃথক মামলা রয়েছে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ‘মব’ সংস্কৃতি ও হুমকি ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ নিয়ে গঠিত পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান কার্যালয় সিআরবিতে দরপত্র নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে অতীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই একই স্থানে বিএনপিপন্থী কিছু নেতাকর্মী ও শ্রমিক দলের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। • ১৬ ফেব্রুয়ারি: জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জয়ের মাত্র তিন দিনের মাথায় ১৬ ফেব্রুয়ারি সিআরবি ভবনে অতিরিক্ত অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তার দপ্তরে গিয়ে একদল শ্রমিক দল নেতাকর্মী তথাকথিত ‘মব’ তৈরি করেন। মোমিনুল ইসলাম (মামুন)-এর নেতৃত্বে একটি অসংগতিপূর্ণ বিল পাসের জন্য দায়িত্বরত কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমানকে চাকরিচ্যুত ও প্রশাসনিক শাস্তির সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়। • মারধর ও ঠিকাদার বিতাড়ন: ৩০ জুন পাহাড়তলীতে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে দরপত্র জমা দিতে গিয়ে হামলা ও মারধরের শিকার হন ‘তুশি এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী কার্তিক রঞ্জন শীল। যুবদল নেতা রাসেল খানসহ কয়েকজন এই হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠে। হামলার শিকার হয়ে কার্তিক রঞ্জন চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে যান এবং আর ফিরে আসেননি। একইভাবে হুমায়ুন নামের অপর এক ঠিকাদারকেও মারধর করা হয়। বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক, প্রাইমমুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহম্মদ নিশ্চিত করেছেন যে, অনেক প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারকে রেলে যাতায়াত করতে নিষেধ করা হয়েছে। চরম আতঙ্কের কারণে ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের কেউ পুলিশে বা গণমাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। এক্সপ্রেসওয়ে ও সাইনবোর্ড বিতর্ক নগরের লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘শহীদ ওয়াসিম আকরাম ফ্লাইওভার’ (এক্সপ্রেসওয়ে)-এর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না হতেই এর নিচের ৫০টি প্যানাফ্লেক্স সাইনবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ২৭ অক্টোবর যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তির স্ত্রী নিহার সুলতানার প্রতিষ্ঠান ‘জেএম পাবলিসিটি’-র সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন চুক্তি সই করে। পরবর্তীতে সিডিএ-র আপত্তি এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও বিক্ষোভের মুখে সিটি করপোরেশনের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন জানান, চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে মোশাররফ হোসেন দীপ্তি দাবি করেন, তিনি কোনো অবৈধ প্রভাব খাটাননি এবং এটি তাঁদের পুরোনো ও লাইসেন্সকৃত পারিবারিক ব্যবসা। জুবায়ের ও জিহাদ হত্যার মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে দলীয় কোন্দল না বলে তিনি সামাজিক অপরাধ হিসেবে দাবি করেন।
