সক্ষমতা, সাহস, সম্মান এবং শৈলী

১৩ আগস্ট, ২০২৬ | ৫:১৫ পূর্বাহ্ণ
ড. মামুনুর রশীদ , দৈনিক গণঅধিকার

সম্মান। বড়ই বিচিত্র এক চাওয়া। অনেক কিছু করেও পাওয়া যায়না। জিন্নাহ পায়নি। কিছু না করেও পাওয়া যায়। মুজিবকে নিয়ে বেলুচিস্তানের লোকদের জিজ্ঞেস করুন। তবে কথা সত্য। সম্মান সহজে অর্জিত হয়না। সোজা ভাষায় বলতে, কেউ এমনি কাউকে সম্মান দেয়না। সম্মান অর্জন করতে হয়। সক্ষমতা দিয়ে। আপনি নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধি করুন, সম্মান আপনার পিছনে ছুটবে। আর সক্ষমতার জন্য সাহস খুব দরকারি। অর্থনীতির ভাষায় আমরা অনেকে সাহসকে ঝুঁকি নেয়ার যোগ্যতা হিসেবে দেখি। বাংলাদেশ যখন টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার জন্য চেষ্টায় রত, তখন আরও কয়েক হাজার ম্যাচ হারতে হবে তার কোনো নিশ্চয়তা ছিলোনা। কিন্তু সাহস ছিলো। সাবের হোসেন, ওবায়দুল কাদের, আকরাম-নান্নুদের চেষ্টায় অনেক সমালোচনা ঠেকিয়ে টেস্ট স্ট্যাটাস পায় বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনের সময় যেমন বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি ছিলো। ১৯৯০ সালেও ছিলো। কিছুই কেনার সামর্থ্য ছিলোনা। মিসকিনের দেশ ছিলো। আরবের শেখদের কাছে মাথা-দরে বিক্রি হতো বাংলাদেশের আদম’রা। দালাল ছিলো পাকিস্তানের ছেড়ে যাওয়া জামাতিরা। দাতাদের কনফারেন্সে এটাচে কেস হাতে পিছু পিছু ঘুরতো অর্থমন্ত্রীরা, প্রাপ্ত দান অনুগ্রহ অনুদানের উপর ভিত্তি করে করা হতো পরের অর্থবছরের বাজেট। ২০০৯ এ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে এক নারীর সাহসিকতায় পাল্টে যায় সব। একের পর এক অবকাঠামো, চুক্তি, এবং নতুন বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করতে থাকে বাংলাদেশ। যারা আগে ঢুকতেই দিতোনা, তারা পোর্ট-এন্ট্রি ভিসার অফার দিয়েছিলো। ৪০০ ডলারের মাথাপিছু আয় এসে ঠেকলো ২৮০০ ডলারে। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীর জন্য ঘর তৈরি হচ্ছিলো। অনেকে আশ্রয়ণ প্রকল্পে পাকা এপার্টমেন্ট পর্যন্ত পেয়েছে। ইউরোপ আমেরিকার অনেক দেশে তাদের জনগোষ্ঠীর একটা অংশ এখনও খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়। রেলস্টেশন, বিমানবন্দরে নতুন টার্মিনাল থেকে শুরু করে গৃহহীনদের জন্য দেয়া আধপাকা ঘরের মধ্যে শুধু সক্ষমতাই ছিলো না, ছিলো অসাধারণ শৈলী। এতে না কারো মাটি চুরি করতে হয়েছে, না কারো বালি। এই শৈলী এসেছে সম্মান অর্জনের মাধ্যমে। ১৯৪৩ সালে আব্রাহাম মাসলো সাইকোলজিকাল রিভিউ জার্নালে “এ থিওরি অফ হিউম্যান মোটিভেশন” বিষয়ে একটা গবেষণাপত্রে “চাহিদার ক্রমবিন্যাস” পাবলিশ করেন। জৈবিক চাহিদা থেকে আত্ম-উপলব্ধি পর্যন্ত পাঁচটা ধাপের কথা বলেছেন। একটা দেশ যখন তার চাহিদার উপরের দিকে যেতে চায়, তার শৈলীর পরিবর্তন জরুরি। ভাতের অভাব কাটিয়ে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলো। ২০২৬ সালেও শেখ হাসিনার নাম লেখা চালের বস্তা ফ্রি বিলানো হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ১০০% উন্নত না হলেও, ক্ষুদ্র অপরাধ কমে গিয়েছিলো। যেখানে সেখানে মানুষকে গুলি করে দেয়া, চাঁদাবাজি, জ*বাই করে হত্যা করা অনেকদিন মানুষ শুনেনি। বিপদে পড়লে মানুষের সাহায্যে মানুষ এগিয়ে গেছে। একটা সেন্স অফ বেলঙ্গিংনেস তৈরি হয়েছিলো। মানুষের মধ্যে বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিলো। অন্যের কাজকে সম্মান করার একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছিলো। পরের ধাপই ছিল সেল্ফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন – আত্ম-উপলব্ধি। শকুনের চোখ পড়লো। কিছু ইতর তাদের স্বাধীনতার জন্য বাকি ৯৫% মানুষের ৫৫ বছরের সব অর্জন ধ্বংস করে দিলো। তাও মাত্র দুই বছরে। দেশকে বিক্রি করে দিলো বিদেশিদের কাছে। এমনভাবে বিক্রি করেছে যে এই দেশ থাকলে তাদের অস্তিত্বের সংকট দেখা দিচ্ছিলো। অথচ কি দিব্বি এই দেশের আলো বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন শৈলীর প্রশ্নই উঠেনা। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ধর্ষিত হচ্ছে মানুষ। বাড়ি বানিয়ে দেয়ার নামে ছবি তোলা হচ্ছে। সাহসের নামে প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। সক্ষমতার নামে প্রায় ৯০০ এর মতো বাচ্চাকে টিকা না দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। দুইটা সময়ের পার্থক্য বুঝতে হলেও কিছুটা শৈলীর দরকার আছে। টম-ডিক-হ্যারি টাইপের যে কেউ হঠাৎ এগুলো বুঝবেনা।