চরম পর্যায়ে লোডশেডিং: ভোগান্তিতে বাড়ছে জনরোষ, নিরাপত্তা শঙ্কায় বিদ্যুৎকর্মীরা
দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি এবার বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের ক্ষোভ বাড়ছে। সেই ক্ষোভ থেকে বিদ্যুৎ অফিস, উপকেন্দ্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কায় পুলিশের সহায়তা চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গোপালগঞ্জে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মধ্যে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) জেলার বিদ্যুৎ স্থাপনা ও উপকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দিয়েছে। নিয়মিত পুলিশ টহল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ নজরদারিও চাওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, লোডশেডিং এখন শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট নয়; এর প্রভাব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎ সরবরাহ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট হুমকি পাননি। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সেবাকে কেন্দ্র করে নাশকতা বা আক্রোশমূলক ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে বিদ্যুৎ স্থাপনায় আক্রমণের আশঙ্কা নিয়ে নানা কথা বলছেন। এ কারণে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ সুপারের কাছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে নিয়মিতই নিরাপত্তা দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ প্রায়ই নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশকে চিঠি দেয়। এবারও চিঠি পাওয়ার পর মোবাইল টিম ও টহল দলগুলোকে এসব স্থাপনার দিকে নিয়মিত নজর রাখতে বলা হয়েছে। গোপালগঞ্জে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এক সকালে জেলার চাহিদা ছিল ১৫ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ৯ মেগাওয়াট। দুপুরে চাহিদা বেড়ে ১৭ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ ছিল ৯ মেগাওয়াট। গত এক সপ্তাহে দিন-রাত মিলিয়ে গড়ে প্রায় আট ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। গত দুই দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া এবং জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। টাউন ফিডারের আওতায় সরকারি কলেজ ও মহিলা কলেজে ডিগ্রি পরীক্ষা চলায় ওই এলাকায় সরবরাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে অন্য এলাকাগুলোতে তুলনামূলক বেশি সময় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকের সরাসরি ক্ষোভের মুখে পড়ছেন বিদ্যুৎ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ পাওয়া বা উৎপাদন ঘাটতির মতো বিষয়গুলো তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। গোপালগঞ্জের বিদ্যুৎ বিভাগের নিরাপত্তা চাওয়ার ঘটনাটি সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ নিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে কাজ করার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাতে হামলা, হেনস্তা বা অন্য কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে না পড়েন, সেটিও এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু গোপালগঞ্জে সীমাবদ্ধ নয়। পটুয়াখালীর মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দরে লোডশেডিংয়ের কারণে বরফকলগুলো পর্যাপ্ত বরফ উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে ইলিশের ভরা মৌসুমেও শত শত ট্রলার ঘাটে আটকে আছে। আগে ১৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া এক ক্যান বরফ এখন প্রায় ৩০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। দাম বাড়লেও চাহিদা অনুযায়ী বরফ পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীরা খুলনা, বাগেরহাট ও বরিশাল থেকে বরফ আনছেন। পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৮৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ৪৫ মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হয়ে শিল্প উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের লোডশেডিংও বেড়েছে। ফলে শিল্পকারখানার জন্য কোনো সরবরাহ ব্যবস্থাই এখন নির্ভরযোগ্য থাকছে না। নারায়ণগঞ্জের অন্তত ৮৫টি ডাইং ও ৬৫টি পোশাক কারখানা গ্যাস সংকটে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন ৪০ শতাংশ, আবার কোথাও ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘ হলে শুধু উৎপাদন ব্যয় বাড়বে না, সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সিমেন্ট, রাসায়নিক ও সিরামিক শিল্পেও উৎপাদন কমেছে। কোনো কোনো কারখানায় স্বাভাবিক সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশ বা তারও কম উৎপাদন হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটের বর্তমান চিত্রে তিনটি বিষয় একই সঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে—জনজীবনে চরম ভোগান্তি, অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর বাড়তি নিরাপত্তা চাপ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির সিদ্ধান্ত অনেকাংশেই স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ কম থাকলে তাদেরও বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হয়। কিন্তু গ্রাহকের ক্ষোভের তাৎক্ষণিক মুখোমুখি হতে হয় মাঠপর্যায়ের কর্মীদেরই। ফলে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ সংকট যত দীর্ঘ হবে, গ্রাহকের অসন্তোষ তত বাড়তে পারে। আর সেই অসন্তোষ যেন বিদ্যুৎ স্থাপনা বা দায়িত্ব পালনরত কর্মীদের ওপর হামলা কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে আগাম সতর্কতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা চাওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি জেলার প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এটি চলমান বিদ্যুৎ সংকটের সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাগত প্রভাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
