হোটেল অলিও অভিযানে আটক- ইউনূস আমলে খালাস, জেএমবির ‘বোমারু মামুন’ এখন পুলিশের খাতায় ‘নাটের গুরু’

১৩ আগস্ট, ২০২৬ | ৫:০৪ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

রাজধানীর পান্থপথের হোটেল অলিওতে ২০১৭ সালের জঙ্গিবিরোধী অভিযানের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় খালাস পাওয়া নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’কে এবার সাম্প্রতিক কয়েকটি বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনায় ‘নাটের গুরু’ হিসেবে উল্লেখ করছে পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। মামুন অবশ্য এখনো পুলিশের হাতে আটক হননি। মঙ্গলবার রাতে সাভার থেকে বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান। সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, আরিফের ‘গুরু’ নাজমুল হাসান মামুন। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মামুনের বিষয়ে নতুন করে তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। জেএমবির জঙ্গি আরিফ ২০১৭ সালের ১৫ই আগস্ট রাজধানীর পান্থপথের হোটেল অলিওতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় হোটেলে অবস্থান করা এক যুবক বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে তিনি নিহত হন। পরে তার পরিচয় সাইফুল ইসলাম হিসেবে জানানো হয়। ঘটনার পর কলাবাগান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। তদন্ত শেষে ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এই মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন নাজমুল হাসান মামুন। ২০১৭ সালের ৩১শে ডিসেম্বর তাকে রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় পুলিশ তাকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির ‘শুরা সদস্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। সাভারে জেএমবির জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধারকৃত বোমা তৈরির সরঞ্জাম তবে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০২৬ সালের ৫ই জানুয়ারি ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামুনসহ ১১ আসামিকে খালাস দেন। মামলাটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে’ করা হয়েছিল—আসামিপক্ষের এমন যুক্তি আদালত গ্রহণ করেন। খালাসের রায়ে বিচারক আসামিদের ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী নেতাকর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। রাজনৈতিক কারণে সরকারবিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছিল বলেও রায়ে মন্তব্য করা হয়। ফলে একসময় জঙ্গিবাদ ও বোমা তৈরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া মামুন আদালতের রায়ে ওই মামলায় দায়মুক্তি পান। হোটেল অলিও মামলায় খালাস পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছেন মামুন। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক কয়েকটি বিস্ফোরণ এবং বোমা উদ্ধারের ঘটনায় তাকে ‘নাটের গুরু’ হিসেবে চিহ্নিত করছে সিটিটিসি। সিটিটিসির এডিসি (ইনভেস্টিগেশন) মাঈন উদ্দীন চৌধুরী বলেন, মঙ্গলবার রাতে সাভার থেকে বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানের গুরু হলেন নাজমুল হাসান মামুন। পুলিশ বলছে, মামুনকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে। পাইপ বোমা তৈরির সরঞ্জাম মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আরিফকে গ্রেপ্তারের পর সাভারের শ্যামপুরে তার ভাড়া নেওয়া একটি বাড়িতে অভিযান চালায় সিটিটিসি। সন্ধ্যা থেকে রাত পৌনে ২টা পর্যন্ত বাড়িটি ঘিরে অভিযান চলে। পুলিশ জানায়, ওই বাড়ি থেকে বেশ কিছু পাইপ বোমা ও বোমা তৈরির রাসায়নিক উদ্ধার করা হয়েছে। বাড়ির মালিকের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আরিফ গত ৫ই আগস্ট ‘আব্বাস আলী’ পরিচয়ে একটি কক্ষ ভাড়া নেন। পেশা হিসেবে গাড়িচালকের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। মাসিক ভাড়া ছিল চার হাজার টাকা। বুধবার উদ্ধারকৃত প্রেশার কুকার বোমা বাড়িতে ওঠার পর দিনের বেলায় তাকে খুব একটা দেখা যেত না। রাতের বেলায় বিভিন্ন সামগ্রী এনে ওই কক্ষে রাখতেন বলে বাড়ির মালিকের পরিবারের সদস্যরা জানান। সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, সেখানে বিস্ফোরক তৈরির প্রস্তুতি চলছিল। পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা রাসায়নিকের মধ্যে এসিটোন ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডও ছিল। এসব উপাদান দিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিস্ফোরক তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে কর্মকর্তাদের দাবি। সিটিটিসির ভাষ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ, ফেব্রুয়ারিতে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের তল্লাশির সময় বোমার ব্যাগ ফেলে পালানো, মার্চে কুমিল্লার একটি মন্দিরে বিস্ফোরণ এবং একই মাসে সায়েদাবাদে পুলিশের তল্লাশির সময় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় মামুন ও আরিফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গত জুলাইয়ে মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে উল্টো রথযাত্রার পথে ছাতার মধ্যে ‘পাইপ বোমা’ রেখে যাওয়া এবং আশুলিয়ার চারাবাগে একটি চায়ের দোকানে ‘প্রেশার কুকার’ বোমা রেখে যাওয়ার ঘটনাতেও তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে পুলিশের দাবি। ৩১শে জুলাই উদ্ধারকৃত প্রেশার কুকার বোমা সবশেষ বুধবার সকালে সাভারের গোপেরবাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের সামনের মাঠে পড়ে থাকা একটি ড্রামের ভেতর থেকে ‘প্রেশার কুকার’ বোমা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, আরিফও এর আগে জঙ্গি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান বলে জানিয়েছে পুলিশ। সিটিটিসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকায় মামুন-আরিফদের একটি আস্তানা ছিল। সেখানে বোমা রাখার ঘটনার পর তারা সাভারের শ্যামপুরে নতুন আস্তানা গড়ে তোলেন। রথযাত্রার সময় উদ্ধারকৃত ছাতা বোমা ‘বোমারু মামুন’ কোথায়? ২০১৭ সালে গ্রেপ্তারের সময়ই বোমা তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে নাজমুল হাসান মামুন ‘বোমারু মামুন’ নামে পরিচিতি পান। হোটেল অলিও মামলায় তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে আদালতের রায়ে তিনি খালাস পান। কিন্তু খালাস পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশের তদন্তে আবারও তার নাম সামনে এসেছে। সিটিটিসির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে যার নাম আসবে, তাকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে। মামুনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশ এখনো চেষ্টা চালাচ্ছে। অর্থাৎ, হোটেল অলিও মামলায় আদালতের রায়ে খালাস পাওয়া সেই ‘বোমারু মামুন’ বর্তমানে পুলিশের কাছে নতুন করে সন্দেহের কেন্দ্রে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে তার সংশ্লিষ্টতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং তাকে গ্রেপ্তারও করা যায়নি। পুলিশের ভাষ্য, সাভার থেকে আটক আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোর সূত্র ধরে মামুনের বিষয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।